ঘোড়াঘাটের হামলা উদ্বেগ বাড়িয়েছে মাঠ প্রশাসনে

নিজস্ব বার্তা প্রতিবেদক : জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতপার্থক্যের কারণে ঝুলে আছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) নিরাপত্তা বিধানের উদ্যোগ। ২০১৮ সালে জেলা প্রশাসক সম্মেলনের মুক্ত আলোচনায় ডিসিরা ইউএনওদের নিরাপত্তার বিষয়ে দাবি তুলে ধরেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তাদের ব্যক্তিগত ও বাসভবনের জন্য পৃথক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন। দুই বছর কেটে গেলেও মেলেনি সেই নিরাপত্তা। এরই মধ্যে গত বুধবার গভীর রাতে ঘটে গেছে এক মর্মান্তিক ঘটনা। দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানম। এ ঘটনা পুরো প্রশাসনকে নাড়া দিয়েছে। দুই মন্ত্রণালয়েরও টনক নড়েছে। ইউএনওদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গতকালই শুরু হয়েছে ফাইল চালাচালি। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন অবশ্য গতকাল তাৎক্ষণিকভাবে ইউএনওদের সরকারি বাসভবনের নিরাপত্তায় আগামী সপ্তাহের মধ্যে আনসার সদস্য নিয়োগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। ওয়াহিদা খানমকে হাসপাতালে দেখে এসে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, দুই মন্ত্রণালয়ের মতপার্থক্যের কারণে দুই বছরেও ইউএনওদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি। কারণ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় চাইছে, ইউএনওদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য একজন পুলিশ গানম্যান এবং বাসভবনের নিরাপত্তায় পুলিশ হাউস গার্ড। আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে একজন প্লাটুন কমান্ডারসহ ১০ জনের আনসার সদস্য দেওয়ার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বলছে, আনসার দিয়ে ইউএনওদের যথাযথ নিরাপত্তা সম্ভব নয় এবং প্রস্তাবটি ব্যয়বহুল। এর সঙ্গে একমত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগও। মন্ত্রিপরিষদ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিবের কাছে পাঠানো চিঠিতে পুলিশের মাধ্যমে ইউএনওদের ব্যক্তিগত ও বাসভবনের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে। এ চিঠির পরও প্রায় এক বছর কেটে গেছে। কিন্তু নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সমকালকে বলেন, ইউএনওদের নিরাপত্তার জন্য শিগগির আনসার বাহিনী নিয়োগ করা হবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন বলেন, আশা করছি এ মাসের মধ্যে ইউএনওদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা যাবে। তাদের ব্যক্তিগত ও বাসভবনের নিরাপত্তার জন্য আনসার সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হবে। তবে প্রতি উপজেলায় কতজন আনসার সদস্য নিয়োগ দেওয়া হবে, এ বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি।

কয়েকজন ইউএনও সমকালকে বলেন, এর আগেও নানা সময়ে বিভিন্ন উপজেলায় একাধিক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনকালে আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু এবার সরকারি বাসায় ঢুকে পরিকল্পনা করে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করা হয়েছে, যা নজিরবিহীন। বর্তমানে শতাধিক উপজেলায় নারী কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন জানিয়ে ইউএনওরা জানান, ঘোড়াঘাটের ঘটনায় মাঠ প্রশাসনে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। নারী কর্মকর্তারা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

জানা যায়, ২০১৮ সালের জুলাই মাসে জেলা প্রশাসক সম্মেলনে কিশোরগঞ্জের ডিসির পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রতি উপজেলায় এক প্লাটুন আনসার নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়। এ প্রস্তাবের ধারাবাহিকতায় সম্মেলনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানের মুক্ত আলোচনায় বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে ইউএনওদের সার্বক্ষণিক শারীরিক ও বাসভবনের নিরাপত্তা প্রদানে জননিরাপত্তা বিভাগকে উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে গত ফেব্রুয়ারিতে জননিরাপত্তা বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে সাবেক এসডিওরা যে মর্যাদায় ব্যক্তিগত ও বাসভবনের নিরাপত্তা পেতেন, ইউএনওদেরও একইভাবে নিরাপত্তা দিতে বলা হয়েছে। এক চিঠিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বলেছে, মাঠ প্রশাসনে ইউএনওরা প্রায় নিরাপত্তাহীন অবস্থায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। এর বাইরেও তারা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ইউএনওদের পূর্বসূরি মহকুমা প্রশাসকদের গানম্যান ও বাসার জন্য হাউস গার্ডের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু এসডিও পদটি বিলুপ্তির পর এ সুবিধা ইউএনওদের জন্য কার্যকর করা হয়নি।

জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে প্রতিটি উপজেলায় একজন পিসি/এপিসি (প্লাটুন কমান্ডার) এবং ৯ জন আনসার নির্ধারণ করে তাদের জন্য ১০০ কোটি ৬০ লাখ ৭১ হাজার ৪৩৮ টাকার একটি সম্ভাব্য ব্যয় অনুমোদনের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। জবাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, প্রস্তাবটি অনেক ব্যয়বহুল। আনসার নিয়োগের মাধ্যমে ইউএনওদের শারীরিক ও বাসভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। তাদের পুলিশ হাউস গার্ড দেওয়া প্রয়োজন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, পুলিশ নিয়োগের প্রস্তাবটিও ব্যয়বহুল। কারণ, প্রতিটি উপজেলায় কমপক্ষে একজন পুলিশ গানম্যান ও তিনজন পুলিশ হাউস গার্ড নিয়োগ দিতে হবে। আনসার সদস্যদের চেয়ে পুলিশের বেতন বেশি। এ ছাড়া পুলিশ নিয়োগ করলে দুই মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দের মধ্যেও জটিলতা তৈরি হবে। এমন মতপার্থক্যের মধ্যে ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে পুলিশের মাধ্যমেই ইউএনওদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে জোর দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ৩০ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়। এরপরও প্রায় এক বছর কেটে গেছে।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ইউএনওদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পুলিশ অথবা আনসার- যে কোনো বাহিনী দিয়েই করা যেতে পারে। তিনি বলেন, আমরা যখন মাঠ প্রশাসনে কাজ করেছি, তখন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ছিল না। এখন সারাবিশ্বে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়েছে। ইউএনওরা মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা হিসেবে নানা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন।

Share