
নয়াবার্তা প্রতিবেদক : দেশের বিভিন্ন খাত থেকে কাঙ্ক্ষিত হারে রাজস্ব আদায় না হওয়ায় এবং লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে আছে। রাজস্ব আহরণের এই চিত্র রীতিমতো উদ্বেগজনক। এ অবস্থায় এনবিআর থেকে মাঠ পর্যায়ের কমিশনারেটগুলোকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে জবাব তলব করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে এনবিআরের সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, অভ্যন্তরীণ বাজারের অস্থিরতা এবং কর আদায় প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন জটিলতার কারণে রাজস্ব আহরণ ব্যাহত হচ্ছে। তবে এনবিআর কর্তৃপক্ষ চাইছে এই খাতের অনিয়ম রোধ করতে এবং কর ফাঁকির পথ বন্ধ করতে। তাই মাঠ পর্যায়ের জবাবদিহিতার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চাইছে এনবিআর।
তারা বলেন, এনবিআরের রাজস্ব আদায় বাড়াতে হলে কেবল নোটিশ দিয়ে কাজ হবে না। বরং কর ব্যবস্থার অটোমেশন নিশ্চিত করার পাশাপাশি করদাতার প্রতি হয়রানি বন্ধ করে একটি করদাতা-বান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সচল রাখতে অভ্যন্তরীণ আয় বাড়াতে সম্প্রতি বিভিন্ন সময়ে এনবিআর থেকে ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা পূর্ব ও চট্টগ্রামসহ কাস্টমস, এক্সাইজ এবং ভ্যাট কমিশনারেট বরাবর একাধিক চিঠি দেওয়া হয়।
চিঠিগুলোতে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মুসক অনুবিভাগের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা রাজস্ব আহরণ অনেক কম হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, অধিকাংশ পণ্য ও সেবা খাতে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রবণতা কাজ করছে। বিভিন্ন পণ্য ও সেবা খাতের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি খাতেই আদায়ের হার গত বছরের তুলনায় আশঙ্কাজনক হারে কমেছে।
খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে- সয়াবিন তেল, ইলেকট্রনিক পণ্য, প্লাস্টিক ব্যাগ, সিরামিক পণ্য ও ইটের খাতের বিভিন্ন সামগ্রী, ইলেকট্রিক ফ্যান ও যন্ত্রাংশ, রাবার পণ্য ও স্টিল সামগ্রী। অন্যদিকে সেবা খাতের মধ্যে রয়েছে কনস্ট্রাকশন ফার্ম, জুয়েলারি বা গোল্ড/সিলভারস্মিথ, রেডিমেড গার্মেন্টস, অডিট ও অ্যাকাউন্টিং ফার্ম, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কনসাল্টিং ও সুপারভাইজরি ফার্ম ও ডেকোরেটরস ও ক্যাটারার্স ইত্যাদি।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোনো কোনো খাতের রাজস্ব আদায় গত বছরের তুলনায় প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় রাজস্বের ভূমিকা অপরিহার্য। তাই লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এই ঘাটতি কেন তৈরি হলো, তার সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে চিঠিতে।
এছাড়া আগামী দিনে রাজস্ব আহরণের গতি বাড়াতে কমিশনারেটগুলো কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে কী ধরনের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন তা জরুরি ভিত্তিতে লিখিতভাবে জানাতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অনুরূপ চিঠি আয়কর বিভাগের কর অঞ্চলগুলোতেও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
রাজস্ব আয়ে রেকর্ড ৯৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি : সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ধরনের হোঁচট খায় এনবিআর। সংশোধিত বাজেটে এনবিআরের জন্য পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় করতে পেরেছে চার লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সংস্থাটি পিছিয়ে প্রায় ৯২ হাজার ৬১০ কোটি টাকা।
এনবিআর থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে, প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ের মধ্যে আয়কর খাতে এক লাখ ৮৬ হাজার ১১০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে এক লাখ ৪২ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ৭৬.৭ শতাংশ। ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন করে এক লাখ ৮৬ হাজার ১১০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সংগ্রহ হয়েছে এক লাখ ৫৫ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা বা লক্ষ্যমাত্রার ৮৩.৭ শতাংশ। অন্যদিকে শুল্ক খাতে এক লাখ ৩০ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে এক লাখ ১১ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ৮৫ শতাংশের বেশি।
এর আগে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ৮৮ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য ঘাটতির কথা জানিয়েছিল এনবিআর। অর্থবছর শেষে মোট রাজস্ব আদায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা হবে বলে মনে করেছিল এনবিআর। তবে বাস্তবে আরও বেশি ঘাটতি হলো।
