অজানা মৃত্যুর ১৫ হাজার মামলার তদন্ত আটকে আছে

বিশেষ প্রতিবেদক : পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের কাগজিটোলার একটি বাড়ি থেকে গত ১৬ জানুয়ারি ২৫ বছর বয়সী মো. নয়নের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মৃত্যুর কারণ নিয়ে স্বজনদের সন্দেহ থাকায় মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়। আট মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় আছে পুলিশ। নয়নের মৃত্যুর কারণ কী, তা নিশ্চিত হওয়া তো দূরের কথা, অপমৃত্যুর মামলাটির তদন্তও শেষ করতে পারছে না পুলিশ।

নয়নের মতো ঘটনার উদাহরণ আরও আছে। এসব মৃত্যু ও অপমৃত্যুর মামলার তদন্ত আটকে আছে ময়নাতদন্ত, ভিসেরা, ডিএনএ প্রতিবেদন ও চিকিৎসা সনদ না পাওয়ায়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক থেকে চার বছরে এমন মামলার সংখ্যা ১৫ হাজার ৭৪৭। এর মধ্যে ৮ হাজার ২৩৯টিতে চিকিৎসা সনদ, ৬ হাজার ৬১৩টিতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ৬২৯টিতে ডিএনএ প্রতিবেদন এবং ২৬৬টিতে ভিসেরা প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ময়নাতদন্ত ও চিকিৎসা–সংক্রান্ত প্রতিবেদন যথাসময়ে না পাওয়ায় বিপুলসংখ্যক মৃত্যু ও অপমৃত্যুর মামলার তদন্ত শেষ করা যাচ্ছে না। এতে মামলার জট তৈরি হয়েছে।

নয়নের মরদেহ উদ্ধারের পর সূত্রাপুর থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়। মামলাটি তদন্ত করছেন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. লোকমান হোসেন। গত সপ্তাহে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, প্রায় আট মাস আগে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের মর্গে নয়নের মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়েছিল। পরে প্রতিবেদন নিতে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে গেলে জানানো হয়, প্রতিবেদন এখনো প্রস্তুত হয়নি। আরও সময় লাগবে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়ায় মামলার তদন্ত শেষ করতে পারছেন না বলে তিনি জানান।

ঝুলন্ত মরদেহ, পরিবারের সন্দেহ হত্যা

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ২১ বছর বয়সী গৃহবধূ হালিমা আক্তারের মৃত্যুর ঘটনার তদন্তও আটকে আছে। উপজেলার বটতলী ইউনিয়নের পশ্চিম বরৈয়া থেকে ১০ মে হালিমার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় আনোয়ারা থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়। পরিবারের অভিযোগ, হালিমাকে হত্যা করে মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়।

নিহত হালিমার বড় ভাই নঈম উদ্দিন বলেন, ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে হালিমার স্বামী মুঠোফোনে জানান, হালিমা গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তাঁরা দ্রুত গিয়ে দেখেন, শোবার ঘরের ছাদের সঙ্গে মরদেহ ঝুলছে এবং পা মাটিতে স্পর্শ করা।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০২৩ সালের ২৫ অক্টোবর হালিমার সঙ্গে মিজানুরের বিয়ে হয়। তাঁদের দেড় বছর বয়সী একটি মেয়ে আছে। স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়াবিবাদ হতো। এ নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে সালিসও হয়েছিল। ঘটনার পর হালিমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন গা ঢাকা দিয়েছেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।

আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জুনায়েত চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে এখনো হালিমার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। তাই মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না, তদন্তও শেষ করা যাচ্ছে না।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো ব্যক্তির অস্বাভাবিক, আকস্মিক বা সন্দেহজনক মৃত্যুর ঘটনায় অনেক সময় ঘটনাস্থল বা প্রাথমিক তদন্তে সরাসরি হত্যার আলামত পাওয়া যায় না। তখন সাধারণত অপমৃত্যুর মামলা করা হয়।

গলায় ফাঁস, বিষপান, ভবন বা উঁচু স্থান থেকে পড়ে মৃত্যু, পানিতে ডুবে মৃত্যু, আগুনে পুড়ে মৃত্যু, সড়ক বা রেল দুর্ঘটনা, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া বা অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারসহ বিভিন্ন ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, ময়নাতদন্ত ও তদন্তে যদি স্বাভাবিক মৃত্যু, আত্মহত্যা বা দুর্ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে অপমৃত্যুর মামলার প্রতিবেদন তৈরি করতে পুলিশের জন্য সহজ হয়। আর ময়নাতদন্ত বা তদন্তে হত্যার আলামত পাওয়া গেলে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হয়।

মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন অনেক ক্ষেত্রেই তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি। সেটি না পাওয়া পর্যন্ত অনেক মামলায় পরবর্তী ধাপে যাওয়া সম্ভব হয় না বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

