
নয়াবার্তা প্রতিবেদক : দেশের ৬৪ জেলার দায়িত্ব আবারও মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের হুইপদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছে সরকার। সরকারের ভাষ্য—আইনশৃঙ্খলা, অপরাধ ও মাদকনিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি প্রতিরোধ, সুশাসন, স্বচ্ছতা-জবাবদিহি এবং সরকারি উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড তদারক ও সমন্বয় করবেন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা। তবে অতীতে প্রায় একই ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা খর্ব এবং প্রশাসনের ওপর দ্বৈত কর্তৃত্ব তৈরির অভিযোগ উঠেছিল।
এবার দায়িত্বের ভাষা কিছুটা আলাদা। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সরাসরি নির্বাহী ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো এবং অন্যান্য সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থার আইনি ক্ষমতা খর্ব না করে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, শুধুই তদারকি বা সমন্বয়; নাকি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কিংবা ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন? যে জেলায় ক্ষমতাসীন দলের কোনো সংসদ সদস্য নেই, সেখানে বিরোধী দলের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কই-বা কেমন হবে? আবার স্থানীয় প্রশাসন দায়িত্ব পালনে কোনো বাধার মুখে পড়বে কি না, সেই প্রশ্নও রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ দেশের ৬৪ জেলার দায়িত্ব ৩০ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের হুইপের (তিনজন) মধ্যে ভাগ করে দিয়েছে। কাউকে একটি, কাউকে দুই থেকে তিনটি জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে বিভিন্ন জেলায় উন্নয়নের বরাদ্দ কাগজে-কলমে থাকলেও ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট হয়েছে। লুট করা অর্থের একাংশ বিদেশে পাচার হয়েছে এবং অন্য অংশ মাদকসহ সামাজিক অবক্ষয়, জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। এ অবস্থায় জেলা পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে সমন্বয় ও তদারকির এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
আইনি ও রাজনৈতিক প্রশ্ন
জেলার দায়িত্ববিষয়ক প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, সংবিধানের ৫৫(২) অনুচ্ছেদ এবং কার্যপ্রণালি বিধিমালার সংশ্লিষ্ট বিধান অনুসারে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংবিধানের ৫৫(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা, এই সংবিধানের দ্বারা বা অধীন প্রদত্ত ক্ষমতাবলে, প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বা তাঁহার কর্তৃত্বে প্রযুক্ত হইবে।’ অর্থাৎ রাষ্ট্রের নির্বাহী বা প্রশাসনিক ক্ষমতার মূল রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাতে। তাঁর কর্তৃত্বের অধীন মন্ত্রী, মন্ত্রণালয় ও সরকারি কর্তৃপক্ষ এসব ক্ষমতা প্রয়োগ করে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সংশ্লিষ্ট জেলার সরকারি দপ্তরগুলোকে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখা, মাদকের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার নিয়ন্ত্রণ, চোরাচালান প্রতিরোধ এবং গুরুতর অপরাধ দমনে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবেন। তাঁরা সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম তদারক করবেন। প্রয়োজন হলে জেলার বিভিন্ন সভায় অংশ নিয়ে পরামর্শও দিতে পারবেন। প্রশ্ন হলো একটি জেলার দায়িত্ব পেয়ে একজন মন্ত্রী কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন এবং তাঁরা তদারকির সীমা কতটা মেনে চলবেন?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, আইনি ও রাজনৈতিক প্রশ্নের বাইরেও কিছু বিষয় রয়েছে। যেমন বর্তমানে সরকারের অনেক মন্ত্রণালয় সংকটকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। এসব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা জেলার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মন্ত্রণালয়ের কাজে ব্যাঘাতও ঘটতে পারে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। এটি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জিম্মি করার ব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারে। উন্নয়ন তদারকির নামে অন্যের অধিকার খর্ব করার সুযোগ তৈরি হবে। শুধু বিরোধী দল নয়, ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গেও সমস্যা হতে পারে।
আগের অভিজ্ঞতা কী
মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও হুইপদের নির্দিষ্ট জেলার দায়িত্ব দেওয়ার তথ্য অতীতেও পাওয়া যায়। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার একবার এ ব্যবস্থা চালু করে। পরে ২০০১ সালে বিএনপি সরকারও একই ধরনের দায়িত্ব দেয়। তবে ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের জামায়াতে ইসলামীর দুজন মন্ত্রীকে কোনো জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। ৬৪ জেলার দায়িত্বে ছিলেন বিএনপির মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা। সে সময় বেশির ভাগ মন্ত্রীই নিজেদের জেলার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমান সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। তাঁর বাড়ি মৌলভীবাজারে এবং তিনি সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া পেয়েছিলেন নিজের জেলা নরসিংদীর দায়িত্ব। যেসব জেলায় একাধিক মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী ছিলেন, তাঁদের কাউকে কাউকে অন্য জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এবার মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিজেদের জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। কাছাকাছি অন্য এক বা একাধিক জেলার দায়িত্ব পেয়েছেন কেউ কেউ।
