
গাজী আবু বকর : সংবাদপত্রের ভুয়া প্রচারসংখ্যা বন্ধে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় জোরালোভাবে কাজ শুরু করেছে বলে জানান তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী আন্দালিভ রহমান। তিনি বলেন, ‘কম পত্রিকা ছাপিয়ে লক্ষাধিক সার্কুলেশন দেখানোর অসত্য প্রক্রিয়া বন্ধে তাঁর মন্ত্রণালয় কাজ করছে।’ তিনি বিগত শেখ হাসিনার শাসনামলের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘গত ১৭ বছরে দেশের সব সিস্টেম দুর্নীতিগ্রস্ত ছিল। এমন একটি ভঙ্গুর অবস্থার পর দায়িত্ব নিয়ে সরকার দেশের ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময় পার করছে। এই পরিস্থিতিতে আমরা আপনাদের কাছ থেকে বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা আশা করি, যাতে আমরা ভুলত্রুটি শুধরে সঠিক পথে এগিয়ে যেতে পারি।’
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী বিষয়টি আদালত বা বিচারিক প্রক্রিয়ার (জুডিশিয়ারি) মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে। তবে বাংলাদেশ সরকারের স্পষ্ট অবস্থান হলো জুলাই আন্দোলনসহ বিগত সময়ের সব অপরাধের সঠিক বিচারের স্বার্থে যাদের নামে মামলা রয়েছে, তাদের সবাইকে ফেরত আনা হবে।’
আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে তথ্যমন্ত্রী সরকারের ৬ মাসের বিশেষ অর্জন বিষয়ে তথ্য অধিদফতর প্রকাশিত ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান: গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার ৬ মাস’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক ফ্যাসিজম চর্চাকারীদের সামাজিকভাবে বয়কট করার আহ্বান জানিয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী আন্দালিভ রহমান বলেন, ‘যেসব গণমাধ্যম ইন্টেলেকচুয়াল বা বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা-চেতনায় ফ্যাসিজমকে সাপোর্ট করে, প্রমোট করে, কিংবা চর্চা করে তাদের সামাজিকভাবে ধিক্কার ও বয়কট করা ছাড়া আমরা কিছু করতে পারি না।’
গণমাধ্যমের স্বাধীন ভূমিকার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ব্রিফিংয়ে তথ্যমন্ত্রী ‘বুদ্ধিবৃত্তিক ফ্যাসিজম’ (ইন্টেলেকচুয়াল ফ্যাসিজম)-এর কঠোর সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, ‘ইন্টেলেকচুয়াল চিন্তা-চেতনায় যদি কেউ ফ্যাসিজমকে সাপোর্ট বা প্রমোট করে, সেই জিনিসটাকে সামাজিকভাবে ধিক্কার জানানো ছাড়া আমাদের অন্য কিছু করার থাকে না। যারা মুক্ত বাংলাদেশ এবং নতুন স্বাধীন বাংলাদেশের চেতনায় বিশ্বাস করে না, সামাজিকভাবে বয়কট হওয়াই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় বিচার।’
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে আরেক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী আন্দালিভ রহমান বলেন, ‘গণতন্ত্র বিশ্বাস করাটা একটি মানসিকতার বিষয়। গত ১৭ বছর যে মানসিকতা আমরা দেখেছি, তা ছিল সমালোচনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। কিন্তু বর্তমান সরকার কিংবা প্রধানমন্ত্রীর দিক থেকে মিডিয়ার স্বাধীনতা বন্ধ করে দেওয়া বা গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো মানসিকতা নেই।’
ব্রিফিংয়ে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘অতীতেও বলেছি, সরকারের বিরুদ্ধে বলার স্বাধীনতা সকলেরই আছে। সরকারের বিরুদ্ধে হোক কিংবা পক্ষে জনগণের কথা তুলে ধরাই গণতন্ত্র। বিটিভি ও সরকারি মাধ্যমে এখন থেকে আনুপাতিক হারে বিরোধী দলগুলোর খবরও প্রচার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, সাংবাদিকদের কল্যাণে ট্রাস্ট ফান্ডের অনুদান দ্বিগুণ করার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। অসুস্থ ও অসচ্ছল সাংবাদিকদের জন্য ইতোমধ্যে এক কোটি টাকা হস্তান্তর করা হয়েছে।
দেশে সারের সংকট নেই, পর্যাপ্ত মজুত আছে: সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানান যে, দেশে সারের কোনো সংকট নেই, বরং চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘ক্ষেত্র বিশেষ বিতরণ প্রক্রিয়ার কিছু সমস্যা আছে, এই সাময়িক সমস্যা দূর করতে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।’
