৫ বছরে ২ হাজার কেজি সোনা আটক

স্বর্ণ চোরাচালানের প্রধান রুট শাহজালাল

গাজী আবু বকর : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গত ৫ বছরে ১ হাজার ৯১৪ কেজি সোনা আটক করা হয়েছে। এই বিমানবন্দর ঘিরে গড়ে উঠেছে দেশি-বিদেশি স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের বিস্তৃত মাফিয়া নেটওয়ার্ক। দুবাই, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবকেন্দ্রিক অন্তত অর্ধশত মাফিয়া সদস্য বিদেশে বসেই নিয়ন্ত্রণ করছে এই চক্র। দেশে তাদের হয়ে কাজ করছে দুই শতাধিক মাঝারি পর্যায়ের চোরাকারবারি। আর বিমান থেকে নিরাপত্তাবলয় পেরিয়ে সোনা বাইরে নিতে ব্যবহার করা হচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসেরই কিছু কর্মীকে। উড়োজাহাজের কার্গো কম্পার্টমেন্ট, টয়লেটের প্যানেল, এমন কি কর্মীদের পরিহিত পোশাকের ভেতরেও মিলছে কোটি কোটি টাকার সোনা। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি গত ছয় মাসে একজন কর্মী পাঁচটি চালান বিমান থেকে বের করার কথা স্বীকার করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, ভল্টে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আটককৃত প্রায় তিন হাজার কেজি সোনা রয়েছে।

সর্বশেষ গত শনিবার দুবাই-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের বাংলাদেশ বিমানের বিজি-১৪৮ ফ্লাইট থেকে ১২০টি স্বর্ণের বার উদ্ধারের ঘটনায় বিমানের অ্যাসিস্ট্যান্ট টেকনিক্যাল হেলপার মো. সোয়েব গাজীকে আটকের পর শাহজালালে সক্রিয় এই নেটওয়ার্কের নতুন তথ্য সামনে এসেছে। তার পরিহিত বেল্টের ভেতর কালো স্কচটেপে মোড়ানো অবস্থায় পাওয়া যায় ১৩ দশমিক ৯২ কেজি সোনা। কাস্টমসের হিসাবে এর আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ২৫ কোটি টাকা। গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে সোয়েব গত ছয় মাসে পাঁচটি চালান বের করার কথা জানিয়েছেন।

এই বিমানকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, সোনার প্রকৃত মালিক কে, তা তিনি জানেন না। বিমানের ভেতর কেউ একজন তাকে সোনা বুঝিয়ে দিতেন। তিনি তা বিমানের বাইরে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যেতেন। বিমানবন্দরের সামনে অপেক্ষমাণ প্রাইভেট কারে থাকা ব্যক্তিরা সেগুলো নিয়ে যেত। বিনিময়ে তিনি পেতেন কমিশন। স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে গতকাল সোয়েবকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

শুধু সোয়েব নন, তার সঙ্গে অন্তত আরও ১০ সহযোগী থাকার তথ্য পেয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রকৌশল বিভাগের চার কর্মীও রয়েছেন বলে বিমানবন্দর সূত্রের দাবি। পরিচ্ছন্নতাকর্মী জিয়া, সুমন, বেজি, ইসলাম শেখসহ আরও কয়েকজন কর্মী ও কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও তদন্তের আওতায় এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে— শাহজালালের কঠোর নিরাপত্তাবলয় ভেদ করে বারবার কীভাবে কোটি কোটি টাকার সোনা বিমান থেকে বাইরে
চলে যাচ্ছে?

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকায় সক্রিয় প্রধান চোরাকারবারিদের মধ্যে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত নরসিংদীর আনোয়ার, শরীয়তপুরের হান্নান শিকদার ও মুন্সীগঞ্জের জুমনের নাম রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সৌদি আরবে অবস্থানরত কুমিল্লার সাইফুল এবং দুবাইয়ে থাকা শওকত, মোস্তফা, নোমান ও নজরুলের নামও রয়েছে ওই তালিকায়। সূত্রের দাবি, বিদেশে অবস্থানকারী এমন অন্তত ৫০ ব্যক্তি বিভিন্ন পর্যায়ে এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে।

বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামরুল হাসান তালুকদার বলেন, সম্প্রতি শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে স্বর্ণ চোরাচালান বেড়ে গেছে। বেশ কিছু মামলা হয়েছে। আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করছি। ফলের আড়ালে স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানের মালিক গোলাম মোস্তফাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন এবং বেশকিছু তথ্য দিয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে তা প্রকাশ করা যাচ্ছে না। বেশকিছু বিমানের কর্মীর নাম বলেছেন, তাদের প্রতি নজরদারি করা হচ্ছে। সর্বশেষ বিমানের কর্মী সোয়েবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদে জড়িতদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহের পর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্বর্ণ চোরাচালানের বিস্তার বোঝা যায় বিমানবন্দর থানার মামলার পরিসংখ্যানেও। থানার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে সোনা চোরাচালানের ঘটনায় মোট ৫৩৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে ১১৪টি, ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ১৩৫টি, ২০২৩ সালে ১১২টি, ২০২৪ সালে ৮৪টি এবং ২০২৫-২৬ সালে ৯২টি মামলা হয়েছে। মামলার আসামি করা হয়েছে ৪৯০ জনকে। ঢাকা কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে শতাধিক অভিযানে প্রায় ২ হাজার কেজি সোনা জব্দ করা হয়েছে। জব্দ করা সোনার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।

