শেখ হাসিনার আসা না অসার বিষয়টি পাসপোর্টের প্রশ্ন নয়

ট্রাভেল পাসের আবেদন করলে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত

গাজী আবু বকর: প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, শেখ হাসিনা ট্রাভেল পাসের আবেদন করলে সরকার তখনকার পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগে সরকার সবকিছু পরিকল্পনা করে রাখে না। তাঁর ভাষ্য, শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে দেশটির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা নিজে দেশে ফিরেন অথবা তাকে ফিরিয়ে আনা হোক সরকারের চাওয়া একই। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। আজ মঙ্গলবার সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি বিষয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য অফিসার সৈয়দ আবদাল আহমদ উপস্থিত ছিলেন।

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গে ডাঃ জাহিদুর রহমান বলেন, তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন না। ডিসেম্বরের পরে আবারো মঙ্গলবার আসবে। সেদিনও এমনই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। তাঁর এমন বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে দুটি প্রশ্ন করে জানতে চাওয়া হয় যে, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের পরে দেশে ফিরতে না পারার দায় যাতে সরকারের উপর চাপাতে না পারেন কিংবা কোন অজুহাত তুলতে না পারেন, সেজন্য কি সরকার তাঁর পাসপোর্ট বাতিলের যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন—সেই নিষেধাজ্ঞা কি সরকার প্রত্যাহার করবেন?

উত্তরে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকার শেখ হাসিনার দেশে আসা ঠেকাতে চায় না। বরং তাঁকে দেশে ফেরানোর বিষয়েই সরকারের আগ্রহ রয়েছে। তিনি বলেন, তিনি নিজে আসুন অথবা তাঁকে ধরে নিয়ে আসি। আমরা তাঁকে চাচ্ছি তো। আমি বলছি, এখন তাঁর পাসপোর্টের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হোক। তিনি আসার যোগ্য। তিনি যদি আসার সিদ্ধান্ত নেন বা আমাদের যদি তাঁকে ধরে আনার প্রক্রিয়া করতে হয়, সেটি পাসপোর্টের প্রশ্ন নয়। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁকে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনতে ভারতের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে উদ্যোগ নিতে চায় সরকার। এজন্য যে প্রক্রিয়া ও আনুষ্ঠানিকতা প্রয়োজন হবে, তা অনুসরণ করা হবে।

তাকে পাল্টা প্রশ্ন করে জানতে চাওয়া হয় যে, শেখ হাসিনা ট্রাভেল পাস চাইলে সরকার তা দেবে কি না? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত আসামি হলেও এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের নাগরিক। তিনি দেশে ফিরতে চাইলে সরকার কী পদক্ষেপ নেবে, তা পরিস্থিতি তৈরি হলে বিবেচনা করা হবে। জাহেদ উর রহমান বলেন, তিনি চাইলে সরকার কী করবে, সেটা আসলে আমরা সময়ে বুঝব। তিনি আসুন অথবা তাঁকে আমরা ধরে নিয়ে আসি আমাদের চাওয়া তো একই। যদি এটার সঙ্গে মিলে যায়, সরকার সে অনুযায়ী যেকোনো পদক্ষেপ নিতে পারে। তবে শেখ হাসিনা ট্রাভেল পাসের আবেদন করলে সরকার কী সিদ্ধান্ত নেবে, সে বিষয়ে আগাম কিছু বলতে চাননি উপদেষ্টা। তার ভাষ্য, এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগে সরকার সবকিছু পরিকল্পনা করে রাখে না। শেখ হাসিনা আবেদন করলে তখনকার পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

শ্রমিকদের আন্দোলনে ঢুকে লুটের টাকা দিয়ে আ. লীগ নাশকতা করছে
শ্রমিকদের আন্দোলনে ঢুকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের লোকেরা লুটের টাকা দিয়ে নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেন ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, ‘প্রথম দিকে শ্রমিকরা মাঠে নেমেছিলেন। কারণ তাদের কিছু ন্যায্য দাবি ছিল। এরপর মজুরি কমিশন তৈরি হয়েছে। তারা যদি আর মাঠে না নামেন, তখন অন্য কারও পক্ষে মাঠে নেমে কাজটা করা সহজ হয় না।’ তিনি বলেন,‘এই প্রেক্ষাপটটা মাঠ থেকে তৈরি হয়। আমাদের পোশাককর্মীরা মাঠে নেমেছেন। সেটার ভেতরে থেকে এই কাজটা করছে তারা (আওয়ামী লীগ)’।

