
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক : বিশ্ব পোশাক বাণিজ্যে আবারও প্রবৃদ্ধির ধারা ফিরেছে। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক পোশাক রফতানি ৪.৪৬ শতাংশ বেড়ে ৫৭৪.৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু এই সম্প্রসারণের সুফল পুরোপুরি নিতে পারেনি বাংলাদেশ। বরং এক বছরের ব্যবধানে দেশের বাজার অংশীদারত্ব কমেছে, প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে এক শতাংশেরও নিচে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া দ্রুত নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস (বিএভি) এ চিত্র তুলে ধরেছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালে বিশ্ব পোশাক বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব ছিল ৭ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে তা কমে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ৬.৭৬ শতাংশে। অর্থাৎ বাংলাদেশের দখলে থাকা বাজারের একটি অংশ প্রতিযোগী দেশগুলোর কাছে চলে গেছে।
অন্যদিকে ভিয়েতনামের অংশীদারত্ব ৬.১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬.৫৩ শতাংশে এবং কম্বোডিয়ার অংশীদারত্ব ১.৮০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২.০১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ বিশ্ববাজারে নতুন অর্ডার ও অতিরিক্ত চাহিদার বড় অংশ এই দুই দেশ নিজেদের দিকে টেনে নিতে সক্ষম হয়েছে।
বিশ্ববাজার বাড়লেও তাল মেলাতে পারেনি বাংলাদেশ
ডব্লিউটিওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক পোশাক রফতানি ৫৪৯.৯২ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৫৭৪.৪৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ বিশ্ববাজারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪.৪৬ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে বাংলাদেশের রফতানি ৩৮.৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে মাত্র ৩৮.৮২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ০.৮৯ শতাংশ। বিশ্ববাজার যেখানে প্রায় সাড়ে চার শতাংশ বেড়েছে, সেখানে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হয়েছে তার প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ। এটি স্পষ্টভাবে দেখায়, বিশ্ববাজারের সম্প্রসারণের সুবিধা বাংলাদেশ প্রত্যাশিত মাত্রায় নিতে পারেনি।
একবছরেই বদলে গেল অবস্থান
২০২৪ সালে চিত্র ছিল ভিন্ন। সে বছর বিশ্ববাজারের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২.৪১ শতাংশ, অথচ বাংলাদেশের রফতানি বেড়েছিল ৭.২৩ শতাংশ। ফলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব ৬.৬৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে সেই ধারা ভেঙে যায়। বাজার অংশীদারত্ব আবার কমে যায় এবং প্রবৃদ্ধিও কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। মাত্র একবছরের ব্যবধানে বিশ্ববাজারের তুলনায় এগিয়ে থাকা বাংলাদেশ আবার পিছিয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে ভিয়েতনাম
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো ভিয়েতনামের ধারাবাহিক অগ্রগতি। ২০২৫ সালে ভিয়েতনামের পোশাক রফতানি ১০.৫৩ শতাংশ বেড়ে ৩৭.৫১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের রফতানি বেড়েছে মাত্র ০.৮৯ শতাংশ, যা ৩৮.৮২ বিলিয়ন ডলার। ফলে দুই দেশের মধ্যে রপ্তানি ব্যবধান কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১.৩১ বিলিয়ন ডলারে। তিন বছর আগেও, ২০২৩ সালে এই ব্যবধান ছিল প্রায় ৪.৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে তা কমে ২.৫৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। আর এখন তা আরও অর্ধেকে নেমে এসেছে। বাজার অংশীদারত্বেও দুই দেশের ব্যবধান এখন মাত্র ০.২৩ শতাংশ পয়েন্ট।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী বছরই ভিয়েতনাম রফতানির পরিমাণে বাংলাদেশকে অতিক্রম করতে পারে।
চীনের হারানো বাজারের বড় সুবিধাভোগী বাংলাদেশ নয়
বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোশাক রফতানিকারক দেশ চীনের রফতানি ২০২৫ সালে ৪.৯২ শতাংশ কমেছে। দেশটির বাজার অংশীদারত্বও ৩০.০৫ শতাংশ থেকে কমে ২৭.৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে। সাধারণভাবে চীনের বাজার সংকুচিত হলে বাংলাদেশের রফতানি বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। অতীতেও এমনটি হয়েছে। কিন্তু এবার সেই চিত্র দেখা যায়নি। বরং ভিয়েতনাম ১০.৫৩ শতাংশ এবং কম্বোডিয়া ১৬.৮৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চীনের হারানো বাজারের বড় অংশ নিজেদের দখলে নিয়েছে।
বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি মাত্র ০.৮৯ শতাংশ হওয়ায় বোঝা যায়, এই অতিরিক্ত বাজারের সুযোগ দেশটি কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারেনি।
কম্বোডিয়ার উত্থান নতুন বার্তা দিচ্ছে
বিশ্ব পোশাক বাণিজ্যে এখন সবচেয়ে দ্রুত এগিয়ে যাওয়া দেশগুলোর একটি কম্বোডিয়া। ২০২৫ সালে দেশটির রফতানি ৯.৮৯ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১১.৫৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬.৮৮ শতাংশ। এর ফলে বিশ্ববাজারে দেশটির অংশীদারত্বও প্রথমবারের মতো ২ শতাংশ অতিক্রম করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, তুলনামূলক ছোট অর্থনীতির দেশ হয়েও কম্বোডিয়া যে গতিতে বাজার বাড়াচ্ছে, তা বাংলাদেশের জন্য নতুন প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে পড়ছে
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেই এখন আর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। দ্রুত পণ্য সরবরাহ, বন্দর ও লজিস্টিকসের দক্ষতা, কম উৎপাদন ব্যয়, কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক (ম্যান-মেড ফাইবার) পোশাক উৎপাদন, নতুন বাজারে প্রবেশ, মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সুবিধা এবং সহজ ব্যবসা পরিবেশ—এসব ক্ষেত্রেই প্রতিযোগীরা এগিয়ে যাচ্ছে।
অপরদিকে দেশে জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদের হার, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে চাপে ফেলছে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘‘২০২৫ সালের ডব্লিউটিওর তথ্য বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। বিশ্ববাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশ সেই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না। একসময় চীনের বাজার কমলে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি লাভবান হতো। এখন সেই অতিরিক্ত বাজারের বড় অংশ ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার দিকে যাচ্ছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশকে এখন শুধু উৎপাদন বাড়ানোর দিকে নয়, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে জোর দিতে হবে। পণ্যের বৈচিত্র্য, উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন, নতুন বাজার সম্প্রসারণ, সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসার ব্যয় কমানো ছাড়া ভবিষ্যতে বাজার অংশীদারত্ব ধরে রাখা কঠিন হবে।’’
সামনের বার্তা কী?
২০২৫ সালের ডব্লিউটিও’র পরিসংখ্যান একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে— বিশ্ব পোশাক বাজারে প্রতিযোগিতা এখন আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে তীব্র। শুধু চীনের বাজার কমলেই বাংলাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাভবান হবে— এই ধারণা আর বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না। বিশ্ববাজারে নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে মূলত ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলো।
বাংলাদেশের জন্য এটি কেবল একটি পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন নয়— বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। কারণ এখনই উৎপাদনশীলতা, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, নীতি-সহায়তা, বন্দর ও লজিস্টিকস এবং পণ্যের বহুমুখীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে বিশ্ব পোশাক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও চাপে পড়তে পারে।
