রাজধানীর ৪৫ থানা এলাকায় জিম্মি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

১২০০ চাঁদাবাজের সিন্ডিকেট


বিশেষ প্রতিবেদক : রাজধানীর ৪৫টি থানা এলাকার ব্যবসায়ীরা চিহ্নিত ১ হাজার ২০০ চাঁদাবাজের নিকট জিম্মি হয়ে পড়েছে। এসব চাঁদাবাজের মধ্যে ১৯৭ জনের সরাসরি রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। এর মধ্যে ১৮১ জন বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের মধ্যে বিএনপির ৯৪ জন, যুবদলের ৪৪ জন ও ছাত্রদলের ২৬ জন। তালিকায় আওয়ামী লীগের ১৬ জনের নাম রয়েছে।

প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ১২০ বর্গফুটের একটি ভাঙারির দোকান চালাচ্ছেন ৫১ বছর বয়সী সাজ্জাদ মিয়া (ছদ্মনাম)। দোকান ভাড়া ও অন্যান্য বিল বাবদ তার মাসিক খরচ ১৫ হাজার টাকা। তবে এর বাইরে আরেকটি খরচ এড়ানোর উপায় নেই। প্রতি মাসে স্থানীয় পাঁচজনকে ৮ হাজার টাকা দিতে হয়। সাজ্জাদ বলেন, ‘এখানে ভাঙারির ব্যবসা করতে চাইলে এটাই নিয়ম। এই ‘‘টোল’’ দিতেই হবে।’ সাজ্জাদের অভিজ্ঞতা রাজধানীর হাজারো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।

২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার চাঁদাবাজি দমনে বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও মার্চ ও এপ্রিল মাসে পুলিশের তৈরিকৃত একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও কিছু ক্ষেত্রে পুলিশের আশ্রয়ে চাঁদাবাজি এখনো গভীরভাবে গেঁড়ে আছে।

বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের ঘটনাগুলো মাঝেমধ্যে সংবাদ শিরোনাম হয়। যেমন—এপ্রিল মাসে শ্যামলীতে এক চিকিৎসকের কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগে যুবদলের সাবেক এক নেতা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তবে প্রতিবেদনটি বলছে, রাজধানীর হাজারো ফুটপাতের দোকানি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকানমালিক শুধু ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এখনো নিয়মিত ‘টোল’ বা চাঁদা দিয়ে যাচ্ছেন।

প্রতিবেদনে রাজধানীর ৪৫টি থানা এলাকায় সক্রিয় প্রায় ১ হাজার ২০০ চাঁদাবাজকে চিহ্নিত করা হয়েছে। পুলিশের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে ১২০০ চাঁদাবাজের তথ্য, অনেকেই রয়েছে রাজনৈতিক আশ্রয়ে। এতে বলা হয়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চাঁদাবাজির ব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি; শুধু বদলেছে কারা চাঁদা তুলবে ও ব্যবসায়ীদের কত টাকা দিতে হবে।

২০০২ সালে দোকান খুলেছিলেন সাজ্জাদ। আর তখন থেকেই চাঁদাবাজি তার ব্যবসার একটা নিত্যদিনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে তিনি মাসে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা চাঁদা দিতেন। তার দাবি, ওই টাকার একটি অংশ স্থানীয় পুলিশের কাছেও যেত।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্থানীয় প্রভাবশালী ও বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা চাঁদার পরিমাণ দ্বিগুণ করে ৮ হাজার টাকা দাবি করেন। তাদের অভিযোগ, সাজ্জাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের যোগাযোগ ছিল এবং তিনি দলটির সমাবেশেও অংশ নিয়েছিলেন। মূলত এই অজুহাত দেখিয়েই তারা চাঁদার অঙ্ক বাড়িয়ে দেন।

কারওয়ান বাজারের ১৮ থেকে ২০টি ভাঙারির দোকানের মধ্যে অধিকাংশ ব্যবসায়ীকে মাসে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। আর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে মনে করা হয়, এমন ব্যবসায়ীকে অনেক সময় দ্বিগুণ চাঁদা দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে, যারা ভাঙারির ব্যবসার আড়ালে চুরি করা সামগ্রী—যেমন তামার তার, ম্যানহোলের লোহার ঢাকনা, জানালার গ্রিল ও রড বিক্রি করেন, তাদের গুণতে হচ্ছে তিন থেকে চার গুণ বেশি চাঁদা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এককালীন ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়।

এই চাঁদাবাজির চক্র শুধু কারওয়ান বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়। ইস্কাটন গার্ডেন রোডের নেভি গলির কাছে পাঁচ ফুট বাই সাত ফুটের একটি চায়ের দোকান চালান রিয়াদ আহমেদ (ছদ্মনাম)।

