মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের পারফরম্যান্স যাচাই হবে কীভাবে?

নয়াবার্তা প্রতিবেদক : কর্মদক্ষতার ওপর নির্ভর করবে বর্তমান সরকারের মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের ভাগ্য। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এমন বার্তা দেওয়া হয়েছে। তাতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমার ওপর ভিত্তি করে নয়; কাজের অগ্রগতি, জনসেবার মান এবং সরকারের অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের সক্ষমতা দেখাতে পারলে মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের পদ থাকবে, না পারলে থাকবে না—এমন একটি নীতি নিয়ে এগোচ্ছে বিএনপি সরকার।
তবে এই কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের মেথড বা পদ্ধতি কী হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়নি।

তবে ধারণা করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে পুরো মন্ত্রিসভা ও প্রশাসনকে নিবিড় পর্যবেক্ষণের আওতায় রেখেছেন। কর্মদক্ষতা যাচাইয়ে আধুনিক ও ফলাফলনির্ভর কোনো না কোনো পদ্ধতি তিনি হয়তো প্রয়োগ করবেন।

পূর্ববর্তী সরকারের মতো কোনো ব্যর্থ মন্ত্রী বা ভুল লোককে দীর্ঘদিন পদে বহাল রাখার নীতি তিনি বা তার সরকার অনুসরণ করবে না।
বিষয়টি এখন আর কেবল গুঞ্জন নয়; সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এর স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। কেউ প্রত্যাশা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে না পারলে প্রয়োজন অনুযায়ী দপ্তর পুনর্বণ্টন বা নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী নেবেন।

প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী একটি মন্ত্রিসভা তৈরি করেছেন, একটি উপদেষ্টা পরিষদ তৈরি করেছেন। ওনার যদি কখনো মনে হয় কেউ ভালো পারফর্ম করতে পারছেন না, তার জায়গায় দপ্তর পুনর্বণ্টন অথবা নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া—এগুলো প্রয়োজন হলে তিনি করবেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার কোনো সিদ্ধান্ত আরও বেটার (ভালো) করার সুযোগ থাকলে তিনি সেটি করবেন।’

সরকারের ১৮০ দিন পূর্ণ হওয়ার আগে বা পরে রদবদল হতে পারে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, নির্দিষ্ট দিনক্ষণ বা ক্যালেন্ডারের পাতা দেখে নয়, বরং কাজের প্রয়োজনে এবং পারফরম্যান্সের ভিত্তিতেই এই মূল্যায়ন হবে।

প্রধানমন্ত্রীর ওই উপদেষ্টার বক্তব্যের পরপরই মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের কর্মদক্ষতা কীভাবে মূল্যায়ন হবে, কারা দায়িত্বে থাকবেন আর কারা বাদ পড়তে পারেন, এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক প্রতিকূলতা পেরিয়ে জনগণের বিপুল ম্যান্ডেটে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সে লক্ষ্যেই সরকার গঠনের শুরু থেকেই মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের কাজ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

তারা আরও বলছেন, দীর্ঘদিন লন্ডনে অবস্থানকালে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সুশাসনের নানা দিক গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন তারেক রহমান। সরকার পরিচালনায় তিনি সেই অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন। সরকারের নেওয়া প্রতিটি জরুরি পদক্ষেপ সঠিক সময়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না এবং মন্ত্রীরা তাদের দায়িত্ব পরিচালনায় কতটা সক্রিয়, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর ও আধুনিক নজরদারি বজায় রাখছেন।

সরকারি প্রশাসনিক সূত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রী কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন নি। সুনির্দিষ্ট কর্মদক্ষতা সূচকের (কেপিআই) মাধ্যমে পুরো সরকারের পারফরম্যান্স মনিটর করছেন তিনি।

