উইকেয়ার প্রকল্পে ঋণের ৪১২৪ কোটি টাকা ফেরত নিচ্ছে বিশ্বব্যাংক

নয়াবার্তা প্রতিবেদক : পদ্মা সেতু প্রকল্প ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগের পর প্রায় এক দশক বাংলাদেশের সড়ক খাত থেকে দূরে ছিল বিশ্বব্যাংক। এরপর সড়ক খাতে ফিরে এসে ২০২০ সালে পশ্চিমাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নে ‘ওয়েস্টার্ন ইকোনমিক করিডর অ্যান্ড রিজিয়নাল এনহান্সমেন্ট প্রোগ্রাম’ বা উইকেয়ার প্রকল্পে ৫০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেয় সংস্থাটি। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি ও নানা সমস্যার কারণে সেই ঋণের ৬৭ শতাংশই এখন বাতিল করেছে বিশ্বব্যাংক। বাতিল হওয়া ঋণের পরিমাণ ৩৩৫.৩৩ মিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় চার হাজার ১২৪ কোটি টাকা। ফলে প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ঋণ হিসেবে এখন ব্যবহার করা যাবে মাত্র ১৬৪.৬৭ মিলিয়ন ডলার।

বিশ্বব্যাংকের নথি অনুযায়ী, দুই দফায় এই অর্থ বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের মে মাসে ৫০ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২৬ সালের মে মাসে ২৮৫.৩৩ মিলিয়ন ডলার বাতিল করা হয়। ২০২০ সালের জুনে ৭৫৮.২০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ঋণ ছিল ৫০০ মিলিয়ন ডলার। বাকি ২৫৮.২০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার কথা ছিল সরকারের।

প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল দেশের পশ্চিমাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ উন্নত করা এবং পণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করা। প্রকল্পের আওতায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের জন্য বিশ্বব্যাংকের ৩১৪.২০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ ছিল। কিন্তু এই অংশ থেকে ২৬৬.৩৩ মিলিয়ন ডলার বাতিল হয়েছে। অর্থাৎ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের জন্য বরাদ্দের প্রায় ৮৫ শতাংশ অর্থই আর ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের জন্য বরাদ্দ ছিল ১৭১ মিলিয়ন ডলার। এই অংশ থেকে ৬৯ মিলিয়ন ডলার বাতিল হয়েছে। এই অংশের প্রায় ৪০ শতাংশ অর্থও অব্যবহৃত থাকছে।

প্রকল্পের বড় কাজের মধ্যে ছিল যশোর-ঝিনাইদহ জাতীয় মহাসড়কের ৪৮ কিলোমিটার অংশ উন্নয়ন। ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেন তৈরির পরিকল্পনাও ছিল। পাশাপাশি ৬১১ কিলোমিটার গ্রামীণ সংযোগ সড়ক উন্নয়ন, ৩২টি বাজার ও পণ্য পরিবহনকেন্দ্র তৈরি এবং অপটিক্যাল ফাইবার ও আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থার অবকাঠামো তৈরির কথা ছিল। কিন্তু প্রকল্পের কাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়নি। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি শুরু করার আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি যথেষ্ট ছিল না। নকশা ছিল জটিল। জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনেও দীর্ঘ সময় লেগেছে। এর পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতার ঘাটতি ছিল।

সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয় জাতীয় মহাসড়কের অংশে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নতুন করে করা এবং পুনর্বাসন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতেই প্রায় দুই বছর চলে যায়। এরপর জমি অধিগ্রহণ এবং ঠিকাদারদের কাজের জায়গা বুঝিয়ে দিতে দেরি হয়। ফলে নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শুরু করা যায়নি। এ ছাড়া মহাসড়কের দুটি নির্মাণ প্যাকেজের ঠিকাদাররা সময়মতো প্রয়োজনীয় শ্রমিক ও যন্ত্রপাতি মাঠে নামাতে পারেননি। অর্থের সংকটে তাঁদের কাজের গতি কমে যায়। এক পর্যায়ে ২০২৫ সালের অক্টোবরে ঠিকাদারদের কাজের সমস্যা সংশোধনের জন্য আনুষ্ঠানিক নোটিশ দিতে হয়।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ওই দুটি প্যাকেজের কাজ করছিল আবদুল মোনেম লিমিটেডের নেতৃত্বাধীন দুটি যৌথ উদ্যোগ। অর্থাৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও অর্থসংকটও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব বলছে, ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত জাতীয় মহাসড়কের কোনো অংশের কাজ শেষ হয়নি। ফলে যানবাহন চলাচলের খরচ ও যাতায়াতের সময় কমেনি। পরিকল্পিত ৪৮ কিলোমিটার অপটিক্যাল ফাইবার বসানোর কাজও শুরু করা যায়নি।

