আইনজীবীর বিরুদ্ধে ৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ

বিশেষ প্রতিনিধি : সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে ম্যানেজ করা এবং রায় পক্ষে’ আনার কথা বলে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৫ কোটি সাড়ে ২১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে হাসেম নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এই ব্যক্তি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিলেও তিনি মূলত জজ কোর্টের আইনজীবী।

মঙ্গলবার (১৯ মে) সুপ্রিম কোর্টে এক সংবাদ সম্মেলেন রাজধানীর ফুলবাড়িয়ার সিটি প্লাজা মার্কেটের বেজমেন্টের ব্যবসায়ী কেএম সোহেল এই অভিযোগ করেন।

কেএম সোহেল নামের এই ব্যক্তি তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী এবং সিটি প্লাজা মার্কেটের বেজমেন্টের ব্যবসয়ী সমিতির সভাপতি।

এ ঘটনায় তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও ঢাকা আইনজীবী সমিতিতে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পাশাপাশি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) মামলাও করেছেন।

সিটি প্লাজার বেজমেন্টে ১৯৯৭ সাল থেকে ৫৩১টি দোকানে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন ব্যবসায়ীরা।

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের বাসিন্দা এবং ‘আদি বাংলা’ গার্মেন্টসের মালিক কেএম সোহেল সাংবাদিকদের জানান, সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন ও শেখ ফজলে নূর তাপসের সময় দোকানগুলোর বৈধতা নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হলে ব্যবসায়ীরা আইনি লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নেন। মামলা পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে হাইকোর্টে আইনজীবী খুঁজতে গিয়ে আবুল হাসেমের শরণাপন্ন হন তিনি।

চুক্তির বিষয়ে কেএম সোহেল বলেন, ‘উনি নিজেকে সুপ্রিম কোর্টের একজন লইয়ার হিসেবে পরিচয় দেন। আমার এই মামলা পরিচালনা করার জন্য, আমার সাথে একটা লিখিত চুক্তি করে। চুক্তি করার পরে ও বলে যে, আপনি তো মামলার পিটিশনার না, আপনি মার্কেটের সভাপতি। এই মুহূর্তে আপনাকে অ্যাডেড পার্টি করানো যায়। অ্যাডেড পার্টি করলে আপনি মামলার সমস্ত বেনিফিটটা পাবেন। এর জন্য ওর প্যাডের মধ্যে আমার কাছে লিখিত দিয়ে ৫০ লাখ টাকা নেয়, কিন্তু আমাকে অ্যাডেড পার্টিও করেনি।’

মামলার বিভিন্ন পর্যায়ে কোর্ট ও বিচারক ম্যানেজ করার কথা বলে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করে সোহেল বলেন, ‘হাসেমের বক্তব্য ছিল এরকম, আপনাদের এই বেজমেন্টে কার পার্কিং থাকবে, সেখানে দোকান হবে, এটা স্বাভাবিক ব্যাপার না। এটার অর্ডারটা নিতে হবে, নিতে হলে কোর্ট ম্যানেজ করতে হবে। অমুক জায়গায় এক কোটি টাকা দিতে হবে, ঐ স্যাররে ৫০ লাখ দিতে হবে– এইভাবে। তো এদের নাম দিয়ে আমাদের কাছ থেকে টাকাগুলো নিয়েছে। কোনো একটা রায়ের জন্য ১ কোটি ৬২ লাখ টাকা নেয়, সেটার ডকুমেন্টসও আমাকে দেয়। সর্বমোট আমার কাছ থেকে নিয়েছে ৫ কোটি ২১ লাখ ৫০ হাজার টাকা।’

তবে এসব লেনদেনে বিচারপতিদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো বিচারপতির সাথে আমার দেখাও হয়নি, কথাও হয়নি, টাকার বিনিময়ও হয়নি। তারা তো টাকা পয়সা নেয়নি, দুই নাম্বারি করেনি, ঘুষ খায় নাই। ঘুষ বা দুই নাম্বারিটা করছে অ্যাডভোকেট আবুল হাশেম। উনাদের নাম বিক্রি করেছে। কিন্তু বিচারপতিরা তো ১০ টাকাও আমাদের কাছে চায়নি।’

প্রভাব বিস্তারের জন্য হাসেম তাকে এক বিচারপতির (নাম প্রকাশ করা হলো না) খাস কামরায় পেছনের দরজা দিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ করেন সোহেল।