তিনি বলেন, বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের প্রতিদিন ১০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। এ ছাড়া দোকানে একটি মাত্র বাতি জ্বালানোর জন্য অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বাবদ রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া থাকা আরেক চাঁদাবাজকে প্রতিদিন আরও ৭০ টাকা দিতে হয়।

রিয়াদ বলেন, বিক্রি হোক বা না হোক, প্রতিদিন ১৭০ টাকা চাঁদা দিতেই হয়। ওই এলাকায় থাকা প্রায় ১৫ থেকে ২০টি ভ্রাম্যমাণ চা, জুস ও ফাস্টফুডের দোকান থেকেও একইভাবে চাঁদা আদায় করা হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে জীবিকা হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে হয়। তবে বিএনপি নেতারা বলছেন, দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিতে জড়িত থাকার অভিযোগ সঠিক নয়।

রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা

অন্যদিকে, পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিহ্নিত ১ হাজার ২০০ চাঁদাবাজের মধ্যে ১৯৭ জনের সরাসরি রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। এর মধ্যে ১৮১ জন বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের মধ্যে বিএনপির ৯৪ জন, যুবদলের ৪৪ জন ও ছাত্রদলের ২৬ জন। তালিকায় আওয়ামী লীগের ১৬ জনের নাম রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চিহ্নিত চাঁদাবাজদের মধ্যে মাত্র ৩ দশমিক ৯ শতাংশ এ কার্যক্রম থেকে সরে এসেছে। বাকি ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

তবে প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ না করা ব্যক্তিদের অধিকাংশই শীর্ষ তালিকাভুক্ত অপরাধীদের সহযোগী অথবা ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী।

পুলিশ চাঁদাবাজদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা হিসেবে ৩২৯ জনকে চিহ্নিত করেছে। তাদের মধ্যে ২৭১ জনের রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। এর মধ্যে ২১৪ জন বিএনপির, দুজন আওয়ামী লীগের ও একজন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে সম্পৃক্ত।

রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় চাঁদাবাজদের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। চিহ্নিত চাঁদাবাজের সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে খিলক্ষেত, যেখানে ১১২ জনের তথ্য পাওয়া গেছে। এরপর রয়েছে কলাবাগান (১০০), হাতিরঝিল (৭৭), মোহাম্মদপুর (৫৯) ও বাড্ডা (৫৭)।

শীর্ষ ১০-এর বাকি এলাকাগুলো হলো—আদাবর, ভাটারা, খিলগাঁও, উত্তরা পূর্ব ও পল্লবী। এ ১০ এলাকাতেই ঢাকায় তালিকাভুক্ত মোট চাঁদাবাজের ৫৮ শতাংশ সক্রিয়।

পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, এসব এলাকায় বিপুলসংখ্যক ফুটপাতের ব্যবসা, পরিবহন স্ট্যান্ড ও নির্মাণ প্রকল্প থাকায় চাঁদাবাজদের তৎপরতা তুলনামূলক বেশি।

প্রতিবেদনটিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠে এসেছে। এতে চাঁদাবাজির ৩৫টি ঘটনায় পুলিশের সংশ্লিষ্টতার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে পুলিশের সংশ্লিষ্টতার সর্বোচ্চ ১১টি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে ডিএমপির মিরপুর বিভাগে।

এ বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, অপরাধজগতের পুরোনো নেটওয়ার্ক এখনো রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় সক্রিয়। তারা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নাম ব্যবহার করে তৈরি পোশাক কারখানা, আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে।

ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি

গত ৪ মার্চ চাঁদাবাজদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই প্রতিবেদন তৈরি করে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগ) নিয়াজ মেহেদী বলেন, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে পুলিশ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মে মাসে সর্বশেষ অভিযান শুরুর পর রাজধানীজুড়ে ৭৫৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করেই চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে। তবে পুলিশের তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজদের মধ্যে কতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন, সে বিষয়ে ডিএমপির কাছে পৃথক কোনো তথ্য নেই।

এদিকে ডিএমপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের অধিকাংশই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নয় তালিকাভুক্ত নন।

এক কর্মকর্তা বলেন, গ্রেপ্তারদের বড় একটি অংশ তালিকায় ছিল না। তালিকাভুক্তদের মধ্যে মাত্র অল্প কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বেশির ভাগই ক্ষমতাসীন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নিম্নস্তরের কর্মী।

চাঁদাবাজির বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, দলীয় পরিচয়ের কারণে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিএনপিকে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে, যার কোনো ভিত্তি নেই। বিএনপি এ বিষয়ে নেতাকর্মীদের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে।

Share