ঢাকায় ঝুলে আছে ১ হাজার ৩৫৬ মামলা

রাজধানীতে এই সমস্যার চিত্র আরও স্পষ্ট। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা প্রতিবেদন না পাওয়ায় ১ হাজার ৩৫৬টি অপমৃত্যু মামলার তদন্ত শেষ করা যায়নি। এর মধ্যে ২০২৩ সালে ২টি, ২০২৪ সালে ৭১টি, ২০২৫ সালে ৪৫০টি এবং ২০২৬ সালে ৮৩৩টি মামলা রয়েছে।

ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ) মো. ফারুক হোসেন বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ছাড়া অপমৃত্যুর মামলার তদন্ত শেষ করা যাচ্ছে না। প্রতিবেদন অনুযায়ী অনেক মামলাই পরে হত্যা মামলায় রূপ নেয়।

ফারুক হোসেন আরও বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেতে যত দেরি হবে, মামলার সাক্ষ্য–প্রমাণ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তত বাড়বে। এতে বাদী বা ভুক্তভোগী পরিবারের মধ্যে পুলিশের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি হতে পারে। তদন্তেও দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে।

ডিএমপির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে অনেক মামলার ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ মো. মাজহারুল শাহীন বলেন, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে তথ্যগত ভুলসহ যৌক্তিক কারণে কোনো ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন আটকে আছে কি না, তা দেখা হবে। এরপর ফরেনসিক বিভাগের প্রধানের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

অনেক ক্ষেত্রে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মরদেহের ভিসেরা পরীক্ষার জন্য ঢাকার মহাখালীর রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। সেখান থেকে প্রতিবেদন পেতে দেরি হলে ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরিতেও কিছুটা সময় লাগে।

তবে এত বিপুলসংখ্যক ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন আটকে থাকার কথা নয় বলে মনে করেন দেশের ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের সংগঠন দ্য মেডিকোলিগ্যাল সোসাইটি বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক মোস্তাক রহিম (স্বপন)। তিনি বলেন, দেশে ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞের সংকট রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের সহযোগিতা নিয়ে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন দ্রুত তৈরি করে পুলিশ বিভাগে পাঠানোর উদ্যোগ নেবে মেডিকোলিগ্যাল সোসাইটি বাংলাদেশ।

হত্যা মামলা হলেও অজানা মৃত্যুর কারণ

রাজধানীর ধানমন্ডির ১১ নম্বর সড়কের একটি ১১ তলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে ২ মে আল মুকাব্বির ইসলাম ওরফে অর্ণবের (৩২) রহস্যজনক মৃত্যু হয়। প্রথমে এ ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হয়। পরে তাঁর মা হালিমা খাতুনের করা মামলাটি আদালতের নির্দেশে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ করে ধানমন্ডি থানা।

মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, মুকাব্বিরের প্রয়াত বাবা রফিকুল ইসলাম ভূঞার রেখে যাওয়া শতকোটি টাকার সম্পত্তি দখলের জন্য তাঁর চাচা, চাচিসহ ১২ জন তাঁকে হত্যা করেছেন।

ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইমদাদুল ইসলাম বলেন, মুকাব্বিরের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

পুলিশের চিঠি, তবু কমছে না জট

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ময়নাতদন্ত, ভিসেরা, ডিএনএ প্রতিবেদন ও চিকিৎসা সনদ পেতে দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতালে একাধিক চিঠি দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের কাছেও একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে।

একটি আবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন থানায় হওয়া মৃত্যু ও অপমৃত্যুর মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও জখমি চিকিৎসা সনদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোন কোন মামলায় এসব প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি, তার তালিকাও সংগ্রহ করা হয়েছে।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেন, মাসের পর মাস ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন তৈরি না হওয়ায় মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যায়। এতে মামলাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে বিচার বিলম্বিত হয়। সাক্ষীরাও উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন।

মামলার তদন্ত আটকে থাকার বিষয়ে গতকাল শুক্রবার পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মো. আবদুল কাইয়ুম বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অনেক অপমৃত্যুর মামলা হত্যা মামলায় রূপ নেয়। তাই ময়নাতদন্ত, ভিসেরা ও ডিএনএ প্রতিবেদন ফেলে রাখা গ্রহণযোগ্য নয়। এতে তদন্ত ও মামলা নিষ্পত্তি আটকে যায় এবং মৃত ব্যক্তির পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। ভিসেরা প্রতিবেদন তৈরিতে সর্বোচ্চ তিন মাস লাগতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিবেদন পেতে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে পুলিশকে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে।

আবদুল কাইয়ুম আরও বলেন, প্রয়োজনীয় জনবলসংকট দ্রুত দূর করতে হবে এবং অবহেলায় দীর্ঘদিন প্রতিবেদন আটকে রাখার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

Share