রাজাকারের মেয়ে এসএসসি পাস লুপার পেশা ছিল সাংবাদিক পরিচয়ে তদবির করা

নিজস্ব বার্তা প্রতিবেদক : রাজাকারের মেয়ে এসএসসি পাস নাজমা আক্তার লুপা ওরফে লুপা সিনিয়র সাংবাদিক পরিচয়ে আওয়ামী লীগের কিছু নেতার সঙ্গে সখ্য গড়ে পুরো পরিবারই হয়ে গেছে ‘রাজনৈতিক মামলার শিকার আওয়ামী লীগ পরিবার’। গৃহকর্মী ধর্ষণ ও শিশু সন্তানসহ হত্যার মামলায় তদন্তে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হওয়ার পরও মামলাটি ‘রাজনৈতিক বিবেচনার’ তালিকাভুক্ত করতে সক্ষম হন লুপা। পটুয়াখালী জেলার মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে এমনটা দাবি করা হয়েছে।

স্থানীয় পর্যায়ে লুপার পরিচিতি অনেক বড় মাপের সাংবাদিক হিসেবে। তাঁদের ধারণা, গ্রামের স্কুলের এসএসসি পাস এই নারীর ক্ষমতার হাত অনেক লম্বা। ক্ষমতাধর অনেকের সঙ্গেই সম্পর্ক রয়েছে তাঁর। চাকরি, বদলি বা ঠিকাদারি কাজ—সবই তদবিরে পাইয়ে দিতেন লুপা। বিনিময়ে হাতিয়ে নিতেন টাকা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) এলাকায় ফুল বিক্রেতা শিশু জিনিয়াকে অপহরণের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর ‘পরিচয় প্রতারক’ লুপার এমন নানা অপকর্মের তথ্য উঠে এসেছে।

তদন্তকারী ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, লুপা পটুয়াখালী থেকে ঢাকায় এসে সাংবাদিক পরিচয়ে তদবির বাণিজ্য ও প্রতারণা করে যাচ্ছিলেন। অবৈধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের পরিকল্পনায়ই তিনি ৯ বছরের শিশু জিনিয়াকে অপহরণ করেন বলে সন্দেহ করছেন তদন্তকারীরা। চাকরি দেওয়ার নাম করে পটুয়াখালীর দুই ব্যক্তির কাছ থেকে ১৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে সম্প্রতি লুপার বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। পটুয়াখালীতেও তাঁর কুকীর্তি নিয়ে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।

গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম বলেন, শিশু অপহরণকারী লুপার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তদন্তে এগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রিমান্ড শেষে গত শুক্রবার তাঁকে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

তদন্তকারীরা জানান, ফেসবুকের প্রফাইলে লুপা নিজেকে অগ্নি টিভির ম্যানেজিং ডিরেক্টর, আওয়ামী পেশাজীবী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক, সিনিয়র রিপোর্টার নবচেতনা, সিনিয়র রিপোর্টার ও সিনিয়র ক্রাইম রিপোর্টার মোহনা টিভি, ডিরেক্টর শীর্ষ টিভি, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাপ্তাহিক শীর্ষ সমাচার এবং বাংলাদেশ কবি পরিষদের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। গ্রেপ্তারের পর তিনি মোহনা টিভিতে একবার চাকরি করেছেন বলে একটি বিজনেস কার্ড দেখিয়েছেন।

মাদকাসক্তসহ ব্যক্তিগত জীবনে বেপরোয়া চলাফেরা করা লুপার চারটি বিয়ের খবর পাওয়া গেছে। রাজধানীর ‘মোতালেব প্লাজার’ পেছনে একটি ফ্ল্যাটে থাকেন তিনি। গত বছর ওই বাসা থেকে লুপার এক ছেলের লাশ উদ্ধার হলে তিনি এটিকে আত্মহত্যা বলে দাবি করেন। লুপার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করায় আরটিভির পটুয়াখালী প্রতিনিধি মুফতি সালাহ উদ্দিনের বাবার বিরুদ্ধে মিথ্যা গুম মামলা দিয়ে হয়রানি করেন তিনি।

ডিবির রমনা অঞ্চলের অতিরিক্ত উপকমিশনার মিশু বিশ্বাস বলেন, ‘লুপার জীবন যাপন নিয়ে বিস্তর অভিযোগ আছে।’

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৩ সালে পটুয়াখালীর গলাচিপা থানায় লুপা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা হয়। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শাহিনুর নামে এক গৃহকর্মীকে লুপার সাবেক স্বামী রফিকুল ইসলাম বাদল ওরফে শহীদ বাদল ধর্ষণ করেন। এতে শাহিনুর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে লুপা ও তাঁর স্বামী সন্তানসহ ওই গৃহকর্মীকে শ্বাসরোধে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেন। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্তে লুপা, তাঁর বাবা প্রয়াত রাজাকার নান্না মিয়া, তাঁর দুই ভাই প্রয়াত মোস্তাফিজুর রহমান লিটন তালুকদার ও মোস্তাইনুর রহমান লিকন তালুকদার, সাবেক স্বামী শহীদ বাদল, সহযোগী সুজন, হাকিম আলী, সেরাজ মিয়া, আলী হোসেন, ইছাহাক আলীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

২০০৮ সালের নির্বাচনে মহাজোট ক্ষমতায় এলে গলাচিপা উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রত্যয়নপত্র নিয়ে লুপা নিজেকে আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য হিসেবে প্রচার শুরু করেন। ২০১৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন অধিশাখা-১-এর উপসচিব মো. মিজানুর রহমান মামলার আসামি মোস্তাফিজুর রহমান ওরফে লিটন, মোস্তাইনুর রহমান ওরফে লিকন, হাকিম আলী, আলী হোসেন ও লুপা বেগমের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন না চালানোর সিদ্ধান্তের কথা পটুয়াখালী জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে জানিয়ে দেন। মামলার অন্য আসামিদের সাজা হলেও লুপা ও তাঁর স্বজনরা অব্যাহতি পেয়ে যান।

লুপাকে প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার কথা অস্বীকার করে গলাচিপা উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি হারুন অর রশীদ গত শুক্রবার গলাচিপা থানায় একটি জিডি করেন। গতকাল তিনি বলেন, ‘আমরা লুপাকে প্রত্যয়নপত্র দিইনি। সে প্রতারণা করে থাকতে পারে। গলাচিপায় স্বাধীনতাবিরোধী দু-তিনটি পরিবারের মধ্যে তাদের পরিবার একটি।’