
বিশেষ প্রতিবেদক : সরকারি প্রশাসনের পরিধি আরও বড় করার পথে এগোচ্ছে সরকার। নতুন অর্থবছরের শুরুতেই প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির প্রথম সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয়েছে অন্তত ১৩টি প্রস্তাব।
এসব প্রস্তাবের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নতুন পদ সৃষ্টি, বিদ্যমান পদ পুনর্বিন্যাস, নিয়োগ বিধিমালা অনুমোদন ও নতুন প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো নির্ধারণ।
সব মিলিয়ে যেসব প্রস্তাবে নির্দিষ্টসংখ্যক জনবল উল্লেখ রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়িত হলে নতুন পদ সৃষ্টি হতে পারে অন্তত ৪২৭টি।
সংশ্লিষ্টদের যুক্তি- নতুন অবকাঠামো, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সেবা সম্প্রসারণ ও বিশেষায়িত কার্যক্রম পরিচালনায় অতিরিক্ত জনবল অপরিহার্য। তবে অর্থনীতিবিদ ও প্রশাসন বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, সরকারি ব্যয় সংকোচনের সময়ে একের পর এক রাজস্ব খাতে নতুন পদ সৃষ্টি কতটা বাস্তবসম্মত? প্রশাসনের এই সম্প্রসারণ কি সত্যিই সেবার মান বাড়াবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের ওপর আরও স্থায়ী ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি করবে?
সচিবালয়ের নতুন ভবনে গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় এসব প্রস্তাব আলোচনা হয়। সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিনিধির বদলে সচিবদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক
এবারের সভার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল- সংশ্লিষ্ট সচিবদের সরাসরি উপস্থিতি নিশ্চিত করা।
দীর্ঘদিন ধরে এই কমিটির সভায় সচিবদের পরিবর্তে অতিরিক্ত সচিব বা অন্য প্রতিনিধিরা অংশ নিতেন। কিন্তু এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রস্তাব উপস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হওয়ার অভিযোগ ছিল।
এ পরিস্থিতিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ নির্দেশনা দেয়Ñ প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় সংশ্লিষ্ট সচিবদেরই উপস্থিত থাকতে হবে।
বিশেষ কারণে প্রতিনিধি পাঠাতে হলে আগেই মন্ত্রিপরিষদ সচিবের অনুমতি নিতে হবে এবং তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে হবে।
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য এই পরিবর্তনকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সবচেয়ে বড় জনবল সমাজসেবা ও নৌবাহিনীতে
সভায় সবচেয়ে বেশি জনবল সৃষ্টির প্রস্তাব এসেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে ২৫ শয্যাবিশিষ্ট আটটি ‘শান্তি নিবাস’-এর জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ৭২টি রাজস্ব খাতের পদ ও আটজন খণ্ডকালীন চিকিৎসকসহ মোট ৮০টি পদ সৃষ্টির। প্রবীণ ও অসহায় মানুষের জন্য পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরেই জনবল সংকটের অভিযোগ রয়েছে।
সেই ঘাটতি পূরণেই এই উদ্যোগ বলে জানা গেছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সেন্টার ফর নেভাল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিএনআরডি) জন্য ৫২টি নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দিয়েছে।
একই সঙ্গে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) সাংগঠনিক কাঠামোর একটি পদের নাম পরিবর্তনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
সামরিক গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নে জনবল বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারিকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ সরকারিকৃত নয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের আত্তীকরণের জন্য পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দিয়েছে ৬০টি।
দীর্ঘদিন ধরে সরকারীকরণের পরও অনেক শিক্ষক-কর্মচারীর চাকরির কাঠামোগত অনিশ্চয়তা ছিল। এবার সেই বিষয়টি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হচ্ছে।
রোহিঙ্গা সংকট ও দুর্যোগ মোকাবিলায় নতুন জনবল
সভায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রস্তাব। এর একটি কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা প্রকল্পের আওতায় নির্মিত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের গুদাম ও স্যাটেলাইট ফায়ার স্টেশন পরিচালনার জন্য ৩৯টি নতুন পদ।
অন্যটি স্ট্রেনদেনিং অ্যাবিলিটি অব ফায়ার ইমার্জেন্সি রেসপন্স (সেইফার) প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ইমার্জেন্সি রেসপন্স কন্ট্রোল সেন্টার পরিচালনার জন্য আরও ৩০টি পদ সৃষ্টি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় নির্মিত এসব অবকাঠামো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল না থাকলে সরকারি বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া সম্ভব হবে না।
বন্দর, সড়ক ও গণপূর্তেও নতুন নিয়োগ
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয় ও চালুকৃত স্থলবন্দরগুলোর জন্য ১৫টি নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দিয়েছে।
