ভ্যাট, ঢাকা দক্ষিণ কমিশনারেটে ঘুষের চাপে কোটি কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি

নয়াবার্তা প্রতিবেদক : ভ্যাট, ঢাকা দক্ষিণ কমিশনারেটে ঘুষের চাপে কোটি কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির ঘটনা ঘটছে। কাস্টমস্, এক্সাইজ ও ভ্যাট, ঢাকা (দক্ষিণ) কমিশনারেট জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীন একটি অন্যতম শুল্ক, আবগারী ও মূল্য সংযোজন কর কমিশনারেট। ১৯৯১ সনে প্রবর্তিত মূল্য সংযোজন কর ব্যবস্থায় পরোক্ষ করের আওতা সম্প্রসারিত হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে রাজস্ব প্রশাসনের গতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৯৩ সনের ১লা জুলাই কাস্টমস্, এক্সাইজ ও ভ্যাট, ঢাকা (দক্ষিণ) কমিশনারেট এর কার্যক্রম শুরু হয়। এ দপ্তরের অধীন ৮টি বিভাগীয় দপ্তর, ২৮ টি সার্কেল অফিস এবং ১ টি এলসি স্টেশন শুল্ক, আবগারি ও মূল্য সংযোজন কর আহরণে নিয়োজিত ছিল। ২০১২ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আওতাধীন দপ্তরসমূহ পুনঃগঠনের ফলে বর্তমানে কাস্টমস্, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের, ঢাকা (দক্ষিণ), ঢাকার আওতাধীন ৮টি বিভাগ ও ৩২টি সার্কেল অফিস রাজস্ব আহরণে নিয়োজিত রয়েছে। এই ৮টি বিভাগ ও ৩২টি সার্কেল অফিস যথা নিয়মে রাজস্ব আহরণও করছে।
নিয়ম অনুযায়ী কমিশনারেট সরাসরি ভ্যাট গ্রহন করেনা। কিন্তু এই কমিশনারেটের অধীন একাধিক প্রতিষ্ঠান অভিযোগ করেছে প্রতি মাসের নির্ধারিত তারিখের মধ্যে বাস্তবায়ন শাখার সহকারি রাজস্ব কর্মকর্তা শামীমুজ্জামান এর নিকট নির্ধারিত হারে ঘুষের প্যাকেট পৌছে দিতে হয়। এই অভিযোগের প্রাথমিক প্রমাণ পাবার পর গত ২৮ অক্টোবর কাস্টমস্, এক্সাইজ ও ভ্যাট, ঢাকা (দক্ষিণ) কমিশনারেট এ নয়াবার্তার পক্ষ থেকে তথ্য অধিকার (তথ্য প্রাপ্তি সংক্রান্ত) বিধিমালা, ২০০৯ এর ৮ ধারা অনুযায়ী কতিপয় তথ্য চেয়ে আবেদন করা হয়। গত ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত কাস্টমস্, এক্সাইজ ও ভ্যাট, ঢাকা (দক্ষিণ) কমিশনারেট “তথ্য অধিকার (তথ্য প্রাপ্তি সংক্রান্ত) বিধিমালা, ২০০৯ এর ৮ ধারা” বাস্তবায়নে নয়াবার্তার চাহিত তথ্য সরবরাহ করেননি। এমন কি তথ্য সরবরাহ করা হবে কি না তাও জানাননি। মুলত এসব তথ্য জানালে নয়াবার্তার অনুসন্ধানে ঘুষ আদায়ের পরিমান ফাঁস হয়ে যাবার ভয়ে কাস্টমস্, এক্সাইজ ও ভ্যাট, ঢাকা (দক্ষিণ) কমিশনারেট তথ্য প্রদান হতে বিরত রয়েছেন।