এসব তদারকির মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল অ্যাটেনডেন্স ও সচিবালয়ে সময়ানুবর্তিতা প্রদর্শন। সরকারি চাকরিতে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা ও ফাঁকিবাজির সংস্কৃতি দূর করতে মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও সচিবদের সময়মতো অফিসে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্র্যাকিং ও অনলাইন সিস্টেম চালু করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে প্রতিদিন সকালে সচিবালয় ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের সূচি পর্যবেক্ষণ করেন। কোনো মন্ত্রী বা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ের পর অফিসে উপস্থিত হলে বা যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া অনুপস্থিত থাকলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে তাৎক্ষণিক কৈফিয়ত তলব করা হচ্ছে।

তাছাড়া ৩১ দফা বাস্তবায়ন ও জরুরি অগ্রাধিকার মনিটরিং করা হচ্ছে। বিএনপির ঘোষিত ‘৩১ দফা’ রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচির ওপর ভিত্তি করেই জনগণ তাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে। এই ৩১ দফার কতটা কোন মন্ত্রণালয়ে কতটুকু অগ্রগতি লাভ করেছে, সে-সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রতি সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দিতে হচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক লুটপাটকারীদের বিচার এবং জ্বালানি খাতের সংস্কারসংক্রান্ত পদক্ষেপে সামান্যতম অবহেলা বা শ্লথগতি দেখা গেলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে।

‘ড্যাশবোর্ড মনিটরিং’ ও মাঠপর্যায়ের ফিডব্যাক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ পর্যবেক্ষণ করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি সার্বক্ষণিক ‘অ্যাকশন সেন্টার’ বা ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড কার্যকর রয়েছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিশেষ মাঠপর্যায়ের টিমের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে সাধারণ মানুষ সরকারের সেবা থেকে কী ধরনের সুবিধা পাচ্ছে, তার বাস্তব চিত্র সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে পৌঁছায়। যেসব মন্ত্রী বা উপদেষ্টা কেবল সচিবালয়নির্ভর হয়ে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে আছেন এবং মাঠপর্যায়ের কাজের তদারকি কম করছেন, ড্যাশবোর্ডে তাদের রেটিং ইতোমধ্যে নিচের দিকে নেমে গেছে।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের বক্তব্যের পর থেকে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে নতুন করে এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তারা মনে করছেন, এ ধরনের কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করেই হয়তো সরকার মন্ত্রী-উপদেষ্টা পদে পরিবর্তন আনতে চেষ্টা করবে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ মেয়াদে ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর মন্ত্রিসভা অনেকটা ঢেলে সাজিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেসময় শেখ হাসিনা ৩৭ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন, যেখানে পুরনো ১৫ জন মন্ত্রী ও ১৩ জন প্রতিমন্ত্রীকে বাদ দিয়ে বড় ধরনের রদবদল আনা হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী ছাড়া ২৫ জন পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী এবং ১১ জন প্রতিমন্ত্রী নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়। আ ক ম মোজাম্মেল হক ও ওবায়দুল কাদেরের মতো পুরোনো নেতারা স্বপদে বহাল থাকলেও আ হ ম মুস্তফা কামাল, এ কে আব্দুল মোমেন ও জাহিদ মালেকের মতো হেভিওয়েট মন্ত্রীরা বাদ পড়েন।

কিন্তু সে সময় কী পদ্ধতিতে এই মূল্যায়ন করা হয়, তা নিয়ে রাজনৈতিক ওই দল বা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা বা ধারণা দেওয়া হয়নি। এর আগেও বিভিন্ন সময় দুই একজন মন্ত্রীর চেয়ার বদল হলেও তার সুস্পষ্ট কোনো মেথড ছিল না। বরং দুর্নীতি করেও অনেকে স্বপদে টিকে ছিলেন। তবে কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর বড় ধরনের কোনো সামাজিক অবক্ষয় সামনে এলে তখন তাকে সরিয়ে দিতে দেখা গেছে। বিশেষ করে তৎকালীন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের পদত্যাগের বিষয়টি ছিল এমন একটি পরিবর্তনের ঘটনা।

অতীতের এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সুনির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি নয়, বরং রাজনৈতিক চাপ ও কৌশল প্রণয়ণে গুরুত্ব বিবেচনায় মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনা হতো।

তবে তারেক রহমানের নেতৃত্বধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে অনেক ক্ষেত্রেই নতুনত্ব এবং সচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এর ফলে মন্ত্রী-উপদেষ্টা বদলের ঈঙ্গিতে বিএনপি দলটির মধ্যে নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে।

