আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ৬ মামলায় ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড

মানবতাবিরোধী অপরাধের ৭১ মামলায় ৫০২ আসামি, পলাতক ৩১৫ জন

বিশেষ প্রতিনিধি : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ এর বিশ্বকাপানো জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয়টি মামলার রায় হয়েছে। রায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে । এর বাইরে যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে ৪৬ জনকে।

অবশ্য ট্রাইব্যুনালে জুলাইয়ের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের শাসনামলের গুম, খুন ও নির্যাতনের ঘটনায় করা মামলাও রয়েছে। সব মিলিয়ে মামলা ৭১টি। গুম–খুনের কোনো মামলার রায় এখনো হয়নি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এই ৭১ মামলায় আসামির সংখ্যা ৫০২। এর মধ্যে পলাতক আছেন ৩১৫ জন। গ্রেপ্তার আছেন ১৮৪ জন। এক আসামি আত্মহত্যা করেছেন। ক্ষমা করা হয়েছে একজনকে। গ্রেপ্তার থেকে রায় ঘোষণা পর্যন্ত সাজা ভোগ করেছেন একজন আসামি।

অবশ্য ৫০২ আসামির মধ্যে অনেকেই একাধিক মামলায় আসামি। কারও বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকলে তাঁকে একাধিকবারই আসামি হিসেবে গণনা করা হয়েছে। যেমন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা বিচারাধীন। এর বাইরে একটিতে তাঁর মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। ফলে ৫০২ আসামির মধ্যে শেখ হাসিনাকেই সাতবার গণনা করা হয়েছে। তবে যে ছয় মামলার রায় হয়েছে, সেগুলোতে কোনো আসামিকে একাধিকার গণনা করা হয়নি।

ট্রাইব্যুনালে ৭১ মামলায় ৫০২

বিচারাধীন ২৩টি মামলার মধ্যে ৯টি আওয়ামী লীগ শাসনামলে গুম, হত্যা, নির্যাতনের ঘটনায় করা মামলায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মামলা হলো ২০১৩ সালে রাজধানীর মতিঝিলে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা। এতে ৪১ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৫ জন সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদসহ ২১ জন বিভিন্ন বাহিনীর সাবেক সদস্য, ৩ জন রাজনীতিবিদ ও সংগঠক এবং ২ জন সাংবাদিক রয়েছেন। এ ছাড়া র‍্যাবের টিএফআই সেলের মামলায় সাবেক ও বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ জনকে আসামি এবং ডিজিএফআইয়ের জেআইসির মামলায় সাবেক ও বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৩ আসামির বিচার চলছে। ট্রাইব্যুনাল দুটিতে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৪ মামলার বিচার চলছে। এর মধ্যে একটি মামলায় শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদ পলকের বিচার চলছে।

ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, ৬টি মামলার রায়ের বাইরে ১টি রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। আর ২৩টিতে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করেছে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়। এগুলো এখন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। এ ছাড়া ৪১টি মামলা মিস কেস (বিবিধ মামলা) আকারে তদন্তাধীন। মানে এসব মামলায় ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়নি। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা এসব মামলা হয় তদন্ত করছে কিংবা তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ছয়টি স্পর্শকাতর মামলার রায় হয়েছে। অন্য আদালতে এত অল্প সময়ে এতসংখ্যক রায় হতে দেখা যায় না। এসব রায়ে তাঁরা সন্তুষ্ট।

ছয় মামলার রায়

২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল মূলত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এ অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ পুনর্গঠন করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। এর আগে ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ও পুনর্গঠন করা হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার গতিশীল করতে গত বছরের ৮ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২ গঠন করা হয়। এটির নেতৃত্বে আছেন বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী। এ দুটি ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান, গুম–খুনের পাশাপাশি মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হচ্ছে।

জুলাইয়ের ৬টি মামলার রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে শেখ হাসিনাসহ ১১ জনই পলাতক, কারাগারে আছেন ৪ জন। ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানকে ২টি মামলার (চানখাঁরপুল ও রামপুরা) রায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন মেয়াদে সাজা পাওয়া ৪৬ আসামির মধ্যে ঢাকা রেঞ্জের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) সৈয়দ নুরুল ইসলামসহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ১১ জনকে।

