
বিশেষ প্রতিবেদক : ‘আমি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলছি।’ ফোনের ওপাশ থেকে এমন পরিচয় দেওয়ার পর ‘আপনার ছেলে মাদকসহ আমাদের হাতে আটক’-ফোনের ওপাশ থেকে এমন কথা শুনেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন চারঘাট উপজেলার পিরোজপুর-১ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুরাদ আলী। ফোনে জানানো হয়, তার ছেলে মাদক কারবারিদের সঙ্গে আটক হয়েছে। এরপর শোনানো হয় সন্তানের কান্নার মতো কণ্ঠ। পুলিশের ওয়্যারলেস ও গাড়ির সাইরেনের শব্দও। মামলা থেকে ছেলেকে বাঁচাতে দ্রুত ৩০ হাজার টাকা দিতে বলা হয়। বিষয়টি কাউকে জানাতেও নিষেধ করা হয়। এমনকি ফোন না কাটার নির্দেশ দেওয়া হয়। আতঙ্কিত হয়ে বাড়ি থেকে টাকা এনে প্রতারকদের দেওয়া নম্বরে ৩০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন মুরাদ আলী।
শুধু মুরাদ আলী নন, গত এক মাসে জেলার বিভিন্ন থানায় এমন দুই শতাধিক অভিযোগ থানায় জমা পড়েছে। এর মধ্যে শুধু চারঘাট থানায় এলাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও বিত্তশালী অভিভাবকদের কাছে দেড় শতাধিক ফোন করার তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাদের মধ্যে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি প্রতারণার ফাঁদে পড়ে টাকা দিয়েছেন। ভুক্তভোগী একাধিক ব্যক্তি জানান, মোবাইল ফোনের অপর প্রান্ত থেকে পুলিশের বা সেনাবাহিনী কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নাম, পদবি ও ছবি ব্যবহার করে ফোন দেওয়া হয়। এরপর কাউকে বলা হয়, মামলা হয়েছে, কখনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, আবার কখনো তদন্তের কথা বলে আতঙ্ক তৈরি করা হয়। এরপর দ্রুত টাকা পাঠানোর চাপ।
মুরাদ আলী বলেন, ‘আমার ছেলে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। মাদক কারবারিদের সঙ্গে আটক হয়েছে বলার পর ওয়্যারলেস ও পুলিশের গাড়ির সাইরেনের শব্দ শুনে আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাই। তারা বলে, কারও সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করলে ছেলের ক্ষতি হবে। ফোন না কাটতেও বলা হয়। ভয়ে বাড়ি থেকে টাকা এনে তাদের দেওয়া নম্বরে ৩০ হাজার টাকা পাঠাই। পরে বাসায় গিয়ে দেখি ছেলে ঘুমাচ্ছে।’ এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন তিনি। অভিযোগ দেওয়ার ১০ দিন পার হলেও পুলিশ এখনো তার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।
৩ সেপ্টেম্বর একই কৌশলের শিকার হন আশকরপুর এলাকার বাসিন্দা মো. মনিরুজ্জামান। তাকে ফোন করে নিজেকে পুলিশের এসআই পরিচয় দেন এক ব্যক্তি। তার ছেলেকে মাদক কারবারিদের সঙ্গে আটক করা হয়েছে বলে জানানো হয়। ছেলেকে ছাড়িয়ে নিতে ৪০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। মনিরুজ্জামান প্রথমে ২০ হাজার টাকা পাঠান। পরে সাংবাদিকদের দিতে হবে বলে আরও ২০ হাজার টাকা চাওয়া হয়। তখন সন্দেহ হওয়ায় আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, তার ছেলে ক্লাসে আছে। মনিরুজ্জামান বললেন, ‘তখন বুঝতে পারি, এটা প্রতারক চক্র।’ এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ করেছেন তিনি। ৩০ আগস্ট চারঘাটের বড়বড়িয়া এলাকার হাবিবুর রহমানের কাছ থেকে ২৪ হাজার টাকা এবং ২৭ আগস্ট রায়পুর এলাকার আলতাফ হোসেনের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
চারঘাট উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেছেন, ‘আমাকেও ফোন করে একই কায়দায় আমার ছেলের কথা বলে প্রতারণার চেষ্টা করা হয়েছে। শুধু পুলিশ নয়, সেনা কর্মকর্তার পরিচয় দিয়েও ফোন করা হয়। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন শিক্ষকের কাছে এভাবে ফোন করা হচ্ছে। অনেক শিক্ষক সম্মানের কথা ভেবে সরল মনে টাকা দিয়ে দিচ্ছেন। প্রতারকদের ব্যবহৃত নম্বরগুলো সংগ্রহ করে থানায় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।’ চারঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহাবুবুর রহমান জানান, ‘পুলিশ ও ডিবির পরিচয়ে অভিভাবকদের ফোন করে টাকা দাবির বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। প্রতারকচক্রকে শনাক্ত করতে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।’ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নামেও প্রতারণা করা হচ্ছে। নগরীর বোয়ালিয়া থানার রানীনগর পানির ট্যাংকি এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে শরিফুল ইসলাম (২৭) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করে র্যাব-৫। জেলা পুলিশের মুখপাত্র সাবিনা ইয়াসমিন জানান, থানায় হওয়া অভিযোগগুলোর তদন্ত পুলিশ শুরু করেছে। শিগগিরই প্রতারক চক্রটিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হবে বলে দাবি তার।
