
গাজী আবু বকর : বাংলাদেশ সরকারের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে বেছে নিয়েছেন মালয়েশিয়াকে। আন্তর্জাতিক মহলে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে—সবচেয়ে বড় দুই উন্নয়ন অংশীদার ভারত ও চীনকে পাশে রেখে কেন এই সিদ্ধান্ত? কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকার এই পদক্ষেপ কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে অত্যন্ত সুনিপুণ ও দূরদর্শী এক পররাষ্ট্রনীতির ‘মাস্টারস্ট্রোক’। প্রধানত চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এই সফরের কৌশলগত গুরুত্ব: ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা, শ্রমবাজারের পুনরুজ্জীবন, আসিয়ানমুখী অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং মুসলিম বিশ্বের মধ্যমপন্থী নেতৃত্বের সঙ্গে মৈত্রী জোরদার।
ভারত-চীন টানাপোড়েনে ‘কূটনৈতিক নিরপেক্ষতা’: নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল এশিয়ার দুই পরাশক্তি—দিল্লি ও বেইজিংয়ের আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখা। প্রধানমন্ত্রী যদি প্রথম সফরেই বেইজিং যেতেন, তবে দিল্লিতে ভুল বার্তা যাওয়ার ঝুঁকি থাকত। আবার প্রথম গন্তব্য ভারত হলে, তা চীনের কাছে ভিন্ন রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে গণ্য হতে পারত।
এই স্নায়ুযুদ্ধের মাঝখানে মালয়েশিয়া হলো একটি চমৎকার ‘নিরাপদ ও কৌশলগত’ বিকল্প। সাবেক কূটনীতিকদের মতে, মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়া সত্ত্বেও ভারত-চীন দ্বন্দ্বের সরাসরি অংশ নয়। ফলে, ২১-২২ জুনের এই কুয়ালালামপুর সফরের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্বমঞ্চে একটি নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের স্পষ্ট বার্তা দিতে সক্ষম হলো। উল্লেখ্য, এই সফরের পরপরই প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের কথা রয়েছে, যা ঢাকার কূটনৈতিক ভারসাম্যকে আরও সুসংহত করবে।
বন্ধ শ্রমবাজারের তালা খোলার মিশন: বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম লাইফলাইন হলো রেমিট্যান্স। আর মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। তবে বেশ কিছু দিন ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ বাজারটি স্থবির হয়ে আছে। বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে কর্মী নিয়োগের জটিলতা দূর করা, ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং বাংলাদেশি শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়টি টেবিলের শীর্ষে থাকবে। কূটনৈতিক মহলের ধারণা, এই সফরের হাত ধরেই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার পুরোদমে উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে।
আসিয়ান ও ‘হালাল অর্থনীতি’র সেতুবন্ধন: মালয়েশিয়া কেবল একটি রাষ্ট্র নয়, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শক্তিশালী অর্থনৈতিক জোট ‘আসিয়ান’ (অঝঊঅঘ)-এর অন্যতম মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আসিয়ানের বাজারে গভীর প্রবেশের চেষ্টা করছে। এই সফরকে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তির সেতুবন্ধন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পাশাপাশি, মালয়েশিয়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ‘হালাল অর্থনীতি’ এবং ইসলামি ব্যাংকিংয়ের কেন্দ্র। বাংলাদেশ এবার কুয়ালালামপুরকে পাশে নিয়ে হালাল পণ্য রপ্তানি, ইসলামি ফাইন্যান্স এবং শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে চাইছে। বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও জ্বালানি খাতে মালয়েশিয়ান বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করাও এই সফরের অন্যতম লক্ষ্য।
রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সংযোগের সমীকরণ: চলতি বছরের এপ্রিলে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান। দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের এই রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা দুই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
এর বাইরেও একটি প্রচ্ছন্ন আবেগঘন দিক রয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনের সময় তারেক রহমানের পরিবারের সঙ্গে মালয়েশিয়ার একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিশেষ করে, ২০১৫ সালে তাঁর ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো এখানেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না পেলেও, এই ব্যক্তিগত ও প্রতীকী সংযোগ সফরটিতে ভিন্ন এক মাত্রা যোগ করেছে।
বিশেষজ্ঞের চোখে এই সফর: সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত ঢাকার ভূ-রাজনৈতিক নিরপেক্ষতাকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। ভারত বা চীনের মতো বড় শক্তির আমন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও প্রথমে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়া অত্যন্ত সময়োপযোগী। জনশক্তি, বাণিজ্য, শিক্ষা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই সফর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এক ঐতিহাসিক উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