গণ–অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় করা মামলার প্রথম রায় আসে গত বছরের ১৭ নভেম্বর। সেদিন জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল–১। অপর আসামি পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনকে (অ্যাপ্রুভার বা রাজসাক্ষী) পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি আসে দ্বিতীয় রায়। রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ্ আলম মো. আখতারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল–১। মামলার অপর পাঁচ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি তৃতীয় রায় আসে ট্রাইব্যুনাল–২ থেকে। সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলার রায়ে ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় আসামি হলেন সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, আশুলিয়া থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ এফ এম সায়েদ, আশুলিয়া থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল মালেক, সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) বিশ্বজিৎ সাহা, সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদার ও যুবলীগের ক্যাডার রনি ভূঁইয়া। অপর ৯ আসামিকে যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড এবং এক আসামিকে ক্ষমা করা হয়।

গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল–২। গত ৯ এপ্রিল ঘোষিত এ রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুজন হলেন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। এ ছাড়া রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মো. হাসিবুর রশীদসহ ২৮ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।

পঞ্চম রায় আসে গত ২৮ জুন। গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরার বনশ্রী এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ে ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল–১। অন্য পাঁচ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সর্বশেষ ৩০ জুন ঘোষণা করা ষষ্ঠ রায়ে জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

রায়ের অপেক্ষায় ১টি, বিচারাধীন ২৩

গণ-অভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলা ট্রাইব্যুনাল–২–এ ১০ জুন থেকে রায়ের অপেক্ষায় আছে। এ মামলার আসামিরা হলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সদর উদ্দিন খান, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসগর আলী ও কুষ্টিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান। তাঁরা সবাই পলাতক।

দুটি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ২৩টি মামলায় ৩১৬ আসামির বিচার চলছে। এর মধ্যে ৬টি মামলার আসামি শেখ হাসিনা। অন্য আসামিদের মধ্যে আছেন সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদসহ ৩১ জন সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তা। অন্যরা রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, পুলিশের সাবেক সদস্য ও অন্য বাহিনীর সাবেক সদস্য।

বিচারাধীন ২৩টি মামলার মধ্যে ৯টি আওয়ামী লীগ শাসনামলে গুম, হত্যা, নির্যাতনের ঘটনায় করা মামলায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মামলা হলো ২০১৩ সালে রাজধানীর মতিঝিলে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা। এতে ৪১ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৫ জন সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদসহ ২১ জন বিভিন্ন বাহিনীর সাবেক সদস্য, ৩ জন রাজনীতিবিদ ও সংগঠক এবং ২ জন সাংবাদিক রয়েছেন। এ ছাড়া র‍্যাবের টিএফআই সেলের মামলায় সাবেক ও বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ জনকে আসামি এবং ডিজিএফআইয়ের জেআইসির মামলায় সাবেক ও বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৩ আসামির বিচার চলছে।

ট্রাইব্যুনাল দুটিতে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৪ মামলার বিচার চলছে। এর মধ্যে একটি মামলায় শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদ পলকের বিচার চলছে।

সাজা কার্যকরের দাবি

দুটি ট্রাইব্যুনালে তদন্তাধীন ৪১টি মামলার মধ্যে কয়েকটি মামলায় ইতিমধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক এবং ঢাকা বিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন; আরেকটি মামলায় সাবেক এডিসি ইশতিয়াক আহমেদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন; ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকতের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক কমিশনার মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, খুব শিগগির এসব প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আকারে ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হবে।

রাজধানীর চানখাঁরপুলে শহীদ শেখ মাহদি হাসান জুনায়েদের বাবা শেখ জামাল হাসান গতকাল বুধবার রাতে বলেন, এ মামলায় যাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তাঁদের দেওয়া সাজা কার্যকর করা হোক, এটাই চাওয়া। এ ছাড়া অন্য আসামিদের সাজাও বাড়ানো উচিত।

Share