রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জামায়াত জোটের রাজনৈতিক বার্তা

লক্ষ্য জুলাই সনদকে আলোচনায় রাখা

বিশেষ প্রতিবেদক : সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় পরাজয় নিশ্চিত জেনেও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে রাজনৈতিক বার্তা দিতে। জোটটির নেতারা বলেছেন, তাদের মূল লক্ষ্য জুলাই জাতীয় সনদকে আলোচনায় রাখা।

জোট গঠনের সময়ে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমকে জামায়াত কথা দিয়েছিল তাঁকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করা হবে। এ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করাও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার একটি কারণ। সংসদে প্রয়োজনীয়সংখ্যক ভোট না থাকায় অলি আহমদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, এ পরিস্থিতিতে তিনি প্রার্থী হবেন কিনা। তিনি আগ্রহী হওয়ায় জামায়াত নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। দলটির মূল্যায়ন এর মাধ্যমে একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান দিয়ে নিজেদের পক্ষে রাখা যাবে।

স্বাধীনতার বিরোধিতার কারণে জামায়াত নিয়মিত বিএনপি ও অন্যান্য দলের আক্রমণের শিকার হচ্ছে। ১১ দল এবং জামায়াতের চারজন নেতা বলেছেন, এই আক্রমণ ঠেকাতে মুক্তিযোদ্ধা এবং কওমি ঘরানার আলেমদের ‘বিশেষ ছাড়’ দিয়ে পাশে রাখা হয়েছে। স্বাধীনতার প্রথম দিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং স্বাধীনতা ঘোষণায় অলি আহমদের ভূমিকা রয়েছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহচর ছিলেন তিনি। বিএনপি জিয়াউর রহমানের ভাবমূর্তিকে রাজনীতিতে যতটা কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে, এর কিছুটা হলেও অলি আহমদের মাধ্যমে জামায়াত নিজের দিকে আনতে পারবে।

১১ দলের নেতারা অবশ্য বলছেন, জয়-পরাজয় নয়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণে নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়া তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে টানা সাতবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। এ ধারা ভেঙে গণতান্ত্রিক চর্চা শুরু করতে নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়া হচ্ছে।

সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকিবেন, যিনি আইন অনুযায়ী সংসদ-সদস্যগণ কর্তৃক নির্বাচিত হইবেন।’ ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী সংসদের ৩৫০ জন সদস্য (এমপি) এই নির্বাচনের ভোটার।

আইনের ১০ ধারা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা প্রকাশ্যে ভোট দেবেন। ১০(৩) ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেকটি ব্যালট পেপারের দুটি অংশ থাকবে। তাতে ভোটারের নাম ও বিভক্তি সংখ্যা থাকবে। রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীদের নামের পাশে ভোটাররা স্বাক্ষরের মাধ্যমে ভোট দেবেন। ১০(৪) ধারা অনুযায়ী, প্রত্যেক ভোটার নির্দিষ্ট ব্যালটের কাউন্টার ফয়েলে নিজ নাম স্বাক্ষর করবেন।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এমপিরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে পদ বাতিল হবে। তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কেউ দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে ভোট দিলে পদ বাতিল হতে পারে। বর্তমান সংসদে জামায়াত জোটের এমপি ৯০ জন। বিএনপির এককভাবে রয়েছে ২৪৭ জন এমপি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে প্রয়োজন ১৭৫ ভোট। এই সমীকরণে বিএনপির প্রার্থীর জয় নিশ্চিত।

অলি আহমদকে প্রার্থী করা প্রসঙ্গে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, জুলাই সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ার কথা গোপন ব্যালটে। কিন্তু ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনে প্রকাশ্যে ভোটের কথা বলা হয়েছে। বিএনপিসহ সব দল গোপন ব্যালটে নির্বাচনে একমত ছিল। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রকাশ্য ভোট হতে পারে না। সংবিধান সংস্কারের আগে শুধু আইন সংশোধন করে গোপন ব্যালটে ভোট করা সম্ভব। ১১ দল এবং এনসিপি চায়, জুলাই সনদ অনুযায়ী নির্বাচন হোক। কিন্তু বিএনপি আর সবকিছুর মতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও জুলাই সনদ মানছে না। এটি তুলে ধরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার একটি কারণ। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে ১১ দল।

রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী ঠিক করতে ১১ দলীয় জোটের বৈঠক হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। তিনি বলেছেন, বিএনপি এমন কোনো প্রার্থী জাতির সামনে হাজির করতে পারেনি, যিনি সর্বজনগ্রাহ্য। সংস্কারের সময় প্রস্তাব ছিল, রাষ্ট্রপতিসহ সব সাংবিধানিক পদে আলোচনা করে নিয়োগ দেওয়া হবে, যাতে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে কাউকে পাওয়া যায়।

১৯৯১ সালে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ প্রার্থী দেওয়ায় সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর সেবারই প্রথম এবং শেষবারের মতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট গ্রহণ হয়েছিল। বিএনপি প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে জামায়াতের ১৮ এমপি ভোট দেন বিএনপির প্রার্থীকে। আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী ৯২ ভোট পেয়েছিলেন। জাতীয় পার্টির ৩৫ এমপি ভোট দানে বিরত ছিলেন।

এরপর অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনগুলোতে ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীরাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। প্রায় ৩৫ বছর পর এবার বিরোধী জোট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ায় ভোট হচ্ছে।

পরাজয় নিশ্চিত জেনেও ১১ দল কেন প্রার্থী দিচ্ছে– এ প্রশ্নে জোটের সমন্বয়ক এবং জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বীরবীক্রম, যোগ্য, পরিচ্ছন্ন এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রার্থী করতে যাচ্ছি। জামায়াত সবসময় এ উদারতা দেখিয়েছে। এর আগে জুলাই শহীদের মাকে সংসদ সদস্য করা হয়েছে। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে রাজনীতি করছে জামায়াত।

Share