
গাজী আবু বকর : প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী যাবেন কি না সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয়, পর্যবেক্ষক হিসেবে আমন্ত্রণ পেয়েছে। তবে ব্রিকসের সদস্য হওয়ার বিষয়টিও বাংলাদেশের বিবেচনায় রয়েছে। আজ তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে পৃথক দুটি প্রশ্নের উত্তরে তিনি একথা বলেন। ব্রিফিংয়ে তথ্য অধিদফতরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ড. মো. আলম মোস্তফা উপস্থিত ছিলেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে আন্দোলনকারীদের দমনে ৭.৬২ মিলিমিটার বুলেট ব্যবহার করা হয়েছিল এবং এ ঘটনার তদন্ত বিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা বলেন, “৭.৬২ বুলেট নিয়ে ‘স্নাইপার’ তত্ত্ব ছড়ানোর সুযোগ নেই। তিনি বলেন, আওয়ামীপন্থি অ্যাক্টিভিস্টরা স্নাইপার ব্যবহারের যে আলোচনা ছড়িয়েছে, সে বিষয়টি বিভ্রান্তিকর। এ অস্ত্র পুলিশ-বিজিবি ব্যবহার করে। এ ধরনের গুলি কোনো রহস্যময় বা বিশেষ অস্ত্রের নয়, দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ পুলিশের ব্যবহৃত চীনা টাইপ-৫৬ রাইফেলে এই ক্যালিবারের গুলি ব্যবহার করা হয়। আমি অবাক হয়েছি, কেউ কেউ এমনভাবে বলছেন যেন ৭.৬২ মিলিমিটার বুলেট মানেই স্নাইপার রাইফেলের গুলি। বিষয়টি মোটেও তা নয়। পুলিশের হাতে বহু বছর ধরেই টাইপ-৫৬ রাইফেল রয়েছে, যা ৭.৬২ মিলিমিটার গুলি ব্যবহার করে।”
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা বলেন, টাইপ-৫৬ একটি সামরিক মানের রাইফেল, যা আগে সেনাবাহিনীর কাছে ছিল। পরে এটি সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং সর্বশেষ পুলিশের কাছে আসে। এ অস্ত্রের কার্যকর পাল্লা প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ মিটার পর্যন্ত হওয়ায় সাধারণ পুলিশের হাতে এমন অস্ত্র থাকা নিয়ে অতীতেও প্রশ্ন উঠেছিল।
উপদেষ্টা বলেন, জুলাই আন্দোলনের পর (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে যে, সরকারবিরোধী আন্দোলনকারীরা স্নাইপার ব্যবহার করে মানুষ হত্যা করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পুলিশের কাছেই ৭.৬২ মিলিমিটার গুলি ব্যবহারকারী রাইফেল ছিল। বিজিবির কাছেও একই ধরনের অস্ত্র ছিল। অভ্যুত্থানকালে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ছবি ও ভিডিওও রয়েছে। তাই কোথাও থেকে অজ্ঞাত কোনো স্নাইপার এসে গুলি করেছে, এ ধরনের প্রচারণার বাস্তব ভিত্তি নেই। তদন্তে এসব ঘটনার প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে।
উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের বলেন, পুলিশের কাছে প্রাণঘাতী অস্ত্র থাকার বিষয়টি নতুন কিছু নয়। তবে জননিয়ন্ত্রণে সাধারণত স্বল্প-পাল্লার অস্ত্র ব্যবহারের প্রচলন থাকলেও ৭.৬২ মিলিমিটার রাইফেলের মতো দীর্ঘ-পাল্লার অস্ত্র ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জুলাই আন্দোলনের ঘটনাগুলোর তদন্তে কারা কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করেছে, তা আইনগত প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে। তবে ৭.৬২ মিলিমিটার বুলেটকে কেন্দ্র করে স্নাইপার তত্ত্ব ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরির সুযোগ নেই।
সম্প্রতি কয়েকজন জেলা প্রশাসককে অবসরে পাঠানো এবং বিগত সময়ের নির্বাচনগুলোর গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকার কখনো বলেনি যে ‘রাতের ভোটের ডিসিদের’ অপসারণ করা হয়েছে। চাকরিবিধি অনুযায়ী ২৫ বছর চাকরি পূর্ণ হলে কারণ দর্শানো ছাড়াই অবসরে পাঠানোর বিধান রয়েছে এবং সেই বিধান অনুসারেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনসহ বিগত সময়ের বিতর্কিত সব নির্বাচনের সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘২০০৮ সালের নির্বাচন নিয়ে অনেকের মধ্যে ইতিবাচক ধারণা থাকলেও বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, অনেক কেন্দ্রে এক মিনিটেরও কম সময়ে হাজার হাজার ভোট দেওয়া হয়েছে। তাই ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের প্রতিটি নির্বাচনেরই সঠিক ইনভেস্টিগেশন বা তদন্ত হওয়া দরকার। নৈশকালীন অনিয়মের নির্বাচনগুলো দেশের শাসনব্যবস্থা ও গণতন্ত্রকে চরম ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল।’