এ ছাড়া পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য চারজন ভারী ও হালকা যানবাহন চালকের পদ ভূতাপেক্ষ অনুমোদনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ বগুড়া সড়ক জোন ও নওগাঁ সড়ক সার্কেলের জন্য ৩২টি নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দিয়েছে।
অন্যদিকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় স্থাপত্য অধিদপ্তরের আটটি আউটসোর্সিং ভিত্তিক অফিস সহায়কের পদ রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করতে চায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আউটসোর্সিংয়ের পরিবর্তে নিয়মিত জনবল কাঠামোয় এসব পদ অন্তর্ভুক্ত হলে প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা ও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বাড়বে।
গবেষণা, তথ্য ব্যবস্থাপনা ও ব্লু ইকোনমিতে গুরুত্ব
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রস্তাব দিয়েছে জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির (এনএপিডি) আইসিটি শাখার জন্য দুটি নতুন পদ সৃষ্টির।
এদিকে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ তাদের সাংগঠনিক কাঠামোয় যুক্ত করতে চায় ১৭টি নতুন পদ। তথ্যনির্ভর নীতি প্রণয়ন ও সরকারি পরিসংখ্যান ব্যবস্থাকে আধুনিক করার প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
একই সঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অধীন নতুন গঠিত ব্লু-ইকোনমি সেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ বিধিমালা-২০২৬ অনুমোদনের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাড়বে রাজস্ব ব্যয়, উঠছে প্রশ্নও
সভায় উত্থাপিত প্রায় সব প্রস্তাবই রাজস্ব খাতে নতুন পদ সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ এসব পদ অনুমোদিত হলে ভবিষ্যতে বেতন-ভাতা, উৎসব ভাতা, চিকিৎসা সুবিধা, পেনশনসহ বিভিন্ন আর্থিক দায় সরকারের নিয়মিত ব্যয়ের অংশ হয়ে যাবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জনবল বৃদ্ধি কেবল নিয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে যুক্ত হয় দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়ও। ফলে প্রতিটি নতুন পদের প্রয়োজনীয়তা, উৎপাদনশীলতা ও সেবা প্রদানের সক্ষমতা বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
অন্যদিকে প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের যুক্তি, নতুন হাসপাতাল, ফায়ার স্টেশন, গবেষণা কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বন্দর নির্মাণ করে প্রয়োজনীয় জনবল না দিলে কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে অবকাঠামো। তাই জনবল বৃদ্ধি সব সময় অপচয় নয়; বরং কার্যকর জনসেবা নিশ্চিত করার জন্য অনেক ক্ষেত্রেই অপরিহার্য।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সরকারি খাতে নতুন পদ সৃষ্টি সব সময় নেতিবাচক নয়। তবে প্রতিটি পদ সৃষ্টির আগে তার অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা, সেবা প্রদানের সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় গভীরভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তার মতে, বর্তমানে সরকার একদিকে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের কথাও বলছে। এই বাস্তবতায় নতুন রাজস্ব খাতের পদ সৃষ্টি হলে শুধু মাসিক বেতনই নয়, ভবিষ্যতে পেনশন, চিকিৎসা সুবিধা, উৎসব ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক দায়ও বহন করতে হবে রাষ্ট্রকে। ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কেবল তাৎক্ষণিক প্রয়োজন নয়, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক প্রভাবও বিবেচনায় রাখতে হবে।
তার ভাষায়, “রাষ্ট্রের প্রতিটি নতুন নিয়োগকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তবে সেই বিনিয়োগের বিপরীতে নাগরিক কী ধরনের সেবা পাচ্ছে, তারও স্পষ্ট মূল্যায়ন থাকা প্রয়োজন।”
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পর প্রয়োজনীয় জনবল না থাকলে সেই বিনিয়োগের সুফল পাওয়া যায় না। তাই হাসপাতাল, ফায়ার স্টেশন, গবেষণা কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বিশেষায়িত সেবা ইউনিট পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ভিত্তিক জনবল সৃষ্টি প্রশাসনিক বাস্তবতার অংশ। তবে শুধু পদ বাড়ালেই প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ে না; প্রয়োজন সঠিক জনবল পরিকল্পনা, দক্ষ নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থাপনা।
অনুমোদনের আগে আরও কয়েক ধাপ
সচিব কমিটির সভায় প্রস্তাব উত্থাপন মানেই তা চূড়ান্ত অনুমোদন নয়। প্রতিটি প্রস্তাব এখন অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদনের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করবে।
আর্থিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা ও নীতিগত অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে অনেক প্রস্তাবেই পরিবর্তন আসতে পারে কিংবা কিছু প্রস্তাব স্থগিতও হতে পারে।