গ্রামীণ সড়কের ক্ষেত্রেও পরিকল্পনা কমিয়ে আনা হয়েছে। আগে যেখানে ৬১১ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের কথা ছিল, এখন সেখানে প্রায় ৩৮৭ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক প্রকল্পটির সামগ্রিক বাস্তবায়ন এবং নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের অগ্রগতিকে ‘মধ্যম মাত্রায় অসন্তোষজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রকল্পের পরিবেশ ও সামাজিক ব্যবস্থাপনাও একইভাবে অসন্তোষজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এখনো অনেক ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও অভিযোগ নিষ্পত্তির কাজ বাকি রয়েছে। এদিকে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদনও সফল হয়নি। সম্প্রতি সরকার প্রকল্পটি ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোর জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছে আবেদন করেছিল। কিন্তু বিশ্বব্যাংক মেয়াদ বাড়াতে রাজি হয়নি। ফলে প্রকল্পের শেষ সময় ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরই রাখা হয়েছে।

এ অবস্থায় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে দ্রুত বাকি কাজ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে চলতি বছরের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ করে বন্ধ করার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। যেসব কাজ শেষ হবে না, সেগুলো কিভাবে শেষ করা হবে, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের বাকি কাজ কিভাবে হবে এবং শ্রমিক ও স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা কিভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব বিষয় নিয়ে আলাদা পরিকল্পনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রধান কবির আহমেদ বলেন, প্রকল্পের কাজ ধীরগতিতে এগোনোর কারণে বিশ্বব্যাংক অর্থ বাতিল করেছে। প্রকল্প শুরুর আগে যথেষ্ট প্রস্তুতি না থাকা, ক্রয়প্রক্রিয়ায় জটিলতা, জমি অধিগ্রহণে দেরি এবং ঠিকাদারদের আর্থিক সমস্যার কারণে প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে যায়। ঠিকাদাররা অর্থের সমস্যার কারণে পর্যাপ্ত শ্রমিক ও যন্ত্রপাতি সময়মতো কাজে লাগাতে পারেননি। এর ফলে নির্মাণকাজের গতি আরো কমে যায়।

২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালনে পরিবর্তন আসায় প্রকল্পের ব্যবস্থাপনাতেও কিছুটা অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল বলে জানান কবির আহমেদ।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, বিশ্বব্যাংক বর্তমানে বিভিন্ন দেশে ধীরগতির প্রকল্পগুলোর অব্যবহৃত অর্থ ফিরিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশ থেকেও কয়েকটি ধীরগতির প্রকল্পের অর্থ বাতিল করা হয়েছে। তবে বাতিল হওয়া উইকেয়ার প্রকল্পের অর্থ অন্য কোনো খাতে ব্যবহারের অনুমতি এখনো পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের আরো আটটি ধীরগতির প্রকল্প থেকে বাতিল হওয়া অর্থ জ্বালানিসংকট মোকাবেলায় অন্য খাতে ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। উইকেয়ার প্রকল্পের বাতিল হওয়া অর্থও অন্য কাজে ব্যবহারের বিষয়ে পরবর্তী অর্ধবার্ষিক বৈঠকে সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেম বলেন, ২০২০ সালে উইকেয়ার প্রকল্পের জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ অনুমোদন করা হলেও ছয় বছরে ছাড় হয়েছে প্রায় ১১৬ মিলিয়ন ডলার। কভিড-১৯সহ বিভিন্ন কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ বিলম্ব হয়। সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় প্রকল্পের বিলম্বের কারণ, ঠিকাদারদের কাজ এবং পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হয়েছে। বাস্তবায়নযোগ্য কাজগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংক যৌথভাবে প্রকল্প পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে ৩৩৫.৩৩ মিলিয়ন ডলার বাতিল করা হয়েছে। তবে সরকার চাইলে এই টাকা অন্য নতুন প্রকল্পে, এমনকি সড়ক খাতেও ব্যবহার করা যাবে।

Share