একাত্তর কারও কাছে পরাজয়ের গ্লানি হতে পারে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বিশেষ প্রতিবেদক : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, “একাত্তর এবং ৭২ সংবিধান কেন ভালো লাগে না আমরা বুঝি তো। একাত্তর এই দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা, স্বাধীনতা যুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ, বিজয় অর্জন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া—সবই এক কাতারে গাথা। এদেশের মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন, বিজয় গাথা। কারো কারো জন্য হতে পারে এটা পরাজয়ের গ্লানি।

সংবিধানে মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনর্বহাল এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।

তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, সংবিধানের কোনো সংস্কার হয় না, বরং প্রয়োজনীয় পরিবর্তন বা সংযোজন সংশোধনীর মাধ্যমেই করতে হবে এবং এই সংসদই হচ্ছে তার জন্য সর্বোচ্চ সার্বভৌম স্থান।

রোববার (৫ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ অধিবেশনের অষ্টম দিনে নোয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুকের আনা ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫ ভবিষ্যতের পথরেখা—একটি রাজনৈতিক সমঝতার দলিল’ শীর্ষক প্রস্তাবের ওপর মুলতবি আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।

সংবিধানে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস ফেরানোর ঘোষণা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সংবিধানে মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, যা বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্মূল করে দিয়েছে। আমরা এটি আবার পুনর্বহাল করতে চাই। এটি জুলাই সনদেও থাকতে পারতো, কিন্তু কিছু দলের আপত্তির কারণে রাখা হয়নি। তবে আমরা আমাদের ম্যান্ডেট অনুযায়ী এটি ফিরিয়ে আনব।


‘সংস্কার’ নয়, ‘সংশোধন’ হবে সংসদে
সংবিধানের সংস্কার বা পুনর্লিখন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সংবিধান রহিত হয়, স্থগিত হয় বা সংশোধিত হয়—কিন্তু সংস্কার হয় না। যারা বিদেশ থেকে সংস্কার প্রস্তাব আমদানি করেছেন, তাদের বলতে চাই, যা কিছুই পরিবর্তন হবে, তা এই সংসদেই হবে। সংসদই সর্বোচ্চ সার্বভৌম ক্ষমতা রাখে। জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত এই সংসদই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “একাত্তর এবং ’৭২-এর সংবিধান কেন ভালো লাগে না আমরা বুঝি তো।

একাত্তর এই দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা, স্বাধীনতা যুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ, বিজয় অর্জন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া—সবই এক কাতারে গাথা। এদেশের মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন, বিজয় গাথা। কারো কারো জন্য হতে পারে এটা পরাজয়ের গ্লানি।”


জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিশেষ কমিটির প্রস্তাব
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ ঐতিহাসিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তার পদ্ধতি নির্ধারণে আমরা সরকারি ও বিরোধী দল মিলে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করতে পারি। যেখানে স্বতন্ত্র সদস্যরাও থাকবেন। আলোচনার মাধ্যমেই আমরা জুলাই ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের অভিপ্রায়কে সংবিধানে ধারণ করব।’

স্বাধীনতার ঘোষণা ও তফসিল সংশোধন
ইতিহাস বিকৃতির সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে তথাকথিত কিছু তফসিল যুক্ত করা হয়েছে, যা ইতিহাসের পরিপন্থি। ২৬ ও ২৭ মার্চ শহীদ জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা বিশ্বস্বীকৃত। সংবিধানে যুক্ত করা মিথ্যা তফসিল ৫, ৬ ও ৭ বিলুপ্তির জন্য সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব রয়েছে এবং আমরাও এতে একমত।’

উচ্চকক্ষ ও গণভোট বিতর্ক
উচ্চকক্ষ গঠন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ১০০ সদস্য বিশিষ্ট উচ্চকক্ষ প্রবর্তনের বিষয়ে তারা ম্যান্ডেট পেয়েছেন। তবে গণভোট নিয়ে আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের সূত্র ধরে তিনি বলেন, ‘গণভোটের মাধ্যমে যে সব প্রশ্ন জনগণের সামনে আনা হয়েছে, তার অনেক কিছুই জুলাই সনদের মূল চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক। অনেক জায়গায় গোঁজামিল দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে।’

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সচিবালয়
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতের অঙ্গীকার করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌম একটাই, সেটা হলো জনগণ এবং এই সংসদ। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় এবং বিচারক নিয়োগে আমরা শক্তিশালী আইন প্রণয়ন করব, যাতে আর কোনোদিন ‘শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ’ বিচারক হিসেবে দেখতে না হয়।

বক্তব্যের শেষে তিনি জুলাই বিপ্লবের শহীদের স্বপ্ন এবং গণঅভ্যুত্থানের আবেগকে সম্মান জানিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের আহ্বান জানান।

Share