মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থানের তুলনা করাটাই অন্যায়: সংসদে ফজলুর রহমান

গাজী আবু বকর : ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে পাকিস্তান শাসনামলের ২৩ বছরের রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামের ভিত্তির উপর পরিচালিত ১৯৭১ এর ৯ মাসের সশস্ত্র মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যখন এক মাসের গণআন্দোলনকে তুলনা করা হয়, তখন মুক্তিযুদ্ধকে ছোট করা হয় বলে মন্তব্য করেছেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এ বাংলায় শুধু বেলি-চামেলি আর জুঁই ফুল ফোটে না, রক্ত জবাও ফোটে। এ দেশে শুধু কোকিল ডাকে না, এদেশের জঙ্গলে রয়েল বেঙ্গল টাইগারও থাকে। যতদিন রয়েল বেঙ্গল টাইগার থাকবে, মুক্তিযোদ্ধা জিতবে, রাজাকার কোনোদিন এই দেশে জয়লাভ করতে পারবে না। আমি চ্যালেঞ্জ করে বললাম।’ আজ মঙ্গলবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৩তম দিনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবে আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব দাবি করেন।

মুক্তিযুদ্ধকে চব্বিশের ৫ আগস্টের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে মন্তব্য করে এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘তাদের যারা শহীদ হয়েছে , তাদের প্রতি আমি শ্রদ্ধা নিবেদন করি। আগস্ট মাসকে আমি ছোট করে দেখি না। তবে চব্বিশের আগস্ট মাসে কোনো বিপ্লব হয়নি। আগস্ট হয়েছে গণঅভ্যুত্থান। সেই গণঅভ্যুত্থানকে যারা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করতে চায়, তাদের আমি বলব, এ কথাটা বলা অন্যায়। কারণ হিমালয়ের সঙ্গে টিলার তুলনা করা যেমন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ৫ আগস্টের তুলনা করা ঠিক তেমন।’
অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমার বক্তব্যের পরে তারা বলবে- আমরা কি মুক্তিযুদ্ধ করি নাই! বিরোধী দলে যারা বসে আছেন, অনেকেই আমাকে ফজা পাগলা বলে ডাকে, তারা নাকি সভ্য।’ তিনি বলেন, ‘বিরোধী দলের নেতা বলেছেন ওনি নাকি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক, শহীদ পরিবারের লোক এবং উনি জামায়াতে ইসলামী করেন। এটা ডাবল অপরাধ।’

৫ আগস্টের পরে কী হলো আপনারা জানেন জানিয়ে ফজলুর রহমান বলেন, ‘ইউনূস সরকার ছিল। আমি শিল্পকলার সামনে থাকি। সেখানে একটা গান হতে পারেনি, নাটক হতে পারেনি, লালন গীতি হতে পারেনি। সবকিছু কালো শক্তি ধ্বংস করে দিয়েছিল।’ আমার বাড়ির সামনে মব হয়েছে আমাকে হত্যা করার জন্য জানিয়ে এই সংসদ সদস্য বলেন, সেদিনের জন্য আমি পুলিশকে ধন্যবাদ দেবো, মিলিটারিকে ধন্যবাদ দেবো। ১০ মিনিটের মধ্যে আমার বাড়ির সামনে তারা গিয়ে উপস্থিত হয়েছে আমাকে বাঁচানোর জন্য।’
অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান বলেন, ৫ আগস্টের যোদ্ধাদের আমি ছোট করে দেখছি না। যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের প্রতি আমি শ্রদ্ধা নিবেদন করি। আমি নিজেও এই আন্দোলনে ছিলাম। শেখ হাসিনার পতন না হওয়া পর্যন্ত আমার যুদ্ধ চলবে বলেছিলাম। কিন্তু ৫ আগস্ট কোনো বিপ্লব নয়, এটি হলো গণঅভ্যুত্থান। সেই গণঅভ্যুত্থানকে যারা মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তুলনা করতে চায়, আমি বলবো এটা বলাই অন্যায়। কারণ মুক্তিযুদ্ধ মহাসমুদ্রের চেয়েও গভীর।

অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান বলেন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম একদিনে হয়নি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই ১৯৭১ সনে শহীদ জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
সংসদে স্বাধীনতাবিরোধীদের উদ্দেশ্য করে এই প্রবীণ রাজনীতিক বলেন, যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, এদেশের জঙ্গলে রয়েল বেঙ্গল টাইগার থাকবে-ততদিন মুক্তিযোদ্ধারা জিতবে, রাজাকাররা কোনোদিন এদেশে জয়লাভ করতে পারবে না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে সংঘটিত পুলিশ হত্যা, থানা লুট ও অস্ত্র হারানোর ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান এসব ঘটনার যথাযথ তদন্ত ও বিচারের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ৫ আগস্টের ঘটনায় যেসব পুলিশ নিহত হয়েছে তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন এই সংসদ সদস্য।

ফজলুর রহমান বলেন, ‘৫ আগস্টের পরে যে থানা লুট হয়েছে, পুলিশ হত্যা হয়েছে, তারা তো তখন যুদ্ধ করেনি, তারা তো নিরপরাধ। এত অস্ত্র গেল কোথায়? ৫ আগস্টের পরে যে ঘটনাগুলো হয়েছে সেগুলো তো কোনো আইনে ইনডেমনিটি পাওয়ার কথা না। সেটার জন্য তদন্ত হওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিশ্চয়ই আমার নেতা, তিনিও শুনছেন। আমি কথাগুলো বলছি, ৫ আগস্টের পরে যে ঘটনাগুলো হয়েছে সেগুলো নিয়ে। ৫ আগস্টের পরবর্তীতে তো কোনো আইনে ইনডেমনিটি পাওয়ার কথা না।’
বিএনপির এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘৫ আগস্টের আগে পুলিশ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা যদি সে সময় অন্যায় করে থাকে তাদের বিচার হোক। কিন্তু আমি মনে করি তারা তো দেশের নাগরিক। পুলিশের মা, বাবা ও সন্তান রয়েছে। অন্তত রাষ্ট্রের তাদের কাছে গিয়ে বলা উচিত, তোমার সন্তান যদি নিহত হয়ে থাকে আমরা তোমাদের দেখব।’

ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমি কমান্ডার ছিলাম, আপনি (স্পিকার) বীরবিক্রম ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বরের (১৯৭১ সালের) পরে শত শত রাজাকার আমার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। আমি কাউকে হত্যা করিনি। সবাইকে জেলে পাঠিয়েছি। তার বিচার হবে।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান বলেন, কোনো মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদ পরিবারের সদস্য জামায়াত করতে পারে না। ফজলুর রহমানের এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদে বিরোধীদলীয় সদস্যরা হট্টগোল শুরু করেন। পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীরবিক্রম) সংসদ সদস্যদের শান্ত করেন। হট্টগোল চলাকালে ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমি আবারও বলছি, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াত করতে পারে না। যদি কেউ করে থাকে তাহলে তিনি দ্বিগুণ অপরাধ করছেন।

Share