বর্তমান পোশাক শিল্পের সহিংসতা বা নাশকতার ঘটনায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার বিষয়টি আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিরোধীদের দোষারোপ করার রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি কি না এমন প্রশ্নও করা হয় সংবাদ সম্মেলনে। উত্তরে জাহেদ উর রহমান বলেন, বিষয়টি এভাবে দেখা ঠিক হবে না। একটি স্বৈরাচারী সরকার ও একটি গণতান্ত্রিক সরকারের আচরণের মধ্যে পার্থক্য থাকা উচিত। জনগণের কাছে ভিত্তিহীন বা মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করলে তার পরিণতি সরকারকেই ভোগ করতে হবে। তিনি বলেন, জনগণের কাছে আমরা যদি কোনো মিথ্যা কথা বলি, এটার কনসিকোয়েন্স আমাদের নিতে হবে। সেই কারণে আমি বলছি, আমরা যে কথাটা বলছি, সেটার ভিত্তি আছে বলেই বলছি। এটা হাসিনার মতো বিরোধী দলকে শুধু দোষারোপ করার জন্য নয়।

উপদেষ্টা জাহেদ বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি আছে, জ্বালানির মূল্য বাড়ছে এবং এর সূত্র ধরে অনেক কিছুর মূল্য বেড়ে যাচ্ছে। সেটার প্রতি সরকার সহানুভূতিশীল হয়েই আগেই মজুরি কমিশন তৈরি করেছে। ফলে আন্দোলনের যে দাবি, সেটা আসলে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল।’

‘এরপর যখন এটা কন্টিনিউ করে বা যে ধরনের সহিংস আচরণ অনেকের মধ্যে দেখা গেছে যেটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সেটা হচ্ছে কোনোভাবেই এরা আমাদের পোশাককর্মীরা হতে পারেন না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে গোয়েন্দা তথ্য আছে। তার ভিত্তিতে তিনি বলেছেন এটা সীমান্তের ওপার থেকে হয়েছে,’ যোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে কিছু করতে পারবে, সেটা আমরা বিশ্বাস করি না। কিন্তু যেহেতু তাদের কাছে প্রচুর লুটের টাকা আছে, তারা তা দিয়ে কোথাও কোথাও কোনো না কোনো ফর্মে নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। সেটার সঙ্গে এটার সংযোগ থাকতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেহেতু বলেছেন তার কাছে নিশ্চয়ই তথ্য আছে। সেটার (আন্দোলনের) সঙ্গে তাদের (আওয়ামী লীগ) লিংক থাকতেই পারে।’

বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরি হত্যা মামলা বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, ‘এটা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচুর কথাবার্তা হচ্ছে। কিন্তু এটা নিশ্চিতভাবেই তদন্ত হবে। রাষ্ট্রের যেকোনো নাগরিক যখন এমন মৃত্যুর শিকার হন, তার ব্যাপারে জেনুইন তদন্ত হবে। নানা রকম ফ্রেমিং আছে, আমরা যেন সেগুলোর দিকে বেশি দৃষ্টি না দেই।’

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে সরকার
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণে সরকার যতটা সম্ভব সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণে সরকার যতটা সম্ভব সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ-চীন সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬’-এ প্রধানমন্ত্রী নিজে উপস্থিত থেকে সৌরবিদ্যুতের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

জাহেদ উর রহমান জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের লক্ষ্যে ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০’ গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নেট মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সায় কেনার প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করা এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাদে নিজস্ব মূলধন ছাড়াই তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সৌর প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয়ভিত্তিক (অপারেশনাল এক্সপেন্ডিচার) মডেলকে উৎসাহিত করছে সরকার।

এবারের সোলার এক্সপোর প্রতিপাদ্য—‘প্রতি ইঞ্চি ছাদ কাজে লাগাই, সৌরবিদ্যুতের আয় বাড়াই’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে একদিকে যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব, অন্যদিকে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করে গ্রাহকরা আয়ও করতে পারবেন। ভবিষ্যতে জ্বালানির দাম বাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অনেকেই নিজেদের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভর করতে পারেন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এক্সপোতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। সেখান থেকে পাওয়া দিকনির্দেশনার ভিত্তিতে সরকার পরবর্তী নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে। পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুৎ এক বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কাজ এগিয়ে চলছে: রাজধানীর যানজট নিরসন, যাতায়াতের সময় কমানো এবং আধুনিক, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) আওতাধীন এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫-এর চারটি গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ প্যাকেজের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে জানান ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি আরও জানান, দেশের রেল যোগাযোগব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের কোচ আমদানির কার্যক্রমও গতি পেয়েছে। এরই মধ্যে ১৮টি ব্রডগেজ কোচ দেশে এসে পৌঁছেছে এবং বাকি কোচগুলোও দ্রুত দেশে পৌঁছাবে।

ভোক্তা অধিদপ্তরের অভিযানে ১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা জরিমানা
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং ভোক্তার অধিকার সুরক্ষায় গত অক্টোবর মাসে দেশব্যাপী ৯৯৩টি তদারকিমূলক অভিযান পরিচালনা করেছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এসব অভিযানে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে মোট ১ কোটি ৭৭ লাখ ২৮ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

Share