তদন্ত কমিটির মুখোমুখি ওসি রাকিবুল

শাস্তির আশঙ্কায় আরো অনেক পুলিশ কর্মকর্তা


বিশেষ প্রতিবেদক : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও রেকর্ডকে কেন্দ্র করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মো. রাকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের কাজ শুরু করেছে। তাঁকে ডিএমপি সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করার পর কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

সেখানে তিনি অভিযোগের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে আরো অনেক পুলিশ কর্মকর্তার মধ্যে শাস্তির বিষয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

রাকিবুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ফেসবুকে এ ধরনের তথ্য দেওয়া নিষেধ থাকা সত্ত্বেও ওসি রাকিবুল কেন এমন ঝুঁকি নিলেন, নাকি তিনি কোনো অপকৌশলের শিকার হলেন—এ বিষয়সহ তাঁর অতীত কর্মকাণ্ড ও পারিবারিক অবস্থান নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আরো অনেক পুলিশ কর্মকর্তাকে একই ধরনের ভুলের বিষয়ে বিভাগীয় শাস্তির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

এতে কিছুটা আতঙ্কের মধ্যে আছেন তাঁরা। গতকাল শুক্রবার ডিএমপির একাধিক সূত্র এ তথ্য দিয়েছে।
এ বিষয়ে ডিএমপির ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি রাকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় ডিএমপির পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ডিবিপ্রধান বলেন, কমিটিতে তিনি ছাড়াও অন্য দুজন ডিএমপি সদর দপ্তরের কর্মকর্তা রয়েছেন। ওসিকে ভাইরাল হওয়া অডিওর বিষয় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

ডিএমপি সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদের সই করা এই আদেশে রাকিবুল হাসানকে প্রত্যাহার করা হয়। আদেশটি গত বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর হয়।

পুলিশ সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনগুলো যেন কোথাও তৎপরতা চালাতে না পারে, সে জন্য রাজধানীসহ সার দেশে পুলিশের টহল ও নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। সম্প্রতি পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে একধিক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এ বিষয়ে গতকাল নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএমপির একাধিক ওসি বলেন, তাঁরা ঝটিকা মিছিলের বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশনা পেয়েছেন। সেই সঙ্গে প্রতিটি থানা এলাকায় তাঁদের টহল জোরদার করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এ নিয়ে তাঁরা প্রকাশ্যে কথা বলা থেকে বিরত রয়েছেন।

ডিএমপি সূত্র বলছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে ডিএমপির ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয় তাঁকে। রাত সোয়া ১২টা পর্যন্ত ডিবি কার্যালয়ে ছিলেন তিনি। ডিবি সূত্র বলছে, নিয়ম অনুযায়ী কারো বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আগে এ ধরনের অনুসন্ধান করা হয়।

ডিএমপি সূত্র বলছে, আগে থেকে পুলিশ সদস্যদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (ফেসবুক) ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সতর্ক করা হয়। এর পরও ওসি রাকিবুল হাসান ফেসবুকে সরব ছিলেন। এ কারণে তাঁকে ক্যান্টনমেন্ট থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফেসবুক ব্যবহারকারী আরো অনেক ওসিসহ পুলিশ কর্মকর্তার ওপর নজরদারি চলছে।

গুলশানের ওসি-ডিসির বিষয়ে চলছে তদন্ত : এর আগে সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মিছিলের ঘটনায় গুলশান থানার ওসি মো. দাউদ হোসেনের পর গুলশান বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) এম তানভীর আহমেদকেও দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর পর থেকে তাঁদের বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে।

এ বিষয়ে গত বুধবার ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদের সই করা পৃথক অফিস আদেশে গুলশান বিভাগের ডিসি এম তানভীর আহমেদ ও গুলশান থানার ওসি মো. দাউদ হোসেনকে প্রত্যাহারের বিষয়টি জানানো হয়।

আদেশ অনুযায়ী, এম তানভীর আহমেদকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত প্রশাসনিক কারণে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। তাঁকে পরবর্তী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে দায়িত্ব অর্পণ করে সদর দপ্তরে রিপোর্ট করতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে ওসি মো. দাউদ হোসেনকে ডিএমপি সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।

গত ১১ সেপ্টেম্বর দুপুর পৌনে ১২টার দিকে গুলশান-১-এর ৩ নম্বর সড়কের কেএফসিসংলগ্ন এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিল বের করেন। পুলিশ মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করতে গেলে পুলিশের দিকে ককটেল ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। ঘটনাস্থল থেকে কয়েকটি ককটেলসহ দুজনকে আটক করা হয়।

এ ঘটনায় গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয়েছে। পরে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে এ ঘটনায় অন্তত ৭৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, বিভিন্ন দূতাবাস ও কূটনীতিকদের আবাসস্থলঘেরা গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কিভাবে নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীরা জড়ো হয়ে মিছিল করার সুযোগ পেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এ নিয়ে গোয়েন্দা নজরদারি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়।

এ বিষয়ে গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গুলশানে মিছিলের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য ছিল। তবে পুলিশ নির্দিষ্ট সময়ে বিষয়টি সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেনি। তাঁর ভাষ্য, বিষয়টিকে সরাসরি গোয়েন্দা ব্যর্থতা বলার সুযোগ নেই এবং পরবর্তী সময়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

আতঙ্কে পুলিশ : এদিকে আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ঝটিকা মিছিলকে কেন্দ্র করে ডিএমপির আটটি ক্রাইম জোনের উপকমিশনার (ডিসি) ও ওসিরা এখন অনেকটা আতঙ্কের মধ্যে আছেন।

এ বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, কোনো এলাকায় ঝটিকা মিছিল করলে তার দায়দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট এলাকার ওসি ও ডিসিকে নিতে হবে। এর পর থেকে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ এনে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। গত সোমবার ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ আগস্ট মাসের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় উপস্থিত সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এ নির্দেশ দেন। ডিএমপি সদর দপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সভাটি হয়।

ডিএমপি কমিশনার বলেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিষয়ে আইনানুগভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ সংঘটনের আগেই তাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও তাৎক্ষণিকভাবে কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

Share