রাশিয়ার অস্ত্র–সরঞ্জামে ইরানের প্রতিরক্ষা

ওয়াশিংটন পোস্ট : রাশিয়ার অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনপিপি স্টার্টের আমন্ত্রণে গত মাসে ইরানের একটি প্রতিনিধিদল মস্কো সফর করেছিল। গুরুত্বপূর্ণ এ সফরের উদ্দেশ্য ছিল অস্ত্র তৈরির কারখানাগুলো থেকে দরকারি সরঞ্জাম কেনা। ইরানি প্রতিনিধিদলে থাকা ১৭ জন সদস্যকে খাবার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আপ্যায়ন করা হয়। সফরের শেষ দিন তাঁরা যান অস্ত্র কারখানায়। এসব অস্ত্রের জন্যই ইরান দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় ছিল। এর মধ্যে ছিল রাশিয়ার উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যা শত্রু যুদ্ধবিমানকে শনাক্ত করে উড়িয়ে দিতে পারে।

ইউক্রেনে হামলার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রাশিয়ার ইয়েকাতেরিনবার্গের ওই অস্ত্র কারখানায় মোবাইল লঞ্চার, বিমানবিধ্বংসী অস্ত্র ছাড়াও রাশিয়ার উন্নত এস–৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরি হয়। রুশ এই আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান শনাক্ত ও তা ধ্বংস করার উপযোগী বলে মূল্যায়ন করেছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে হ্যাকার গ্রুপের ফাঁস করা রুশ নথি ও ইরানের কিছু ই–মেইল অনুযায়ী, ইরানি কর্মকর্তাদের মার্চ মাসের রাশিয়া সফরের উদ্দেশ্য ছিল বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইরানকে কতটা উৎপাদন সক্ষম করে তোলা সম্ভব, তা খতিয়ে দেখা।

এ সফরের পর রাশিয়ার কাছ থেকে ইরান সরাসরি কোনো অস্ত্র কিনেছে কি না, তা অবশ্য জানা যায়নি। কিন্তু গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, এ সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব গভীর হয়েছে। ইসরায়েলে গত শনিবার ইরানের হামলার পর সম্ভাব্য পাল্টা হামলার আগে রাশিয়া-ইরান জোট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

রাশিয়া গোয়েন্দা সক্ষমতার কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠাতে ইরানকে কারিগরি সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে রাশিয়ার সবচেয়ে উন্নত এসইউ-৩৫ যুদ্ধবিমান ইরানকে দেওয়া হয়েছে কি না, তার এখনো কোনো প্রমাণ নেই।

ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মস্কোকে সহায়তা করার জন্য ইরান ২০২২ সালে হাজারো ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করতে সম্মত হয়ে রাশিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্কের একটি বিপজ্জনক নতুন অধ্যায় খুলেছে। তাদের মধ্যে সম্পর্কের এই গভীরতা মস্কো ও তেহরানের মধ্যে চুক্তি শক্ত করতে সহায়তা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করে বলেছেন, রাশিয়া তার মিত্রকে উন্নত যুদ্ধবিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এতে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যেকোনো বিমান হামলায় প্রতিরক্ষা মজবুত করতে পারবে তেহরান।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মস্কোর পক্ষ থেকে কতগুলো আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দেওয়া হয়েছে বা কতগুলো ইরানে বসানো হয়েছে, তা জানা যায়নি। তবে রাশিয়ার প্রযুক্তি ইরানকে আরও শক্তিশালী ইসরায়েলি প্রতিপক্ষ তৈরি করতে পারে। এ অস্ত্র চুক্তি দুই দেশের জন্যই এখন সুফল বয়ে আনছে।

জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের কর্মকর্তা হান্না নোট বলেছেন, এখন দুই দেশের সম্পর্ক আর ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, যেখানে রাশিয়া সব সুবিধা পাবে। ইরানও এখন এ পরিবর্তনের ফল পেতে শুরু করেছে। তাদের সম্পর্ক কেবল জিনিসপত্র আদান–প্রদানে আটকে নেই। তারা এখন মেধা বিনিময়ের মতো অস্পৃশ্য সুবিধাও পেতে শুরু করেছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, রাশিয়া এখন তাদের গোপন চুক্তিকে উন্নত যুদ্ধবিমান সরবরাহের পর্যায়ে উন্নীত করছে। এ ছাড়া গোয়েন্দা সক্ষমতার কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠাতে ইরানকে কারিগরি সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। তবে রাশিয়ার সবচেয়ে উন্নত এসইউ-৩৫ যুদ্ধবিমান ইরানকে দেওয়া হয়েছে কি না, তার এখনো কোনো প্রমাণ নেই।

অন্যদিকে ইরানের চাওয়া তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর সুরক্ষায় রাশিয়ার বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। ২০০৭ সালেই তেহরান রাশিয়া এস-৩০০ কেনার চুক্তি করেছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোর চাপে তা দিতে পারেনি। কিন্তু ২০১৬ সাল থেকে সে বাধা দূর হয়ে গেলে ইরান ২০১৯ সাল থেকে এস-৩০০ ব্যবহার শুরু করে। এর পর থেকে এস-৪০০ নিতে উৎসাহী হয় ইরান। কিন্তু রাশিয়া এগুলো তেহরানকে দিয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মনে করেন, সরাসরি এস-৪০০ না দিলেও এর নকশা বা প্রযুক্তি ইরানের কাছে হস্তান্তর করা হতে পারে।

যদি ইরান এ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পেয়ে থাকে, তবে ইরানের পাথুরে পর্বতগুলোর খাঁজে ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাগুলো আরও সুরক্ষিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হাডসন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো কান কাসাপগলো বলেন, রাশিয়ার এসব অস্ত্রে ইরানের আকাশ আরও বিপজ্জনক এলাকা হয়ে উঠবে।

এদিকে সম্প্রতি মস্কো ও তেহরান যৌথভাবে নতুন ধরনের চালকবিহীন ড্রোন (ইউএভি) তৈরি শুরু করেছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও ফাঁস হওয়া নথিতে এসব তথ্য সামনে এসেছে। এসব নথি ওয়াশিংটন পোস্ট অবশ্য যাচাই করতে পারেনি। তবে বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, তাঁরা এসব নথির যথার্থতা যাচাই করছেন। রাশিয়া ও ইরান অবশ্য এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

Share