
নয়াবার্তা প্রতিবেদক : অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সরকারি ও আর্থিক সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে, সেবা গ্রহণ সহজ করতে, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ের লক্ষ্যে পুরো দেশকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনা হবে।
তিনি বলেন, ‘একটি দেশকে এগিয়ে নিতে প্রযুক্তি ও ডিজিটালাইজেশনের কোনো বিকল্প নেই। সেবা প্রদান, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, ব্যয় কমানো কিংবা মানুষের জীবনমান উন্নয়নÑ সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তি এখন অপরিহার্য।
আজ রাজধানীর সচিবালয়ে অর্থ বিভাগের মাল্টিপারপাস হলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ইনোভেশন শোকেসিং ২০২৫-২৬’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে দেশের আর্থিক খাতের চারটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান ও প্রতিনিধিরা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অধীন ২৫টি দপ্তর ও সংস্থার প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিভাগের যুগ্মসচিব ও প্রধান উদ্ভাবন কর্মকর্তা ফারিদা ইয়াসমিন।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, কৃষক, শ্রমিকসহ প্রতিটি নাগরিককে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা। যাতে তারা যেকোনো স্থান থেকে সহজেই প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণ করতে পারেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা যত দ্রুত সম্ভব পুরো দেশকে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনতে চাই। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, কৃষক ও শ্রমিকসহ সবার দোরগোড়ায় সরকারি ও আর্থিক সেবা পৌঁছে দিতে চাই।’
তিনি আরো বলেন, ডিজিটাল রূপান্তরের ক্ষেত্রে সরকার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি অনুসরণ করছে, যাতে প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে উত্তরণের পথে কেউ পিছিয়ে না থাকে।
জাতীয় বাজেটের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সরকার যে বাজেট প্রণয়ন করেছে, তাতে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ, এমনকি সাধারণ কারিগর, শিল্পী ও গায়ক-গায়িকাদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক অগ্রযাত্রাকে সফল করতে প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। নাগরিকদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত করতে সরকার ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই সবাই এই যাত্রার অংশ হোক। ডিজিটালাইজেশন শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয় নয়, এটি নাগরিকদের ক্ষমতায়ন এবং সরকারি সেবা ও উন্নয়নের সুযোগের সঙ্গে তাদের সংযুক্ত করারও একটি কার্যকর মাধ্যম।’
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে অর্থমন্ত্রী জানান, বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তিনির্ভর দেশ এস্তোনিয়ার প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা ও ডিজিটাল মডেল পর্যালোচনার জন্য সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বর্তমানে সেখানে অবস্থান করছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সর্বোত্তম অনুশীলন দ্রুত দেশের আর্থিক খাতে কাজে লাগানোর নির্দেশও দেন তিনি।
তিনি বলেন, ব্যাংক, বীমা ও পুঁজিবাজারসহ সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানে উদ্ভাবিত ডিজিটাল সেবার কাভারেজ ও আউটরিচ আরো বাড়াতে হবে। যাতে জনগণ ঘরে বসে কিংবা চলার পথেই সহজে আর্থিক সেবা গ্রহণ করতে পারেন। এতে মানুষের সময়, যাতায়াত ব্যয় ও হয়রানি কমবে এবং দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে।
গ্রাহকদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে সহায়তার জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ এবং নিয়মিত সেবা গ্রহণে অনলাইন মাধ্যম ব্যবহারে উৎসাহিত করার পরামর্শ দেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী ডিজিটাল সেবা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে এ ধরনের উদ্যোগের খবর গণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এতে সাধারণ মানুষ ডিজিটাল সেবার প্রতি আরো আগ্রহী হবে এবং দেশ দ্রুত কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে।
মন্ত্রী বলেন, ‘শুধু ডিজিটাল সেবা তৈরি করলেই হবে না। মানুষ যদি সেই সেবা ব্যবহার না করে এবং সেবা যদি তাদের কাছে না পৌঁছে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। আমাদের লক্ষ্য হলো যেসব সেবা ডিজিটালভাবে দেওয়া সম্ভব, সেগুলোর জন্য যেন নাগরিকদের সরকারি অফিস, ব্যাংক বা বীমা প্রতিষ্ঠানে যেতে না হয়।’
তিনি বলেন, কার্যকর ডিজিটালাইজেশন মানুষের সময় বাঁচাবে, অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমাবে এবং অর্থনীতিতে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তিনি আরো বলেন, ডিজিটাল রূপান্তর কয়েকটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সব প্রতিষ্ঠানকে তাদের ডিজিটাল সেবা কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করে জনগণের জন্য সহজলভ্য করতে হবে।
উদ্ভাবনকে আধুনিক সুশাসনের অন্যতম চালিকাশক্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর জনসেবা নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ককে আরো কার্যকর, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করে তুলতে পারে।
উদ্ভাবনী কার্যক্রম প্রদর্শনের জন্য অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের উদ্যোগ আর্থিক খাতসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার আরো সম্প্রসারণে সহায়ক হবে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্ভাবনের মাধ্যমে সরকারি সেবা আরো সহজ, দ্রুত ও জনগণের কাছে অধিকতর সহজলভ্য হচ্ছে। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি প্রতিরোধেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, সরকারের উদ্ভাবনী উদ্যোগ নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেখানে নাগরিক, শিক্ষার্থী, ফ্রিল্যান্সার, তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাংলাদেশকে একটি প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র এবং তথ্যপ্রযুক্তি সেবা রপ্তানিকারক শীর্ষ দেশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে উদ্ভাবনী কার্যক্রমে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পাঁচটি ক্যাটাগরিতে পাঁচটি দপ্তর ও সংস্থাকে পুরস্কার প্রদান করা হয়।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের তত্ত্বাবধানে অধীনস্থ ২৫টি দপ্তর ও সংস্থা এ পর্যন্ত মোট ৩২৯টি সরকারি সেবা ডিজিটালাইজ করেছে।
