
গাজী আবু বকর : প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, সাকিব আল হাসান ‘নষ্ট-পচে যাওয়া মানুষ’। তিনিসহ তাঁর নেত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে পূর্ণ নিরাপত্তার সঙ্গে বিচারের মুখোমুখি হবেন। বিচারে আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন, সেটিই সবাইকে মেনে নিতে হবে। আজ মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার বাংলাদেশের সাকিব আল হাসানের সম্প্রতি রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারের বিষয়ে এই প্রতিনিধি জানতে চান যে, তিনি এবং তাঁর নেত্রী মামলা মোকাবেলায় দেশে ফিরলে তাদের নিরাপত্তা বিধান করা হবে কিনা।
জবাবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, কেউ বাংলাদেশে এসে মামলা, আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে চাইলে তার নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তিনি দিল্লিতে অনুষ্ঠিত একটি সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সাকিব আল হাসানের কথা বলার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘ক্রিকেটার ও সাবেক সংসদ সদস্য সাকিব আল হাসান ভালো খেলোয়াড় হতে পারেন। উনি একজন নষ্ট-পচে যাওয়া মানুষ, যে মানুষ হাসিনার সঙ্গে অ্যালাইন হন এবং এখনো অ্যালাইন থাকেন। মূলত সাকিব আল হাসান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে ‘ফালতু’ কথা বলেছেন। তিনি দেশে ফিরলে নিরাপত্তার সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ মোকাবিলা করতে পারবেন।
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, শুধু সাকিব আল হাসান-ই নন, তাঁর নেত্রী শেখ হাসিনাও ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার কথা বলেছেন। দেশে ফিরলে তাঁকেও পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা দেওয়া হবে। সবচেয়ে বীভৎস মানুষটাও তার নাগরিক অধিকার পাবে এবং সব ধরনের অধিকার নিশ্চিত করে বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা হবে। এরপর আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন, তা সবাইকে মেনে নিতে হবে।
জাহেদ উর রহমান আরও বলেন, ‘আমরা হাসিনার মতো একটা মাফিয়া রেজিম এই দেশে আর দেখতে চাই না। এটা ভবিষ্যতেও হতে দেব না, কোনো ফ্যাসিস্ট মাফিয়া রেজিম না। এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।’
সাকিব আল হাসান বা শেখ হাসিনা—যিনিই হোন না কেন, সবচেয়ে গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিরও নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করা হবে বলেও মন্তব্য করেছেন তথ্য উপদেষ্টা।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক নতুন করে তৈরি হবে। গত ১৭ বছর যেভাবে সম্পর্ক ছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে সমতার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। তিনি বলেন, ‘বন্ধু পাল্টানো যায়, কিন্তু প্রতিবেশী পাল্টানো যায় না।’
ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ প্রসঙ্গে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের (র) প্রধান পরাগ জৈনের ঢাকা সফর নিয়ে গুঞ্জনের কিছু নেই। তিনি বলেন, র-প্রধান চীন থেকে এসেছেন। এটা এক ধরনের সফর। তিনি এখানে তার কাউন্টারপার্টের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এ নিয়ে সরকার মনে করলে সফরের পর বিবৃতি দিতে পারে। এটা নিয়ে স্পেকুলেশনের (জল্পনা-কল্পনা) কিছু নেই। আমাদের গোয়েন্দা প্রধানও ভারতে গেছেন, সফর করেছেন।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুনভাবে ‘রিঅ্যালাইন’ করতে হবে বলে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, আমাদের তো প্রতিবেশী পাল্টানো সম্ভব নয়। বন্ধু পাল্টানো যায়-পররাষ্ট্রনীতিতে এমন কথা বলা হয়। তাই আমাদের এনগেজ করতে হবে। আমাদের সম্পর্ক নতুন করে রিঅ্যালাইন করতে হবে। তাই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, তবে তা হতে হবে দুই স্বাধীন, সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের পারস্পরিক স্বার্থ ও মর্যাদার ভিত্তিতে।
তিনি বলেন, আগে ভারত যেভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে চেয়েছিল, সেখানে নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রবণতা ছিল। ভবিষ্যতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সরকারের সঙ্গে নয়, বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তৈরি হতে হবে।
উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা আগের মতো বাংলাদেশে কাজ করতে পারবে না। একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল দেশের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করতে হয়, সেভাবেই সম্পর্ক পরিচালনা করতে হবে। ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে তাদের বক্তব্য থাকতে পারে, আমাদেরও থাকতে পারে। এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু দুই স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের মধ্যে যে ধরনের আলোচনা হওয়া উচিত, সেভাবেই হতে হবে। এ বিষয়টি নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।
বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে কোনো সম্পর্ক তৈরি করা হবে না জানিয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, জনগণের নির্বাচিত সরকার কোনো দেশের সঙ্গে এমন কোনো সম্পর্ক তৈরি করবে না, যাতে দেশের জনগণ বা রাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান-বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি), প্রেস কাউন্সিল ও তথ্য কমিশনে দৃশ্যমান পরিবর্তন না আসায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকার কোনো ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে চায় না।
তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্রে বিভিন্ন মতাদর্শ ও চিন্তার মানুষ সরকারি দায়িত্বে থাকতে পারেন। যতক্ষণ পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতা না থাকে, ততক্ষণ শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কাউকে সরিয়ে দেওয়া সরকারের নীতিগত অবস্থান নয়। তবে যারা আগের সরকারের সঙ্গে প্রকাশ্যে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন এবং সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন, তাদের বিষয়ে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। ভারতের পক্ষ থেকেও আলাদাভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আর প্রধানমন্ত্রী যেকোনো সময় ভারতে যেতে পারেন।’
সংবাদ সম্মেলনে তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ উপস্থিত ছিলেন ।