সার পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক বাজারের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কৃষকদের যেন কোনো ভোগান্তি না হয়, সে লক্ষ্যে ইতোমধ্যে প্রচুর সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। গত ২৪ আগস্ট সরকারি ক্রয় কমিটির বৈঠকে ৩ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়। এর এক সপ্তাহ আগে কানাডা, রাশিয়া ও সৌদি আরব থেকে আরও ১ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন সার ক্রয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।’
দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুতের তথ্য দিয়ে উপদেষ্টা জানান, বর্তমানে দেশে ইউরিয়া ৪.৮২ লাখ টন, টিএসপি ৩.৬৯ লাখ টন, ডিএপি ৩.৬৮ লাখ টন এবং এমওপি ১.৪৬ লাখ টনসহ মোট ১৩ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন সারের মজুত সংরক্ষিত রয়েছে। এর পাশাপাশি আরও বিপুল পরিমাণ সার আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানির অপেক্ষায় ও চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
বিতরণ ব্যবস্থার অসংগতি ও কতিপয় স্থানে সাময়িক সংকট নিয়ে তিনি বলেন, সরকার কৃষক ও জনগণের স্বার্থে বিতরণ ব্যবস্থায় সুনির্দিষ্ট কিছু পরিবর্তন আনছে। কিছু ডিলার সময়মতো বরাদ্দকৃত সার না তোলায় যে সাময়িক অস্থিরতা দেখা গেছে, তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বদলি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে।
পাশাপাশি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ সার পরিবহন সম্পন্ন হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনা ও এলনিনো’র মতো প্রাকৃতিক অনিশ্চয়তার ঝুঁকি সামনে রেখে সরকার দেশকে খাদ্য নিরাপত্তার বলয়ে রাখতে আগেভাগেই সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ সুনিশ্চিত করছে।
তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান ব্রিফিংয়ে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতের হালনাগাদ অগ্রগতি তুলে ধরেন। তিনি জানান, সরকারের বিরুদ্ধে ডিজিটালি ৪৬৪টি এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর নামে ১৫৭টি অসত্য ও অপতথ্য ছড়ানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। আইন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে প্যানেল আইনজীবী চূড়ান্ত করা হচ্ছে। দ্রুতই অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিশসহ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি, পিআইবির ‘বাংলা ফ্যাক্ট’ প্রকল্পকে ‘নিউ মিডিয়া প্রজেক্ট’-এর আওতায় আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম প্রতি ইউনিট ১২-১৪ ডলার থেকে লাফিয়ে ২৪ ডলারে পৌঁছেছে। বর্তমানে এফএসআরইউ দুর্ঘটনার কারণে সাময়িক বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সহনীয় করতে দেশীয় উৎস থেকে ১৭৫০ এমএমসিএফডি গ্যাস উত্তোলনে ১৫০টি কূপে খনন ও পুনঃখনন কাজ চলছে।
ভোলা থেকে পাইপলাইনে দ্রুত গ্যাস আনার কাজ চলছে। এছাড়া শিল্পকারখানার বকেয়া গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল এককালীন না নিয়ে ১২ মাসের কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে সরকার।
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে চতুর্থ প্রজন্মের এমআরসিএ মাল্টি রোল কমব্যাট ফাইটার এয়ারক্রাফট, অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি হেলিকপ্টার ও আধুনিক ইউএভি সিস্টেম ক্রয়ের আলোচনা চলছে।
ব্রিফিংয়ে উপদেষ্টা জানান, শিক্ষক ও কর্মচারীদের দীর্ঘ ৪ বছরের জমে থাকা অবসর কল্যাণ ভাতার ২০৩৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা সরাসরি ৬৪ জেলার শিক্ষকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ডিজিটাল মাধ্যমে পৌঁছানো হয়েছে। পাশাপাশি ৪১ লাখ পরিবারের জন্য ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে সর্বজনীন ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক বহুগুণ প্রভাব তৈরি করবে।
ব্রিফিংয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী আন্দালিভ রহমান, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, সচিব মাহবুবা ফারজানা এবং প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ উপস্থিত ছিলেন।
