
বিশেষ প্রতিনিধি : সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন নতুন খাতে বন্ডেড ফ্যাসিলিটি বা শুল্ক সুবিধা বাড়িয়েছে। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে বন্ডেড সুবিধা বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও এ খাতে অপব্যবহার বন্ধে অটোমেশন ছাড়া কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের ঘোষণা নেই। যদিও এক যুগ ধরে কাস্টমস বন্ডে এ ধরনের অটোমেশনের ঘোষণা প্রায় প্রতিটি বাজেটেই থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে, তবুও বন্ডের অপব্যবহার আদতে বন্ধ হয়নি। গত এক বছরে শুধু একটি বন্ড কমিশনারেট হাজার কোটি টাকারও বেশি জালিয়াতি ও শুল্ক ফাঁকির মামলা করেছে। সরকারের বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে দেওয়া এ সুবিধার সুফল পেতে তদারকির কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে ডিজিটাল ইন্টিগ্রিটি সিস্টেমে জোর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ব্যাবসা-বাণিজ্য বাড়িয়ে অর্থনীতিতে গতি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের মতো নতুন করে লেদার ও ফুটওয়্যার এবং টেরিটাওয়েল সমিতির অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ডেড সুবিধা দিয়েছে। এর বাইরে আইসিটি ও ফার্মাসিউটিক্যাল খাতকে বন্ডেড সুবিধার আওতায় আনা হচ্ছে। তৈরি পোশাক খাতকে বন্ডেড সুবিধা দিয়ে যেভাবে সরকার রপ্তানির প্রধান খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, নতুন নতুন খাতকে সেভাবে ফ্যাসিলিটেড করে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান হওয়ার সুযোগ দিতে চায়। এতে সরকারের একদিকে যেমন রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আসবে, অন্যদিকে বাড়বে বিনিয়োগ। এতে তৈরি হবে নতুন নতুন কর্মসংস্থান। তবে দেশে বহু বছর ধরে চলা বন্ডেড ফ্যাসিলিটির অপব্যবহার নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। বন্ডেড সুবিধায় পণ্য আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া থেকে শুরু করে জাল-জালিয়াতির ঘটনা হরহামেশা ঘটে থাকে। আগামী অর্থবছরে বন্ডেড ফ্যাসিলিটির আওতা বাড়ালেও কার্যকর তদারকির কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা বাজেটে নেই। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অপব্যবহার নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনাও দেননি। যার কারণে সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে অপব্যবহার বন্ধের কোনো বিকল্প নেই বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআরের সাবেক সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, প্রায় ৪০ বছর ধরে বাংলাদেশে রপ্তানির প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প। বৈশ্বিক বর্তমান পরিস্থিতিতে এই খাত চাপের মধ্যে রয়েছে। তাই রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের বিকল্প নেই। রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার বিভিন্ন খাতে বন্ডেড ফ্যাসিলিটি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। মূলত সরকার রপ্তানি ও বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য এ ধরনের সুবিধার ঘোষণা দিয়েছে। আর এটা বাস্তবায়নের জন্য কাস্টমসে অটোমেশনের কথা বলা হয়েছে। যদিও গত এক যুগ প্রতিটি সরকার এই অটোমেশনের উদ্যোগের কথা বলে আসছে; কিন্তু আদতে কার্যকর হচ্ছে না। এখন পর্যন্ত পুরোপুরি অটোমেশনের আওতায় আসেনি। যার কারণে অপব্যবহারের ঝুঁকি নিয়েও প্রশ্ন রয়ে যায়।
এনবিআরের সাবেক এ সদস্য আরও বলেন, কাস্টমসের অটোমেশন কার্যকর করতে ৮-১০ হাজার কোটি টাকার বেশি লাগবে না। অথচ কেউ এটা বাস্তবায়ন করতে চায় না। কাস্টমস বন্ডে অটোমেশন করতে মোটা দাগে দুটি বিষয়ে জোর দিতে হবে। প্রথমত ডিজিটাল ইন্টিগ্রিটি সিস্টেম বা এনবিআরের সিস্টেমের সঙ্গে স্টেকহোল্ডার বা কোম্পানিগুলোর সংযোগ স্থাপন করতে হবে। পণ্য আসবে কীভাবে আসছে, কার পণ্য, কোথা থেকে এলো, কতটা ব্যবহার হলো—সব এই সিস্টেমের মাধ্যমে মনিটরিং করা যাবে। আরেকটি বিষয় হলো—সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে আরজেএসসি, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের যেসব দপ্তর ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে জড়িত তাদের সঙ্গে