তিনি বলেন, ‘যেই সময়– স্যার নেই, তখন রুমে নিয়ে বসাইছে, চা খাওয়াইছে, সবই করছে– যে এই রুম আমাদেরই। আমাকে দেখাইছে, যে এই রুমগুলো সব আমার।’

এরপর প্রতারণা বুঝতে পেরে ব্যবসায়ীরা নিজেরাই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন, প্রবীর নিয়োগী ও মোহাম্মদ শিশির মনিরকে নিয়োগ দিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে নিজেদের পক্ষে রায় পান বলে জানান সোহেল।

প্রাপ্ত অভিযোগপত্র, হলফনামা, জাতীয় পরিচয়পত্র ও অন্যান্য নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৬৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করা মো. আবুল হাসেমের বাবা মৃত চাঁদ মিয়া এবং মায়ের নাম সুফিয়া খাতুন। কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের চান্দলা গ্রামের এই স্থায়ী বাসিন্দা বর্তমানে ঢাকার পল্টনের আউটার সার্কুলার রোডের অমিত আলফা ক্যাসেলের একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করেন।

তিনি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী না হলেও সুপ্রিম কোর্টে মামলার কন্ট্রাক্ট নিতেন। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নথিমতে তিনি মূলত ঢাকা আইনজীবী সমিতির (ঢাকা বার) সদস্য, যেখানে তার তালিকাভুক্তির তারিখ ২০০৯ সালের ৫ ডিসেম্বর এবং সদস্য নম্বর ১৯৯৬৮। পুরানা পল্টনের ইব্রাহিম ম্যানশনে নিজের চেম্বারের ঠিকানা ব্যবহার করলেও সুপ্রিম কোর্ট বার ভবনের এনেক্স ভবনের ২১৬ নম্বর রুমটিতেও তিনি বসেন বলে একটি অঙ্গীকারনামায় দাবি করেছিলেন।

প্রাপ্ত একটি কাগজে দেখা যায়, ইব্রাহিম ম্যানশনের ঠিকানাযুক্ত প্যাডে নিজ স্বাক্ষর ও সিল দিয়ে তৈরি করা একটি বিলেই তিনি সর্বমোট এক কোটি চার লাখ টাকা গ্রহণ করেছেন। ওই হিসাবের নথিতে অ্যাডভোকেট সোহেল রানার নামে দুই লাখ, অ্যাডভোকেট মাহবুবুল ইসলাম হিরার নামে তিন লাখ এবং বিবিধ খরচের নামে এক লাখ টাকা নেওয়ার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে শাহবাগ থানায় তদন্ত চলমান রয়েছে এবং শাহবাগ থানার এসআই আল মোমেন এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানান সোহেল।

এদিকে সার্বিক বিষয়ে জানতে মো. আবুল হাসেমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ৫ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে উল্টো কেএম সোহেলের মামলার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

তিনি বলেন, ‘সে কি মামলার বাদী না বিবাদী? তার তো কোনো পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি নাই। তার থেকে আমি টাকা নেব কেন, আর তার সাথে আমি কন্টাক্ট করব কেন? তারে জিজ্ঞাসা করেন যে আপনি মামলার বাদী না বিবাদী?”

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কি না– এমন প্রশ্নের জবাবে হাসেম বলেন, “না না না, আমি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী না, আমি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের আইনজীবী। ঢাকা বারের।”

ঢাকা বারের আইনজীবী হয়ে হাইকোর্টে মামলার কন্ট্রাক্ট নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি হাই কোর্টে কন্ট্রাক্ট নিই নাই তো। আপনার কাছে প্রমাণ থাকলে আপনি প্রকাশ করে দিয়েন।’

বিচারপতির রুমে নেওয়ার বিষয়ে তিনি সোহেলের বিরুদ্ধে রায় চুরির পাল্টা অভিযোগ তুলে বলেন, ‘আমি কেন নিব? সে তো নিজে জাজমেন্ট চুরি করছে। বিচারপতির (নাম প্রকাশ করা হলো না) ওখান থেকে জাজমেন্ট চুরি কইরা নিয়া আসছিল। পরে তো… আবার আইনা দিছে, সে জাজমেন্ট চুরি।”

Share