২০১৮ সালের দিনের ভোট রাতে হওয়ার মতো নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচনী অপরাধের সঙ্গে যেসব স্তরের কর্মকর্তা বা ব্যক্তি জড়িত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারিসহ নানা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকার সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে জানিয়ে ডা. জাহেদ বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এটি খাবার ও পানিতে পাওয়া যাচ্ছে। টুথপেস্টেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যাওয়ায় সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
জ্বালানি খাতের বিষয়ে তিনি জানান, স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে এবং চতুর্থ এফএসআরইউ (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং বর্তমানে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলা প্রসঙ্গে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, বিগত সরকারের আমলে সদিচ্ছার অভাবে এই মামলার তদন্ত দীর্ঘায়িত করা হয়েছিল। তবে বর্তমান সরকার যেকোনো বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি আরও বলেন, তনু হত্যার তদন্ত যেমন নতুন করে গতি পেয়েছে, তেমনি সাগর-রুনি হত্যাসহ পূর্বে ঘটে যাওয়া এবং ঝুলে থাকা সকল ফৌজদারি অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত ও সঠিক বিচার নিশ্চিত করতে কাজ করা হচ্ছে।
জুলাই আন্দোলনে আহত ও নিহত সাংবাদিকদের সহায়তার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, শহীদ ও আহত সাংবাদিকদের জন্য সাধারণ সুবিধার বাইরে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের ‘সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট’-এর অধীনে বিশেষ সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্দোলনে সাংবাদিকদের অসামান্য ত্যাগকে নথিভুক্ত করতে একটি বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলমান রয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রপতির আইনি সুরক্ষা বিষয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, আইন অনুযায়ী দায়িত্বে থাকাকালীন রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। তবে পদ ছাড়ার পর যে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব এবং বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
দেশের শিল্পখাতে গ্যাস ও জ্বালানি সংকট বিষয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, বিগত সরকারের ভুল নীতি, অলিগার্কদের সুবিধা দেওয়া ও দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের পরিবর্তে আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর নির্ভরতার কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে সংকট কাটাতে দ্রুত ভোলার গ্যাসের ব্যবহার বাড়ানো এবং সমুদ্রে নতুন গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, চলতি ২০২৬ সালের মধ্যেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রথম ধাপ শুরু হলে পর্যায়ক্রমে সকল স্তরের নির্বাচন সম্পন্ন করতে সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
জুলাই বিপ্লবের বর্ষপূর্তি ও ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে নির্ধারিত সময়সূচির মধ্যেই জুলাই যাদুঘরের উদ্বোধনী ও স্মারক কার্যক্রম চূড়ান্ত করা হবে বলে জানান তিনি।
