
গাজী আবু বকর : ২ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি নিয়ে সম্ভাব্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ঘোষণা করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এক ক্রান্তিকালে বিশেষ করে অর্থনৈতিক খাতে বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যেও এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় আকারের বাজেট ঘোষণা সরকারের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। এই বাজেট আকারের দিক থেকে যেমন একটি রেকর্ড, তেমনি ঘাটতিতেও একটি রেকর্ড। আর এ ঘাটতি পূরণে ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি থাকবে জিডিপির ৪ শতাংশ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম হতে পারে ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ণ ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ। সবার জন্য উন্নয়ন’ অথবা ‘অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির নতুন বাংলাদেশ’। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত শিরোনাম চূড়ান্ত হয়নি বলে জানা গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিভাগ থেকে মোট ছয়টি নামের প্রস্তাব করা হয়েছিল। নামগুলোর মধ্যে ছিল—‘অর্থনীতির বিনিয়ন্ত্রণকরণ: সবার জন্য উন্নয়ন’, ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ণ ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ: সবার জন্য উন্নয়ন’, ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ণ ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির অভিযাত্রায় বাংলাদেশ’, ‘মানবিক, কল্যাণমূলক ও উৎপাদনমুখী দেশ, কর্মসংস্থান, সুশাসন, সমতায় সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’, ‘বৈষম্যহীন, টেকসই ও ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি গড়ার প্রত্যয়’। শেষ শিরোনামটি ছিল ‘অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির নতুন বাংলাদেশ’। অর্থমন্ত্রী এর মধ্য থেকে যেকোনো একটি বেছে নেবেন।
অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, এবারের বাজেটে সরকারের মূল দৃষ্টি থাকবে ডি-রেগুলেশন এবং সৃজনশীল অর্থনীতি দিয়ে ট্রিলিয়ন ডলারের রূপরেখা বাস্তবায়নে। পাশাপাশি দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বাজেটে বিশেষ দৃষ্টি থাকবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে। এসব খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপি সরকারের ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচি হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘কৃষক কার্ড’কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বাজেটে। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আর্থিক খাতের দুঃশাসনের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরবেন। বক্তৃতার একটি জায়গায় বলা হয়েছে, ২০০৬ সালে বিএনপি সরকার বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ রেখে গিয়েছিল ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। ফ্যাসিবাদী সরকার পতনের সময় ৩০ জুন ২০২৪ সালে তা ছয় গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, যা সত্যিই উদ্বেগজনক। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাখা ৬৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ প্রায় ১৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকায়। সরকারের সুদ ব্যয়ের চিত্র সবচেয়ে উদ্বেগজনক। ২০০৫-০৬ সালে যেখানে সুদ পরিশোধ ছিল মাত্র ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ১৩ গুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ লাখ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধন করে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে এনবিআর থেকে প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হতে পারে। আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপির তুলনায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বেশি এবং সংশোধিত এডিপির তুলনায় ১ লাখ কোটি টাকা বেশি। চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধন করে ২ লাখ কোটি টাকা করা হয়েছে। উন্নয়ন বাজেটের মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা দেশীয় উৎস থেকে এবং ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে। এছাড়া অনুদান হিসেবে ৫ হাজার কোটি টাকা পাওয়ার আশা করছে সরকার। আয় ও ব্যয়ের এই কাঠামোর ভিত্তিতে আগামী অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি এবং সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি। বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার নির্ধারণ করা হতে পারে ৬৮ লাখ ৩১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ লাখ ৪৪ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা, যা সংশোধন করে ৬১ লাখ ২১ হাজার ৯১০ কোটি টাকা করা হয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় রাখতে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
