গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর লাশ উদ্ধার: পুলিশ হেফাজতে প্রথম স্ত্রী ও এমপি

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়ম খাতুনের (১৯) মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল রোববার সন্ধ্যায় তাঁর মরদেহ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে। এ ঘটনায় সংসদ সদস্য ও তাঁর প্রথম স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ ইবনে মিজান রাত ১০টার দিকে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, সন্ধ্যা সাতটার দিকে ন্যাম ভবনের (মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে) ৫ নম্বর ভবনের দোতলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাটে একটি ঝুলন্ত মরদেহের খবর পাওয়া যায়। পরে শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশ, সিআইডি, পিবিআই ও ডিবির দল ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে, ফ্ল্যাটটি সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্যের।

মোহাম্মদ ইবনে মিজান বলেন, সিআইডি ঘটনাস্থলে ক্রাইম সিনের কাজ করেছে। থানা-পুলিশ মরদেহের সুরতহাল করেছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার সময় সংসদ সদস্য ওই ফ্ল্যাটে ছিলেন কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তা তিনি বলতে পারেননি।

গাজী নজরুল ইসলাম জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সম্প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে এক তরুণীর সঙ্গে তাঁকে দেখা যায়। পরে গাজী নজরুল ইসলাম জানান, ওই তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুন।

এরপর গত ২২ জুলাই জামায়াতে ইসলামী গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে। দলটির পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্পিকার, নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে চিঠি দেওয়া হয়।

এদিকে দ্বিতীয় স্ত্রীর মামার করা হত্যাচেষ্টা মামলায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার পর ঢাকার আদালতে জামিননামা দাখিল করেছেন। গতকাল ঢাকার অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদের আদালত তিনি জামিননামা দাখিল করেন।

ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ১০ আগস্ট এ মামলায় হাইকোর্ট থেকে আট সপ্তাহের জামিন পান গাজী নজরুল ইসলাম।

মরিয়মের রেখে যাওয়া চিঠিতে যা লেখা

এমপি গাজী নজরুল ইসলামের বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া হাতে লেখা কয়েকটি চিঠিতে সম্পর্কের টানাপড়েন, ভালোবাসা, বিশ্বাসভঙ্গ ও মানসিক কষ্টের কথা উঠে এসেছে। জাতীয় সংসদের অফিশিয়াল প্যাড, সাদা কাগজ এবং লাল-কালো কালিতে লেখা এসব পাতায় নিজের অবস্থান, আক্ষেপ ও আত্মসম্মান রক্ষার কথাও তুলে ধরেছেন মরিয়ম খাতুন।

এমপি গাজী নজরুলের বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া হাতে লেখা এসব চিঠিতে সম্পর্কের নানা আবেগঘন মুহূর্তের কথা উঠে এসেছে। ভালোবাসার পাশাপাশি সেখানে রয়েছে প্রতারণার অভিযোগ, সম্পর্কের জটিলতা, বিশ্বাসভঙ্গ এবং তীব্র মানসিক কষ্টের কথা। নিজেকে দাবার গুটি মনে হওয়ার কষ্টের পাশাপাশি শেষ পর্যন্ত হার না মানার প্রত্যয়ের কথাও লেখা হয়েছে এসব চিঠিতে।

‘তুমিই তো ছিলে বিপক্ষ দলের সেনাপতি’, ‘আমি হেরেছি—তুমি জিতেছো’ কিংবা ‘ততটা সস্তা আমি নই’—এমন তীব্র বাক্যে ফুটে উঠেছে গভীর মানসিক দ্বন্দ্বের চিত্র।

জাতীয় সংসদের অফিশিয়াল প্যাডে কালো কালিতে লেখা একটি পাতায় আক্ষেপ প্রকাশ করে বলা হয়েছে—

‘আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সাথে, কিন্তু জিততে পারিনি হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবই বা কেমনে যুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে দেখি তুমিই তো ছিলে বিপক্ষ দলের সেনাপতি।’

সাধারণ একটি পাতায় নিজের অবস্থান ও ভালোবাসার টানাপড়েনের কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে লেখা, ‘সে ছিল অন্য নারীর স্বামী। কাগজে-কলমে অধিকার ছিল তার বউয়ের। আর আমি ছিলাম বোকা…!!! অন্য কারো স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ…!!! কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশি সম্মানের কারণ… ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেওয়ার বিষয় নয়… ভালোবাসা হয় সম্পূর্ণ, না হয় অপূর্ণ!”

বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে প্রতারিত হওয়ার অনুভূতিও প্রকাশ করা হয়েছে একটি পাতায়। সেখানে লেখা হয়েছে, ‘সে বলেছিল, আজ থেকে আমরা বন্ধু…চলো একটা গেমস খেলি। আমিও সরল মনে বিশ্বাস করে রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু কে জানত—আমিই ছিলাম তোমার গেমসের দাবার এক গুটি।’

জাতীয় সংসদের প্যাডে লেখা অন্য একটি পাতায় ক্ষোভ ও পরিণতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে—‘আমি হেরেছি…তুমি জিতেছো…কারণ, আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো। আমি, শৃঙ্গের শেষ বাড়িয়ে ও হাসতে হাসতে মুখে হাসি রেখেছি…দেখে নাও এই হাসির কারণই হবে তোমার ধ্বংসের কারণ।’

লাল কালিতে লেখা সংক্ষিপ্ত একটি বার্তায় নিজের আত্মসম্মানের কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে লেখা—‘শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই… তা না হলে যতটা সস্তা ভাবছো ততটা সস্তা আমি নই…!’

তারিখসংবলিত ধর্মীয় আমলের পাতা

চিঠিগুলোর সঙ্গে ‘১২-০৭-২০২৬’ তারিখসংবলিত একটি পাতাও পাওয়া গেছে। ওই পাতায় ঘুমানোর আগে করণীয় কয়েকটি ধর্মীয় আমলের তালিকা লেখা রয়েছে।

পাতাটিতে লেখা—‘১২-০৭-২০২৬ ঘুমানোর আগে ৬টি আমল : কালেমা পড়ে, দুরুদ শরিফ, ঘুমের দোয়া, আয়াতুল কুরসি, বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম ২১ বার, আস্তাগফিরুল্লাহ ৩ বার, আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমুতু ওয়া এহিয়া, দুরুদ শরিফ ১১ বার, ইয়া আরহামার রাহিমিন ১১ বার।’

উদ্ধার হওয়া এসব হাতে লেখা পাতায় সম্পর্ক, ভালোবাসা, বিশ্বাসভঙ্গ, আক্ষেপ এবং আত্মসম্মান রক্ষার নানা অনুভূতির প্রকাশ দেখা যায়। একই সঙ্গে একটি লেখায় ভবিষ্যৎ পরিণতি নিয়ে কঠোর সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে।

Share