নয়াবার্তার অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাস্টমস্, এক্সাইজ ও ভ্যাট, ঢাকা (দক্ষিণ) কমিশনারেটে পুল নামে একটি বিশেষ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। যেটি পরিচালনা করেন সাবেক কমিশনার হুমায়ুন কবির এবং অতিরিক্ত কমিশনার সোহেলুর রহমান এর আস্থাভাজন “বাস্তবায়ন শাখার সহকারি রাজস্ব কর্মকর্তা শামীমুজ্জামান”। নিয়ম অনুযায়ী কমিশনারেট সরাসরি ভ্যাট গ্রহন করেনা। কিন্তু এই কমিশনারেটের অধীন একাধিক প্রতিষ্ঠান অভিযোগ করেছে , প্রতি মাসের নির্ধারিত তারিখের মধ্যে বাস্তবায়ন শাখার সহকারি রাজস্ব কর্মকর্তা শামীমুজ্জামান এর নিকট নির্ধারিত হারে ঘুষের প্যাকেট পৌঁছে দিতে হয়। আর বিনিময়ে ঘুষ প্রদাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে। পুল পরিচালনাকারী সহকারি রাজস্ব কর্মকর্তা শামীমুজ্জামান আদায়কৃত ঘুষের অর্থ কর্মকর্তা কর্মচারিদের মধ্যে আনুপাতিক হারে বন্টন করেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও দক্ষিণ কমিশনারেটের ৪০ জন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারি পুল থেকে প্রতিমাসে ঘুষের ৪ হাজার টাকা ভাগে পান। কর্মকর্তারা পদ পদবী অনুযায়ী ঘুষের টাকার ভাগ পান। পুল পরিচালক শামীমুজ্জামান বিভিন্ন বিভাগীয় কর্মকর্তাকে কমিশনারের নাম ভাঙিয়ে প্রতিমাসে নির্দিষ্ট অংকের টাকা পুলে জমা করেন। এছাড়াও সরাসরি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নির্ধারিত হারে মাসোহারা আদায় করে পুলে জমা করেন। মূলত এই টাকাই কর্মকর্তা কর্মচারিদের মধ্যে পদ পদবি অনুসারে ভাগ বাটোয়ারা করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পুল পরিচালক শামীমুজ্জামান, এসআই সিফাত উল্লাহ এবং অফিস সহকারী আমান উল্লাহ‘র সমন্বয়ে গঠিত সিন্ডিকেট এর মাধ্যমে কাস্টমস্, এক্সাইজ ও ভ্যাট, ঢাকা (দক্ষিণ) কমিশনারেটে চলছে বদলী বাণিজ্য। এই সিন্ডিকেট ছোট বদলীতে নেয় ৫০ হাজার আর বড় বদলীতে নেয় ২ লাখ টাকা। এলডি মেহেদী হাসানও ছিলেন এই সিন্ডিকেটের সদস্য। সিন্ডিকেটের আভ্যন্তরীন দ্বন্ধের কারণে মেহেদী হাসানকে জন প্রশাসন থেকে জিএল শাখায় বদলি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কাস্টমস্, এক্সাইজ ও ভ্যাট, ঢাকা (দক্ষিণ) কমিশনারেট এর সাবেক কমিশনার হুমায়ুন কবির ইএফডি মনিটরিং এর জন্য ৪০ জনকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তাদেরকে বিভিন্ন বিভাগ ও সার্কেলে অনৈতিকভাবে পদায়ন করা হয়। বর্তমানে ৮ বিভাগে ও ৩২টি সার্কেলে এ ৪/৫ জন করে বহিরাগত কর্মরত রয়েছে। যাদের প্রত্যেককে অজ্ঞাত উৎস থেকে প্রতিমাসে ২০/৩০ হাজার টাকা করে বেতন দিতে হয়। অনেক সার্কেলে অনুমোদন ছাড়াই বাজেট বিহীন গাড়ি ব্যাবহার করা হচ্ছে। যার ব্যায়ভার বহন করা হয় অজ্ঞাত উৎস থেকে। মাসিক ভাড়ায় চালিত এসব গাড়ীর ড্রাইভাররা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিজেদেরকে ভ্যাট কর্মচারি পরিচয় দিয়ে অনৈতিক সুবিধা আদায় করছে।