এনবিআরের সার্ভারের সংযোগ স্থাপন করা। এতে সরকারের উদ্দেশ্যও সফল হবে, অপব্যবহারও কমে যাবে। সারা বিশ্ব চলে টেকনোলজির মাধ্যমে। টেকনোলজিই ডিটেক্ট করে দেয় আসলে কি এসেছে, আর আপনি কী ঘোষণা দিয়েছেন। বিশ্বে যারা এসব ক্ষেত্রে সফল হয়েছে, তাদের মডেলগুলো বিবেচনায় নেওয়া দরকার বলেও জানান সাবেক এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর সরকার রপ্তানির সুবিধার্থে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার বন্ডেড সুবিধা দিয়ে থাকে। বর্তমানে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের মাধ্যমে এ সুবিধাপ্রাপ্ত হন রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকরা। অধিকাংশ ব্যবসায়ী সঠিক ব্যবহার করলেও কিছু কিছু ব্যবসায়ী এই সুবিধার অপব্যবহার করে থাকেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেট এবং ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেট মিলে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির মামলা হয়েছে। এর বাইরে চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটও বন্ডের অপব্যবহার নিয়ে মামলা করেছে। মূলত কার্যকর মনিটরিং না থাকলে আরও বেশি অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেছেন, ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে বন্ডের জটিলতা নিরসনে নতুন করে প্রস্তাবিত বাজেটে এককালীন বন্ডিং ক্যাপাসিটির সুযোগ দিয়েছে সরকার। এতে অনেকে ওয়্যারহাউসের সক্ষমতা অনুযায়ী পণ্য বছরের শুরুতেই আমদানি করবেন। এতে বন্ডেড পণ্য মজুত বাড়বে। আর বছরের শুরুতে রপ্তানি আদেশের বেশি মজুত থাকলে অপব্যবহার হওয়ার শঙ্কা তৈরি হবে বলেও জানিয়েছেন কাস্টম কর্মকর্তারা। কিছু কিছু ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে যেমন বন্ডেড পণ্য আমদানি করে খোলা বাজারে বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে, তেমনি ভালো ব্যবসায়ীদের হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে কাস্টম কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের যোগ-সাজশের অভিযোগও উঠে। আর এসব অপব্যবহার বন্ধ করে সরকারের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারির উপরও জোর দেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বিনিয়োগ এবং রপ্তানি বাড়াতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে—এটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ এ সুবিধা দিলে নতুন নতুন খাত রপ্তানিমুখী পণ্য তৈরিতে উৎসাহী হবে। তবে এক্ষেত্রে অপব্যবহারেরও প্রশ্ন রয়েছে। সে ক্ষেত্রে এনবিআরের অটোমেশনের বিকল্প নেই। এতে করাপশন জিরোতে না নামিয়ে আনতে পারলেও সরকারের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পূরণ হবে। তবু বিনিয়োগ বাড়াতে সুবিধা দিতে হবে বলেও জানান এ অর্থনীতিবিদ।
বন্ডের অপব্যবহার বন্ধের বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআরের সদ্যবিদায়ী সদস্য কাজী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে বেশ কিছু কার্যক্রম নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত বন্দর থেকে বন্ড সুবিধায় খালাস করা পণ্য ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে কারখানায় ঠিকমতো পৌঁছেছে কি না নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া বন্ড সম্পর্কিত সব কার্যক্রম সফটওয়্যারে মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে। সিস্টেম বেজ অডিটে কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে অনিয়ম ধরা পড়লে সেই প্রতিষ্ঠানের আমদানি ও রপ্তানি সংক্রান্ত ডকুমেন্ট যাচাই করে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো কর্মকর্তার গাফিলতি পাওয়া গেলে বা কোনো প্রতিষ্ঠানকে হয়রানিমূলক মামলা করা হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে একই সিস্টেম থেকে ইউডি ও ইউপি (ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন ও ইউটিলাইজেশন পারমিশন) ইস্যু করার উদ্যোগ নিতে হবে। কোনো বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বন্ডেড কাঁচামাল বিক্রির অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে বন্ডারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রাথমিকভাবে এসব কার্যক্রম জোরদার করলে বন্ডের অপব্যবহার অনেকাংশে কমে আসবে।
