
আনোয়ারা পারভীন : ক্ষমতাসীন বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হতে চলেছেন। তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে দলের মহাসচিব পদশূন্য হয়ে যাবে। এই শূন্যপদ পুরণে চলতি বছরের শেষে বা আগামী বছরের শুরুতে বিএনপি জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন করতে পারে বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে ফখরুল ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আগামীতে এই পদে নতুন মুখ দেখা যাবে। যা তার উত্তরসূরি নিয়ে জোর জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে। আগামী ২০ আগস্ট নির্ধারিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরেও এই জল্পনা তীব্র হয়েছে, কারণ ইতিমধ্যেই মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য বিবেচনা করার বিষয়টি চুড়ান্ত হয়ে গেছে। এখন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি।
ফখরুল ইসলাম ২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন এবং ২০১৬ সালে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে মনোনীত হন। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে তিনি ছয়বার কারাবরণ করেন। প্রায় ১৫ বছর ধরে তার পরিবর্তনের গুঞ্জন বারবার উঠলেও, তার স্বচ্ছ ভাবমূর্তি এবং একজন উদার ও ভদ্র রাজনীতিবিদ হিসেবে সুনামের কারণে দলটির পক্ষে বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল। ঐতিহাসিকভাবে, বিএনপি প্রায়শই স্থায়ী নিয়োগ দেওয়ার আগে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব বা প্রথম যুগ্ম মহাসচিবকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে এসেছে। তবে এবার প্রক্রিয়াটি ভিন্ন হতে পারে বলে মনে করছেন দলের ভেতরের মানুষেরা। ফখরুল ইসলাম রাষ্ট্রপতি হলে কাউন্সিলের আগে বা পরে বিএনপি একজন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়োগ দিতে পারে।
নতুন মহাসচিব নির্বাচনের আগেই স্থায়ী কমিটির শূন্য পদগুলো পূরণ করা হতে পারে বলেও গুঞ্জন রয়েছে। এই পদের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। দলীয় কর্মীদের মতে, জেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বিএনপির সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞান রয়েছে এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও সরকারবিরোধী আন্দোলনে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হওয়ার পর থেকে রিজভী সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান—যিনি বর্তমানে চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী—তারেক রহমানের নির্দেশনায় বিভিন্ন দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহায়তা করে আসছেন।
স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ আরেকজন শক্তিশালী পদপ্রার্থী। আওয়ামী লীগ আমলে গুমের শিকার হওয়ার পর তিনি ভারতে বহু বছর কাটান এবং সরকারবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তিনি যুক্ত ছিলেন। বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও আত্মীয় সালাহউদ্দিন আহমেদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে সংসদে তার ভূমিকা এবং বিরোধীদের সমালোচনার কৌশলগত জবাব দিয়েও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তবে দলের কিছু নেতার মতে, দীর্ঘদিন বাংলাদেশের বাইরে থাকার কারণে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সাথে তার সরাসরি যোগাযোগ কমে গেছে, যা তার সম্ভাবনাকে কিছুটা দুর্বল করতে পারে।
বিএনপির একটি সূত্রের মতে, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ড. এ.জেড.এম. জাহিদ হোসেন, যিনি বর্তমানে দুটি মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন, তাকেও সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আলোচনা করা হচ্ছে। তিনি জিয়া পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। আলোচনায় থাকা অন্যান্য নামের মধ্যে রয়েছেন—স্থায়ী কমিটির সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী; চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন; যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি; এবং যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট মাহবুব উদ্দিন খোকন।
বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, ক্ষমতাসীন দলগুলোর ক্ষেত্রে প্রায়ই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও মাঠপর্যায়ের সংগঠনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। তারা মনে করেন, পরবর্তী মহাসচিবের তৃণমূলের সাথে শক্তিশালী যোগাযোগ থাকা উচিত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, “যেহেতু আমাদের চেয়ারম্যান এখন প্রধানমন্ত্রী, তাই মহাসচিব দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে থাকবেন। তৃণমূলের সাথে সুদৃঢ় সম্পর্ক নেই এমন কাউকে নিয়োগ দেওয়া উল্টো ফল দিতে পারে।”
বিভিন্ন পর্যায়ের বিএনপি নেতা-কর্মীরা জানান, তারা এমন একজন দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ও কর্মীবান্ধব নেতা চান, যিনি তৃণমূলে গ্রহণযোগ্য এবং যার শক্তিশালী সাংগঠনিক দক্ষতা রয়েছে। তাদের মতে, “আমরা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতো গতিশীল নেতৃত্ব পছন্দ করি। আগামী কাউন্সিলে যদি ভোটাভুটির মাধ্যমে সরাসরি মহাসচিব নির্বাচিত হন, তবে আমরা একজন যোগ্য ও কর্মীবান্ধব মানুষকে বেছে নেব। আর যদি চেয়ারম্যানকে একক ক্ষমতা দেওয়া হয়, তবে তিনি দল ও সংগঠনের স্বার্থে সঠিক ব্যক্তিকেই নির্বাচন করবেন। কারণ দেশের মানুষ ভোটের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে যে বিএনপি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। আমরা দলের মহাসচিব হিসেবে একজন অভিজ্ঞ ও যোগ্য রাজনৈতিক নেতা প্রত্যাশা করি। কঠিন সময়ে যারা কর্মীদের পাশে ছিলেন, তাদের অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।”
যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, “দল ও দেশের জন্য যা সবচেয়ে ভালো হবে, তা-ই করা হবে। একজন নিবেদিতপ্রাণ, অভিজ্ঞ ও বিজ্ঞ নেতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।” তিনি আরও যোগ করেন, “আমরাও শুনেছি যে মির্জা ফখরুল ইসলাম মহাসচিব হিসেবে থাকতে চান না।” ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, পরবর্তী মহাসচিব সম্ভবত এমন কেউ হবেন যিনি তারেক রহমানের পছন্দের এবং যিনি তার সাথে কার্যকরভাবে কাজ করে দল ও দেশের সেবা করতে পারবেন। “এই পদে তুলনামূলক তরুণ কোনো নেতাও আসতে পারেন। একজন কর্মীবান্ধব নেতা বেশি বিবেচনা পাবেন,” তিনি বলেন। রিজভী, সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং এ.জেড.এম. জাহিদ হোসেন সবচেয়ে সামনের সারির নাম হিসেবে উঠে আসলেও, চূড়ান্ত পছন্দ নির্ভর করবে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল এবং বিশেষ করে দলীয় চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর, যিনি গত ১৭ বছর ধরে ভার্চুয়ালি দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