প্রবীণদের ক্ষোভ, আক্ষেপ ও প্রত্যাশার সমীকরণ
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে মন্ত্রিসভা গঠন করেন, সেটি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেরও বেশ চমকে দিয়েছিল। এই মন্ত্রিসভায় তুলনামূলক তরুণ ও নতুন মুখগুলোর প্রাধান্য ছিল চোখে পড়ার মতো। অবাক করার মতো বিষয় হলো, অতীতে বিএনপি সরকারে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, এমন অভিজ্ঞ ও হেভিওয়েট নেতার সংখ্যা এই মন্ত্রিসভায় ছিল মাত্র ছয়জন।

দলের নীতি-নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ ও প্রবীণ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মতো রাজপথের লড়াকু নেতৃত্ব মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাননি। বর্ষীয়ান নেতা মির্জা আব্বাসকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হলেও তাকে নির্দিষ্ট কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।

দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশের মধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি চাপা আলোচনা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, লন্ডনভিত্তিক একটি নীতি-নির্ধারণী ও তরুণ থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক টিমের ওপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আস্থা বৃদ্ধি পাওয়ায়, দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা সরকার পরিচালনায় কিছুটা আড়ালে পড়ে গেছেন। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বিএনপির প্রায় ৬০ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে প্রায় দেড় লাখ মামলার ধকল সামলাতে হয়েছে। যারা রাজপথে থেকে হামলা-মামলা, কারাবরণ আর পুলিশের লাঠিচার্জ সয়েছেন, তাদের মধ্যে ক্ষমতা গ্রহণের পর কিছুটা আক্ষেপ তৈরি হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক।

আলোচিত ও অপেক্ষমাণ নেতাদের তালিকাটাও বেশ দীর্ঘ। এর মধ্যে অন্যতম হলেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দিনের পর দিন অবরুদ্ধ থেকে, কখনো পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রতিদিন সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপির ঝাণ্ডা শক্ত হাতে ধরে রেখেছিলেন তিনি। কর্মীদের কাছে ‘আবাসিক নেতা’ হিসেবে পরিচিত এই ত্যাগী নেতাকে মন্ত্রী না করে উপদেষ্টা করা হয়েছে, যা তৃণমূলের অনেক কর্মীর কাছেই কাঙ্ক্ষিত ছিল না।

একইভাবে ঢাকা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেল, যিনি সাড়ে চারশ’র বেশি রাজনৈতিক ও গায়েবি মামলার আসামি এবং জীবনের একটি বড় সময় কারাগারে কাটিয়েছেন, তিনি এখনো সরকারে কোনো দায়িত্ব পাননি। তিন শতাধিক মামলার মুখোমুখি হওয়া দলের আরেক প্রভাবশালী নেতা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালও এখনও মূল্যায়নের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।

তবে বিএনপির হাইকমান্ডের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বাংলানিউজকে নিশ্চিত করেছে, তরুণ ও প্রবীণদের এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। মন্ত্রিসভার আকার বাড়ানো হবে এবং সম্প্রসারণ ঘটবে। সেখানে ভৌগোলিক ভারসাম্য ও অভিজ্ঞতার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটানো হবে। বিশেষ করে নোয়াখালী অঞ্চল থেকে সরকারের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান ও রাজপথের লড়াকু নেতা জয়নুল আবদিন ফারুকের মতো প্রবীণ নেতাদের অন্তর্ভুক্তির জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।

রাজপথের ত্যাগ ও রাষ্ট্র সংস্কারের এক মেলবন্ধন
ক্ষমতা হস্তান্তরের পর যেকোনো বৃহৎ রাজনৈতিক দলেই তরুণদের আগ্রাসী মনোভাব ও প্রবীণদের অভিজ্ঞতার মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের বিচক্ষণতায় আসন্ন বাজেট অধিবেশন-পরবর্তী সময়টি হতে যাচ্ছে দল ও সরকার উভয় ক্ষেত্রেই একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

