
গাজী আবু বকর : জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করে সুপারিশ দেওয়ার জন্য বিরোধী দলের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২০তম দিনে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে এ তথ্য জানান।
অপরদিকে দেশের কৃষি খাতে সেচ ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখতে এবং শহর ও গ্রামের বৈষম্য দূর করতে রাজধানী ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গ্রামের কৃষক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং তারা যেন পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পায়, সেটি নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
আজ বিকেলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী সরকারি দলের পক্ষ থেকে কমিটির পাঁচ সদস্যের নামও প্রস্তাব করেন। সেই সঙ্গে তিনি বিরোধী দল থেকে পাঁচজন সদস্যের নাম দেওয়ার আহ্বান জানান। পরে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সংসদে জানান, তাঁরা শিগগির পাঁচজনের নাম দেবেন।
গত বুধবার জাতীয় সংসদে ‘দেশের বর্তমান জ্বালানিসংকট নিরসনে এবং জনদুর্ভোগ লাঘবে অবিলম্বে সরকারের কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ’ বিষয়ে একটি নোটিশ এনেছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা। সেটা নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়। আলোচনায় বিরোধীদলীয় নেতা জ্বালানিসংকট নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে একটি ‘কমন কমিটি’ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে জানিয়েছিলেন, জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধী দলের প্রস্তাব বিবেচনায় নেবে সরকার। তাদের প্রস্তাবে বাস্তবতার নিরিখে কিছু থাকলে সেটা বাস্তবায়ন করা হবে।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে সংসদে ফ্লোর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, গত বুধবারের আলোচনায় সবাই একমত হন যে জ্বালানি নিয়ে সমস্যা একটি বৈশ্বিক সমস্যা। বিরোধীদলীয় নেতা প্রস্তাব করেছিলেন, তাঁদের কিছু পরামর্শ আছে। সরকারি দল ও বিরোধী দল একসঙ্গে বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে পারে। বিএনপি সব সময় মানুষের স্বার্থে যেকোনো আলোচনা, যে কারও সঙ্গে করতে প্রস্তুত—উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘তারই প্রেক্ষাপটে মাননীয় স্পিকার, আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি যে, আমরা আমাদের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করছি। আমি আপনার (স্পিকার) মাধ্যমে বিরোধীদলীয় নেতা এবং বিরোধী দলকে অনুরোধ করব, উনারাও যদি পাঁচজনের নাম দেন তাহলে এই ১০ জন ব্যক্তি বসে এই বিষয়গুলো আলোচনা করতে পারেন। কোনো পরামর্শ থাকলে এই কমিটির মাধ্যমে সেটি সরকারের কাছেও এল এবং সরকার সেটার মধ্যে কোনো বাস্তবতা থাকলে অবশ্যই সেটি কার্যকর করার উদ্যোগ গ্রহণ করবে।’ এ সময় সংসদ নেতা বিএনপির পক্ষ থেকে কমিটির পাঁচজন সদস্যের নাম প্রস্তাব করেন। তাঁরা হলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, সংসদ সদস্য এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান (লক্ষ্মীপুর–৪), মইনুল ইসলাম খান (মানিকগঞ্জ–২) ও মিয়া নুরুদ্দিন অপু (শরীয়তপুর–৩)। বিরোধী দলকে পাঁচজনের নাম দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দ্রুত নাম দেওয়া হলে কমিটি দ্রুত কাজ শুরু করতে পারবে।
পরে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তাঁরা আশা করেন এই সংসদ জাতীয় সব সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু হবে। তাঁরা মনে করেন, এটি এ সংসদের একটি নবযাত্রা। তাঁরা এটাকে সাধুবাদ জানান ও শিগগির নাম দেবেন।
এরপর সংসদ নেতার উদ্দেশে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, কমিটির একজন সভাপতি প্রয়োজন। তখন সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, স্বাভাবিকভাবেই যাতে গৃহীত সুপারিশগুলো বাস্তবতার আলো দেখতে পারে, সে জন্য তাঁর প্রস্তাব জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে এ কমিটির সভাপতি করা হোক। পরে স্পিকার বলেন, ‘আশা করি, অতি অল্প সময়ের মধ্যে বিরোধী দলের নেতা পাঁচজন সদস্যের নাম দেবেন। কারণ, এই সংসদ (চলতি অধিবেশন) এই মাসের শেষেই শেষ হবে। আপনাদের এই বক্তব্যের ফলে জনগণের মনে অনেক আশা সঞ্চার হয়েছে। সরকার ও বিরোধী দল এভাবে যদি সহযোগিতার মাধ্যমে অগ্রসর হয়, তবে যেকোনো সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।’
ঢাকায়ও লোডশেডিং করা হবে: জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে দেয়া বিবৃতি ঢাকায়ও লোডশেডিং করা হবে বলে জানিয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী জানান, জনগণের আস্থা কমে যাওয়ার কারণে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য এলে সেখানে বিশ্বাস অর্জন করতে দেশবাসীর কিছুটা সময় লাগবে। তবে বর্তমান সরকার তাদের শপথের মর্যাদা এবং পবিত্র সংসদের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। বর্তমানে এই বিদ্যুৎ সমস্যা একদিনের নয়, বরং এটি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের পুঞ্জীভূত অব্যবস্থাপনার ফল। বর্তমানে কাগজে-কলমে উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেশি থাকলেও বাস্তবতার সঙ্গে সেটির গরমিল রয়েছে। তিনি জানান, গতকাল দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াট, যার বিপরীতে উৎপাদন সম্ভব হয়েছে ১৪ হাজার ১২৬ দশমিক ৩৫ মেগাওয়াট। ফলে দেশজুড়ে ২ হাজার ৮৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে বাধ্য হয়েছে সরকার। প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে ফসল কাটার মৌসুম চলায় কৃষকদের সেচ কাজের সুবিধার্থে প্রধানমন্ত্রী নিরবচ্ছিন্ন ডিজেল ও বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্দেশনা দিয়েছেন। সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং জুলাই অভ্যুত্থানের বৈষম্যহীন বাংলাদেশের চেতনা সমুন্নত রাখতে রাজধানী ঢাকাতে প্রাথমিকভাবে পরীক্ষামূলকভাবে ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, দেশে প্রতিদিন ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে নিজস্ব উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ করা যাচ্ছে ২ হাজার ৬৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন ১ হাজার ১৬৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকছে। পর্যাপ্ত অর্থ থাকলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বা ইনফ্রাস্ট্রাকচার না থাকায় দ্রুত গ্যাস আমদানি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার তালিকায় এই অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ দৃশ্যমান হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন। তিনি আরও জানান, একটি আমদানি করা পাওয়ার প্লান্ট এবং একটি কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য বর্তমানে বন্ধ থাকায় সরবরাহ কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে এগুলো পূর্ণ উৎপাদনে ফিরলে আগামী সাত দিনের মধ্যে লোডশেডিং পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে। জনগণের এই সাময়িক কষ্টের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী।
