
নয়াবার্তা প্রতিবেদক : এলাকায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, ফুটপাতের নিয়ন্ত্রণ, ডিশ-ইন্টারনেট ব্যবসা এবং চাঁদাবাজির ভাগবাটোয়ারা নিয়ে সংঘাতে রাজধানীতে একের পর এক বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী হত্যার শিকার হচ্ছেন। কোথাও সালিশ বৈঠকে কুপিয়ে হত্যা, কোথাও ফুটপাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ছুরিকাঘাত, আবার কোথাও এলাকায় প্রভাব বিস্তারের দ্বন্দ্বে গুলিতে প্রাণ যাচ্ছে সরকার দলীয় নেতাদের।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, চলতি বছর মে মাস পর্যন্ত ৫ মাসে সারা দেশে ৩৪৭টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫৫ জন এবং আহত হয়েছেন ২ হাজার ৬৩৬ জন। এরমধ্যে দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ঘটনাই সবচেয়ে বেশি, ৭৯টি। এসব ঘটনায় ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন অন্তত ১৪ জন নিহত ও ৭৪৫ জন আহত হয়েছেন।
আর শুধু রাজধানীতেই গত এক মাসেরও কম সময়ে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের অন্তত তিন নেতাকর্মী হত্যার শিকার হয়েছেন। এছাড়া চলতি বছরের শুরুতে এবং গতবছরের নভেম্বরেও দুজন হত্যার শিকার হন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব ঘটনার বড় অংশের পেছনে রয়েছে অভ্যন্তরীণ বিরোধ, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব।
সালিশ বৈঠক থেকে হত্যাকাণ্ড
রাজধানীর আদাবরের নবোদয় কাঁচাবাজারে বুধবার (১ জুলাই) রাত সাড়ে ৯টার দিকে পূর্ববিরোধের জেরে একটি সালিশ বৈঠক বসে। ওই সালিশ চলাকালেই হামলার ঘটনা ঘটে। কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয় ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল বাসার বাদশা এবং থানা বিএনপির সভাপতি সাদ্দাম হোসেনকে। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আবুল বাসার বাদশা। গুরুতর আহত সাদ্দাম হোসেন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, সালিশের ঘটনা সামনে থাকলেও এর পেছনে স্থানীয়ভাবে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধ ছিল।
আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দোষীদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। যে কোনও সময় তারা আইনের আওতায় আসবে।’
ফুটপাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিল্লাল হত্যা
এর আগে ৮ জুন রাতে রাজধানীর মৌচাকের আনারকলি মার্কেটের সামনে রমনা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক বিল্লাল হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফুটপাতের চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ রাহাৎ খান বলেন, ‘এ ঘটনায় পাঁচ আসামিকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। ফুটপাতের চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।’
ডিশ-ইন্টারনেট ব্যবসা ও প্রভাব বিস্তারের দ্বন্দ্ব
রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকায় গত ১২ জুন গুলিবিদ্ধ হন ‘কাইল্যা পলাশ’ নামে এক ব্যক্তি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ জুন তার মৃত্যু হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর সম্প্রতি মুক্তি পেয়ে তিনি এলাকায় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। পরে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা এবং চাঁদাবাজি নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। এর জেরেই প্রতিপক্ষের গুলিতে তিনি আহত হন এবং পরে মারা যান।
হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারে আমরা কাজ করছি।
আলোচিত দুই হত্যা
চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি রাজধানীর তেজগাঁও থানার তেজতুরী বাজার এলাকায় মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আজিজুর রহমান মোসাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি সে সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই মোসাব্বির হত্যাকাণ্ড ঘটে। এ ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এর আগে গত বছরের ১৭ নভেম্বর পল্লবীতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। মোসাব্বির হত্যার মতো গোলাম কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডও ব্যাপক আলোচিত হয়।
‘দলীয় শৃঙ্খলার দুর্বলতাই বড় কারণ’
বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের চেয়ারম্যান ড. কুদরাত-ই-খুদা বলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের নানা ঘটনা দৃশ্যমান হয়েছে। এর নেপথ্যে রয়েছে চাঁদাবাজি, এলাকা নিয়ন্ত্রণ, দলীয় অবস্থান শক্ত করতে প্রভাব খাটানো এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব।
তিনি বলেন, প্রতিপক্ষরা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে হত্যার মতো ভয়ঙ্কর অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে নিয়মনীতি ও শৃঙ্খলা কার্যকর থাকলে এ ধরনের ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
তার মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সহিষ্ণুতার ঘাটতি রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর এমন কোনও কর্মকাণ্ডে জড়ানো উচিত নয়, যা সমাজে বিরূপ প্রভাব ফেলে।
ড. কুদরাত-ই-খুদা বলেন, রাজনীতিতে হত্যাকাণ্ড তো দূরের কথা, সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য দলের হাইকমান্ডকে সংগঠন পরিচালনায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। দলীয় নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে খুনোখুনির ঘটনাও কমবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল বলেন, এসব খুন বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বা চাঁদাবাজির কারণে হয়েছে কিনা, তা বলতে পারবো না। তবে বিএনপি যেহেতু একটি বড় দল, তাই ক্ষমতাসীন হওয়ার পর অনেকেই অনেক সুবিধা নিতে তৎপর থাকতে পারে। এ কারণে অনেক সময় এমন ঘটনা ঘটতে পারে। তবে কারও বিষয়ে অভিযোগ প্রমাণিত হলে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। দলীয় হাইকমান্ড বিষয়টি নিয়ে জিরো টলারেন্সে আছে। আশা করি দল সঠিক সময়েই সঠিক পদক্ষেপ নেবে।
৫ মাসে ঢাকায় ৯৪ হত্যাকাণ্ড
শুধু রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নয়, বিভিন্ন কারণে রাজধানীতে খুনখারাবির ঘটনা এমনিতে অহরহ ঘটছে। খোদ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত রাজধানীতে সবমিলিয়ে ৯৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৬টি, মার্চে ২৪টি, এপ্রিলে ১৭টি এবং মে মাসে ১৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এন এম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিটি ঘটনার রহস্য উদঘাটন এবং আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশ কাজ করছে। অপরাধীদের গ্রেফতারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।’
