এত শক্তিশালী সরকারকে যখন হটানো গেছে, এই সরকারকেও হটানো সম্ভব: শহিদুল আলম

নিজস্ব প্রতিবেদক : জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে আগের সরকারের মতো বর্তমান সরকারকেও জনগণ সরিয়ে দিতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন আলোকচিত্রী শহিদুল আলম।

সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘আমরা ভিন্ন জিনিস আশা করি আপনাদের থেকে। আপনারা ভিন্ন কথা বলেছেন বলে জনগণ আপনাদের ভোট দিয়েছে, কিন্তু জনগণের সাথে প্রতারণা করবেন না। আপনারা যেটা বলে এসেছেন, সেটাকে আমরা বিশ্বাস করি বলেই আপনাদের আমরা সুযোগটা দিয়েছি। সেই জায়গায় আপনারা থাকতে চেষ্টা করেন। যদি সেটা আপনারা না পারেন, এর আগের এত ক্ষমতাশালী সরকারকে যখন হটানো গেছে, এই সরকারকেও হাটানো সম্ভব।’

আজ শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে ‘মায়ের ডাক’-এর অন্যতম সদস্য ও মানবাধিকার কর্মী মুশফিকুর রহমান জোহান, চলচিত্র নির্মাতা মো. গোলাপ শাহ, আব্দুর রহমান, রিয়াদুল হাসান, নাফিস আমিন, মাবুব হোসেন ওপর হামলার প্রতিবাদে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন শহিদুল আলম।

হামলার ঘটনা নিয়ে শহিদুল আলম বলেন, ‘এটা একটা ছোটখাটো ঘটনা নয়। এটা পরিষ্কারভাবে শিল্পীদের ওপরে সরকারি অফিসের ভেতরে আক্রমণ হয়েছে। এটার তাৎপর্য আমাদের বুঝতে হবে। এটা যদি হতে পারে, তাহলে দেশটা কোথায়, দেশ কারা চালাচ্ছে, কীভাবে চালাচ্ছে সেই প্রশ্নগুলো করতে হবে। এটা হঠাৎ করে হয়নি, সংঘবদ্ধভাবে হয়েছে, পরিকল্পিতভাবে হয়েছে। কিছু মানুষকে ডাকা হয়েছে আক্রমণ করার জন্য। সরকারি অফিসের ডিজির অফিসের ভেতরে ঢুকে তারা এই আক্রমণটা করেছে। এটা কত বড়, কী ইঙ্গিত করে, সেটা বুঝতে হবে।’

এ ঘটনা নিয়ে শহিদুল আলম আরও বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ফুটেজ কীভাবে গায়েব হয়ে যায়? তিনি বলেন, ‘সিসিটিভি ফুটেজ হারিয়ে গেলে তার জন্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। কিন্তু আমরা দেখিনি সেই ধরনের কোনো ব্যবস্থা হয়েছে। কতটা ক্ষমতা থাকলে একটি প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ফুটেজ উধাও করে দেওয়া যায়—এই প্রশ্ন আমাদের করতে হবে।’

এই ঘটনায় শুধু বিভাগীয় ব্যবস্থা নিলেই চলবে না, আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে বলে উল্লেখ করেন আলোকচিত্রী শহিদুল আলম। তিনি বলেন, ‘এটি শুধু কয়েকজনের ওপর হামলা নয়, এটি শিল্পীর স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ। আমরা এই আক্রমণের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদ জানাতে এসেছি।’

গত ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় জুলাই আন্দোলন বিষয়ক তথ্যচিত্র নির্মাণের বকেয়া বিল আনতে গিয়ে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে (ডিএফপি) হামলার শিকার হন ‘মায়ের ডাক’-এর অন্যতম সদস্য ও মানবাধিকার কর্মী মুশফিকুর রহমান জোহান, চলচিত্র নির্মাতা মো. গোলাপ শাহ, আব্দুর রহমান, রিয়াদুল হাসান, নাফিস আমিন, মাবুব হোসেন।

সেদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ডিএফপি’র মহাপরিচালক (ডিজি) খালেদা বেগমের কক্ষে এ ঘটনা ঘটে।

অভিযোগ উঠেছে, ডিএফপির চিত্রগ্রাহক মো. মশিউর রহমানের নেতৃত্বে স্থানীয় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা এই হামলা করেছে। এতে মানবাধিকার কর্মী মুশফিকুর রহমান জোহানসহ চারজন চলচ্চিত্র নির্মাতা আহত হয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে নিজের ওপর হামলার বর্ণনা দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাতা গোলাপ শাহ জানান, তাঁরা তাঁদের নির্মিত তথ্যচিত্রের বকেয়া বিল নেওয়ার জন্য চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে গিয়েছিলেন। সেখানে বকেয়া বিল দেওয়া নিয়ে আলোচনা চলাকালে এক কর্মকর্তা তাঁদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন এবং পরে বহিরাগত ছাত্রদলের লোকজন এনে তাঁদের ওপর হামলা চালানো হয়।

গোলাপ শাহ বলেন, ‘হামলায় আমার মাথা ফেটে যায়, অন্য সহকর্মীদেরও গুরুতর আঘাত লাগে। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করছি।’

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী মোশফিকুর রহমান। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, গত ৩০ মার্চ তাঁরা তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে বকেয়া বিল নিতে যান। সেখানে এক কর্মকর্তা বিল পরিশোধে বাধা দেন এবং পরে বহিরাগত লোকজন এনে নির্মাতাদের ওপর হামলা চালানো হয়। হামলায় কয়েকজন আহত হন। পরে পুলিশ এলে সিসিটিভি ফুটেজ চাওয়া হলেও কর্তৃপক্ষ তা দেখাতে পারেনি। তাঁরা অভিযোগ করেন, প্রমাণ নষ্ট করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে সিসিটিভি ফুটেজ মুছে ফেলা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে এ ঘটনায় ছয় দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ঘটনার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিচ্যুত ও আইনের আওতায় আনা, হামলাকারীদের গ্রেপ্তার, সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধার, আহতদের চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ, সংস্কৃতিকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সরকারি অর্থায়নে চলচ্চিত্র নির্মাণে আর্থিক অনিয়ম বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী রেজাউর রহমান (লেনিন), শিল্পী রীতু সাত্তার এবং চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা জাহিন ফারুক আমিন।

Share