২০০৩ সালে জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান ও পিরোজপুরের সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এ ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন। ২০০৬ সালে হাইকোর্ট ওই ব্যবস্থা অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। মামলার শুনানিতে একজন মন্ত্রীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের কর্তৃত্বের সংঘাতের আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছিল। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে স্থানীয় প্রশাসন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না এবং সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখার সুযোগ কমে যাচ্ছে—এমন যুক্তিও দেওয়া হয়েছিল।
শুধু মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের জেলার দায়িত্ব দেওয়া নয়, অতীতে সচিবদেরও জেলার বিভিন্ন দায়িত্ব দিতে দেখা গেছে। ২০২১ সালের এপ্রিলে করোনা প্রতিরোধ ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য সরকারের সিনিয়র সচিব, সচিব ও সচিব পদমর্যাদার ৬৪ কর্মকর্তাকে একটি করে জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল জাতীয় পার্টির কয়েকজন সংসদ সদস্য সংসদে এর বিরোধিতা করেন। তাই অতীতে যে ব্যবস্থাকে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ক্ষমতা খর্ব এবং প্রশাসনের ওপর দ্বৈত কর্তৃত্ব তৈরির ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়েছিল, এবার সেই ঝুঁকি কীভাবে এড়ানো হবে—সেটিই প্রশ্ন। যেসব জেলায় এক বা একাধিক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য রয়েছেন, সেখানে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর সঙ্গে তাঁদের ক্ষমতার সীমারেখা কী হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম মাদারীপুর ও শরীয়তপুর জেলার দায়িত্ব পেয়েছেন। স্থানীয় লোকজনদের সঙ্গে বিভেদ হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সবাই যাঁর যাঁর দায়িত্ব পালন করবেন। এখানে কেউ কারও ওপর কর্তৃত্ব করবেন না। শুধু তদারকি ও সমন্বয়ের কাজটি তাঁরা করবেন। ইতিমধ্যে তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, সব দলের সংসদ সদস্য ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়েই কাজটি করা হবে।
বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের জেলায় কী হবে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, গাইবান্ধা, রংপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা ও চুয়াডাঙ্গা—এই আট জেলায় কোনো আসনই পায়নি বিএনপি। এসব জেলায় মোট আসন ৩০টি। এর মধ্যে ছয় জেলায় জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা সব আসনে জয়ী হয়েছেন। কুড়িগ্রাম ও রংপুরে জামায়াতের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একজন করে সংসদ সদস্য রয়েছেন। এই দুই জেলার বাকি আসনগুলোতে সংসদ সদস্য জামায়াতের।
সংসদে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলগুলো নানা ইস্যুতে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধী দলগুলো লংমার্চসহ মাঠের কর্মসূচিতেও যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে জামায়াত ও বিরোধী দল-অধ্যুষিত জেলাগুলোতে বিএনপির মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও হুইপদের দায়িত্ব দেওয়ার ফলে নতুন করে কোনো দ্বন্দ্ব তৈরি হয় কি না, সেই প্রশ্নও রয়েছে।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ায় জামায়াতের সংসদ সদস্য আমির হামজা ও বিএনপির শরিক গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় মামলা ও পাল্টা মামলা হয়েছে। মেহেরপুর, কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ জেলার দায়িত্ব পেয়েছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এর মধ্যে মেহেরপুরে দুটি আসনেরই সংসদ সদস্য জামায়াতের।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেনকে লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও নীলফামারীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। চুয়াডাঙ্গার দায়িত্ব পেয়েছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। নীলফামারী ও চুয়াডাঙ্গার সব সংসদ সদস্য জামায়াতের। তাঁরা বিএনপির দুই মন্ত্রীকে কীভাবে নেন, সেটিও দেখার বিষয়।
সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের দায়িত্ব পেয়েছেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী পেয়েছেন বগুড়া ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের দায়িত্ব। রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের দায়িত্বে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। এসব জেলায় জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার সাংবিধানিক বিষয়েও লেখালেখি করেন। তিনি সরকারের উদ্যোগের বিষয়ে বলেন, যে নামেই দেওয়া হোক না কেন, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলার হর্তাকর্তা বনে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। যেখানে তাঁর চেয়ে শক্তিশালী মন্ত্রী-সংসদ সদস্য আছেন, সেখানে দ্বন্দ্বে জড়াবেন। এর কোনো দরকারই ছিল না। অতীতেও এর সুফল পাওয়া যায়নি। আইনি ভিত্তিও নেই; বরং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা দরকার। এটা না করে সরকার স্থানীয় সরকারে প্রশাসক বসিয়ে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