বাংলানিউজকে দেওয়া এক একান্ত প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বক্তব্য এই প্রত্যাশাকে আরও বেশি স্পষ্ট করে তুলেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের দলের প্রত্যেক নেতাকর্মীর ত্যাগ অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। সবেমাত্র সরকার গঠন হয়েছে। ফ্যাসিবাদীদের রেখে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশ গঠনের কাজ চলমান রয়েছে। আমি আশা করি, একটা সময় কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত আমাদের ত্যাগী নেতারা অবশ্যই মূল্যায়িত হবেন।’

একদিকে তরুণদের হাত ধরে আসা আধুনিকতার ছোঁয়া, অন্যদিকে প্রবীণদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলার প্রজ্ঞা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার মজবুত ভিত্তি, এই দুইয়ের অভাবনীয় সমন্বয়ে নতুন সরকার রাষ্ট্র সংস্কার এবং জনআকাঙ্ক্ষা পূরণের কঠিন ও কণ্টকাকীর্ণ পথে কতদূর এগিয়ে যেতে পারে, সমগ্র জাতি এখন সেই দৃশ্যই অবলোকন করছে।

উন্নত বিশ্বে আছে মূল্যায়নের ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি
সরকার পরিচালনা এবং মন্ত্রীদের যোগ্যতা ও পারফরম্যান্স মূল্যায়নে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি রয়েছে। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে মন্ত্রীদের মূল্যায়নে যে মডেলগুলো ব্যবহৃত হয়, সেগুলো বর্তমানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রয়োগের চেষ্টা করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

যুক্তরাজ্যের মডেল: যুক্তরাজ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি ডেডিকেটেড ‘ডেলিভারি ইউনিট’ (Cabinet Office Implementation Unit) থাকে। সেখানে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেক মন্ত্রীকে একটি লিখিত ‘ম্যান্ডেট লেটার’ দেন, যেখানে পরবর্তী ৬ মাস বা ১ বছরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত থাকে। এছাড়া ‘সিলেক্ট কমিটি’র মাধ্যমে সংসদীয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়। বাংলাদেশ সরকারও এখন মন্ত্রীদের টার্গেট বেঁধে দিয়ে কাজ আদায় করে নেওয়ার এই ব্রিটিশ নীতি অনুসরণ করছে।

সিঙ্গাপুরের ফলাফলনির্ভর নীতি: বিশ্বের সবচেয়ে দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থার দেশ সিঙ্গাপুরে মন্ত্রীদের মূল্যায়ন সরাসরি তাদের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে। জিডিপি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মতো সূচকের ওপর ভিত্তি করে মন্ত্রীদের বোনাস ও মেয়াদ নির্ধারিত হয়। কাজে ব্যর্থ হলে বা প্রটোকল ভঙ্গ করলে সেখানে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। তারেক রহমানের বর্তমান সরকারেও এই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ছোঁয়া স্পষ্ট।

কানাডা ও নিউজিল্যান্ডের স্বচ্ছতা: কানাডায় জাস্টিন ট্রুডোর সরকার মন্ত্রীদের দেওয়া দায়িত্ব ও তার বাস্তবায়নের চিত্র ‘ম্যান্ডেট লেটার ট্র্যাকার’ নামে পাবলিক ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। নিউজিল্যান্ডেও সরকারি পরিষেবার মান উন্নয়ন এবং মন্ত্রীদের উপস্থিতির ভিত্তিতে র‌্যাংকিং করা হয়। বর্তমান সরকারও কাজের স্বচ্ছতা আনতে ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড ব্যবহারের মাধ্যমে সেই পথেই হাঁটছে।

মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের পারফরম্যান্স যাচাইয়ের পদ্ধতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীদের কাজের ভালোমন্দ যাচাই করার জন্য কী কী মানদণ্ড বা সূচক নির্ধারণ করেছেন, তা আমাদের জানা নেই। সূচকগুলো জানা থাকলে এ বিষয়ে হয়তো বিস্তারিত মন্তব্য করা যেত। তবে মন্ত্রীদের পারফরম্যান্সের বিচার বা মূল্যায়ন অবশ্যই হওয়া উচিত।’

Share