
গাজী আবু বকর : জুলাই অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো যাচাই করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যেসব হত্যা মামলা দায়ের করেছে অন্তর্বর্তী সরকার, সেসবও যাচাই-বাছাই করা হবে।’ তিনি আজ বুধবার জেলা প্রশাসক সম্মেলনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত অধিবেশনে জেলা প্রশাসকদের নিকট ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হওয়া অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর জেলাভিত্তিক তথ্য চেয়েছেন। এছাড়াও পুশ-ইন ইস্যুতে সীমান্তে সতর্কতার নির্দেশনাও দিয়েছেন। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের শেষ দিনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত অধিবেশন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের এ কথা জানান।
জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের আগপর্যন্ত ওই সরকার দায়িত্ব পালন করেছিল।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ৫ আগস্টের পর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু মামলা হয়েছে, যেগুলো গণহত্যার মামলা এবং আওয়ামী ফ্যাসিবাদীর বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা। এখানে তাঁদের (ডিসি) কাছে তালিকা চাওয়া হয়েছে, জেলাওয়ারি কতগুলো মামলা হয়েছে। এগুলো রিমোট জেলায় হয়তো কম, কিন্তু মহানগরগুলোতে একটু বেশি। এগুলো পাবার পর যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে। এসব মামলা যাচাইয়ের উদ্যোগের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, অনেক মামলার মধ্যে হাজার হাজার লোককে আসামি করা হয়েছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে প্রকৃত অর্থে প্রকৃত আসামি কারা। সেটা তদন্ত কর্মকর্তারা তদন্ত করে দেখবেন, যাতে স্বল্প সময়ের ভেতরে সেটি ডিসপোজড (নিষ্পত্তি) করা যায়। আর যাঁদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তাঁদের যাতে নিষ্কৃতি দেয়, সেই সুপারিশ করেছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি আইনিভাবে নিষ্পন্ন করা হবে। মামলাগুলো নিয়ে তথ্য পাঠাতে ডিসিদের কত দিন সময় দেওয়া হয়েছে, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যথাশিগগির’। তবে মৌখিকভাবে সর্বোচ্চ এক মাসের মধ্যে পাঠাতে বলা হয়েছে। কেউ যদি দেরি করে থাকে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে সেটাও বিবেচনা করা হবে।
পুশ-ইন ইস্যুতে সীমান্তে সতর্কতার নির্দেশ: পুশ-ইন ইস্যুতে সীমান্তে বিজিবিকে সতর্ক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তবে তিনি ধারণা করছেন, এমন কিছু ঘটবে না।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনে বিজেপি জয় লাভ করায় সাংবাদিকদের করা এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেখতে পেয়েছি বিজেপির নেতারা নির্বাচনের আগেই সে দেশের মুসলিমদের বাংলাদেশে পুশ-ইন করার ঘোষণা দিয়েছিল। তবে আমার ধারণা সেরকম কিছু ঘটবে না।’ তাদের জয়ের পর বাংলাদেশে পুশব্যাক বাড়তে পারে কি না? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা গত মঙ্গলবারেই বিজিবিকে নির্দেশ দিয়েছি, যাতে সীমান্তে তারা একটু সতর্ক থাকে। কারণ সেরকম কোনো সম্ভবনা দেখি না, যদি হয় যাতে তারা এড্রেস করতে পারে।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দায়ের করা হাজার হাজার মামলা এক মাসের মধ্যে যাচাই-বাছাই করে তথ্য দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যেসব হত্যা মামলা দায়ের করেছে অন্তর্বর্তী সরকার, সেসবও যাচাই-বাছাই করা হবে।’
আওয়ামী লীগের আমলে যেসব গায়েবি মামলা করা হয়েছিল, সেসব মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানীর সড়ক ও রেললাইনের পাশে কোনো পশুর হাট বসতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে মহাসড়ক ও রেললাইনের আশপাশে পশুর হাট বসানো বন্ধ থাকবে। পাশাপাশি পশুর হাটে জাল নোট শনাক্তে প্রয়োজনীয় মেশিন স্থাপন করা হবে।’ বড় পশুর হাটগুলোতে পুলিশের বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরা ব্যবহার এবং সার্বক্ষণিক নজরদারি জোরদার করা হবে বলে জানান মন্ত্রী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় ইস্যু করা প্রায় ১০ হাজার লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্র এখনো জমা পড়েনি।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার এবং আসন্ন ঈদুল আযহার প্রস্তুতিসহ বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া এসব আগ্নেয়াস্ত্র দ্রুত জমা ও উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনে মামলা দায়ের ও অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করার কথাও জানান তিনি।
২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত নীতিবহির্ভূতভাবে দেওয়া লাইসেন্সগুলো জেলা পর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করার এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দায়ের করা রাজনৈতিক ও হয়রানিমূলক ‘গায়েবি’ মামলাগুলো প্রত্যাহারের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সুপারদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি এসব আবেদন যাচাই করবে। তবে হত্যা, অস্ত্র ও মাদক পাচারের মতো গুরুতর অপরাধের মামলা এই প্রক্রিয়ার বাইরে থাকবে।