কাস্টমসের অতিরিক্ত কমিশনার কামরুল হাসান বলেন, বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে স্বর্ণ চোরাচালানের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সব সংস্থার সমন্বয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে।

অর্থবছরভিত্তিক পরিসংখ্যানেও রয়েছে বিপুল পরিমাণ সোনা জব্দের তথ্য। ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৬৯৭ কেজি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৫৪ কেজি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪১৭ কেজি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬৮ কেজি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭৮ কেজির কিছু বেশি অর্থাৎ ৫ বছরে ১ হাজার ৯১৪ কেজি সোনা জব্দ হয়েছে।

অন্যদিকে একই সময়ে বৈধভাবে আমদানি করা সোনার বার ও অলংকার থেকে ২ হাজার ৩৮ কোটি টাকা শুল্ক-কর আদায় হয়েছে। অর্থাৎ বৈধ পথে সোনা আমদানির বিপরীতে বিপুল রাজস্ব আদায় হলেও অবৈধ পথে আসা সোনার প্রবাহও থামানো যাচ্ছে না।

চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে আসার পর বিভিন্ন সংস্থার অভিযানে জব্দ করা সোনা নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে জমা হয়। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে প্রায় তিন হাজার কেজি সোনা রয়েছে। এর মধ্যে মামলার আলামত হিসেবে থাকা সোনার বারের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ১১১ কেজি এবং স্বর্ণালঙ্কার রয়েছে প্রায় ৮১৯ কেজি। অর্থাৎ বিপুল পরিমাণ সোনা বছরের পর বছর আইনি প্রক্রিয়ায় আটকে থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে কার্যত জমে আছে প্রায় ২ হাজার ৯৩০ কেজি সোনা।

জব্দ করা সোনা নিলামের মাধ্যমে বিক্রির বিধান থাকলেও সেই নিলাম প্রক্রিয়া দীর্ঘ ১১ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে উদ্ধার করা বিপুল পরিমাণ সোনা রাষ্ট্রের রাজস্বে রূপান্তরিত না হয়ে বছরের পর বছর ভল্টে পড়ে আছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচারাধীন মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করে জব্দ করা সোনা নিলামে বিক্রি করা গেলে একদিকে বাজারে সোনার সরবরাহ বাড়বে, অন্যদিকে রাষ্ট্রও বিপুল রাজস্ব পেতে পারে।

শাহজালালে বিমানের ভেতর থেকে সোনা উদ্ধারের ঘটনা নতুন নয়। গত ২ জুলাই দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটের কার্গো হোল থেকে যৌথ বাহিনীর অভিযানে ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম সোনা উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনাতেও বিমানের ভেতরের নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর আগে গত ২৮ মার্চ রাতে দুবাই থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট ঢাকায় অবতরণের পর একটি গোয়েন্দা সংস্থার বিশেষ টিম উড়োজাহাজটির পেছনের কার্গো কম্পার্টমেন্টে তল্লাশি চালায়। একপর্যায়ে কার্গো অংশের টয়লেটের প্যানেলের ভেতর থেকে সাদা কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় ১৫৩টি সোনার বার উদ্ধার করা হয়। সোনার পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮ কেজি এবং সংশ্লিষ্টদের হিসাবে এর আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ৪৬ কোটি টাকা।

এ ঘটনায় বিমানের প্রকৌশল বিভাগের তিন মেকানিক ও হেলপারকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। তারা হলেন নূর-ইসলাম (মেকানিক), আবুল হোসেন (মেকানিক) ও মিজানুর রহমান (হেলপার)। তাদের পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। পরে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের পর পরিচয়পত্র ফেরত দেওয়া হলেও তদন্তের স্বার্থে মোবাইল ফোনগুলো এখনও আটক রাখা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই তিন কর্মী নির্ধারিত ডিউটি শেষ হওয়ার পরও ওভারটাইমে কাজ করছিলেন। বিষয়টি তদন্তকারীদের সন্দেহের কারণ হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দুবাই থেকে একজন বাহক সোনা নিয়ে বিমানে ওঠেন। চট্টগ্রামে যাত্রাবিরতির সময় চক্রের আরেক সদস্য একই ফ্লাইটে ওঠেন। পরে আকাশপথেই এক ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে সোনার চালান হস্তান্তর করা হয়। ঢাকায় পৌঁছানোর পর দুবাই থেকে আসা যাত্রী আন্তর্জাতিক টার্মিনাল দিয়ে বেরিয়ে যান। আর সোনার চালান নেওয়া দ্বিতীয় ব্যক্তি সোনা সঙ্গে নিয়ে অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। এভাবে যাত্রীদের চলাচল ও টার্মিনালের ব্যবস্থাপনার সুযোগ নিয়ে নিরাপত্তাবলয় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে চক্রটি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিমানপথে স্বর্ণ চোরাচালান বন্ধে শুধু যাত্রীদের তল্লাশি জোরদার করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। কারণ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোয় বিমানের কার্গো, টেকনিক্যাল অংশ, টয়লেট এবং কর্মীদের ব্যবহৃত সামগ্রীর মধ্যেও সোনা লুকানোর প্রমাণ মিলেছে। তাই বিমানকর্মী, প্রকৌশল বিভাগ, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এবং বিমানের কার্গো ও টেকনিক্যাল অংশে প্রবেশাধিকার রয়েছে- এমন প্রতিটি স্তরের কর্মীদের কার্যকর নজরদারির আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থানকারী চক্রের হোতাদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং দেশের ভেতরে সোনা গ্রহণকারীদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে হবে।

Share