টানা চার বছর বাজার চড়া

নয়াবার্তা প্রতিবেদক : ঢাকায় যত মাছ আসে, তার বড় অংশের উৎস ময়মনসিংহ। জেলার ত্রিশাল উপজেলার ব্যবসায়ী আলী হোসেন ১৫ বছর ধরে সেখান থেকে মাছ ঢাকায় নিয়ে পাইকারি বাজারে বিক্রি করেন।

আলী হোসেন বলেন, তিনি পানিভর্তি ড্রামে করে একটি ট্রাকে ৪০ মণের মতো মাছ নিতে পারেন। গত রোববার জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোয় ট্রাকভাড়া বেড়েছে দুই হাজার টাকা।

হিসাব করে দেখা যায়, কেজিতে বাড়তি ভাড়া

লাগছে দেড় টাকার কম। কিন্তু ঢাকার মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, টাউন হল বাজার ও আগারগাঁও তালতলা বাজার ঘুরে দেখা যায়, চাষের মাছের কেজি আগের চেয়ে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি চাইছেন বিক্রেতারা।

কৃষি মার্কেটের মাছ বিক্রেতা চয়ন চন্দ্র দাস বলেন, তাঁরা মিরপুর ৬ নম্বর বাজার থেকে ছোট ট্রাকে করে মাছ নিয়ে আসেন। সেই ট্রাকের ভাড়া ১ হাজার থেকে বেড়ে ১ হাজার ২০০ টাকা হয়েছে। পাইকারি বিক্রেতারাও আগের চেয়ে কিছু বেশি দাম চাইছেন। সব মিলিয়ে মাছের দাম বেড়েছে।

ডিজেলসহ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর কৃষকের খেত থেকে পণ্য পাইকারি বাজারে নেওয়ার খরচ বেড়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় পণ্য আনার খরচ বেড়েছে। পাইকারি বাজার থেকে পণ্য খুচরা বাজারে নেওয়ার ভাড়া বেড়েছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিটি পর্যায়ে খরচ যতটুকু হওয়ার কথা, ততটুকুতে সীমিত থাকেনি; বরং দাম বেশি বেড়েছে।

সব মিলিয়ে প্রভাব পড়েছে বাজারে, যে বাজার ২০২২ সাল থেকেই চড়া। টানা চার বছর ধরে বাজার চড়া থাকায় অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির হার উচ্চ থাকায় নিম্ন আয়ের মানুষ চরম সংকটে রয়েছেন। অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, টানা কয়েক বছর উচ্চ মূল্যস্ফীতি হলে দারিদ্র্যসীমার ঠিক ওপরে থাকা মানুষদের একাংশ আবার দরিদ্র হয়ে যান।

নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, এখন মানুষ কেমন আছে? তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি এবং কম কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার কারণে মানুষ টিকে থাকতে নানা উপায় বেছে নিচ্ছে। ফুটপাতে দোকান দেওয়া, ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানো ইত্যাদি। অর্থাৎ অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিকতা বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে তরুণদের একাংশ অপরাধে জড়িত হয়ে পড়েছে। তিনি জানান, প্রথম আলোর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলার সময় তিনি গাড়িতে বনানী থেকে মোহাম্মদপুরে যাচ্ছিলেন। যানজটে তাঁর সামনেই এক ছিনতাইকারী ছোঁ মেরে মানুষের মুঠোফোন ছিনতাইয়ের চেষ্টা করছিল।

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এত দীর্ঘ সময় এত বেশি মূল্যস্ফীতির কবলে মানুষ নিকট অতীতে ছিল না। মানুষ সংকটে রয়েছে। তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দিতে পারে।

বিশ্ববাজারে চড়া দাম এবং দেশীয় নানা কারণে ২০০৭–০৮ সালের দিকে দেশে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের শুরুর দিকে দাম চড়া ছিল। তবে দ্রুতই বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম পড়ে যেতে শুরু করে। এর সুফল পায় তৎকালীন সরকার।

২০২০ সালে করোনা মহামারির আগপর্যন্ত দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ে বড় কোনো চিন্তা ছিল না। করোনার শুরুর দিকে আতঙ্কের কেনাকাটার কারণে দাম বেড়ে যায়। আসল সংকট শুরু হয় ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর। বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট শুরু হয়, জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়ে।

তখন ডলারের দাম বাড়তে থাকে লাফিয়ে লাফিয়ে। কমতে থাকে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভ। মূল্যস্ফীতি হয় লাগামহীন। আওয়ামী লীগ সরকার তখন ঠিকভাবে সামলাতে পারেনি। বরং দফায় দফায় গ্যাস, বিদ্যুৎ ও তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প নেওয়া, অর্থ পাচার, দুর্নীতি ইত্যাদি কারণে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। পরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়।

অবশ্য তত দিনে ডলারের দাম ৮৬ টাকা থেকে বেড়ে ১১৮ টাকা হয়ে গেছে। রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে নেমে যায় ২৬ বিলিয়নে। তা–ও সম্ভব হয়েছিল কঠোর আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও দেনা পরিশোধ পিছিয়ে দিয়ে।

২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হন অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর। এই সরকার অর্থনীতির পতন ঠেকিয়েছিল। ডলারের দাম স্থিতিশীল করতে পেরেছিল। বৈদেশিক মুদ্রার মজুতও বাড়িয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি সহনীয় করতে পারেনি। মূল্যস্ফীতি কমাতে গিয়ে সুদের হার বাড়িয়ে দেওয়া হয়।

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি। এরপরই শুরু হয় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, যা জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি করে এবং দামও বেড়ে যায়। সেই সংকট এখনো চলছে। সরকার দুই দফায় ডিজেলের দাম লিটারে ৩৫ টাকা বাড়িয়েছে। বিদ্যুতের দাম গত জুনে বাড়ানো হয়েছে গড়ে ১৭ শতাংশ।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দামের কারণে পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়বে। এতে দামও বাড়বে। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে পণ্যভিত্তিক পদক্ষেপ নিয়ে দাম কমানো সম্ভব। সেদিকে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নজর কম।

নিত্যপণ্যের দাম: তখন, এখন

নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের পরিবারে আমিষের একটি বড় উৎস ডিম। রাজধানীর শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা রওশন আরার পরিবারে প্রতি সকালে অন্তত ৬টি ডিম লাগে। মাঝেমধ্যে দুপুর ও রাতেও তিনি ডিম রান্না করেন। তিনি জানান, মাসে গড়ে ২৫০টি ডিম কিনতে হয় তাঁকে।

২০২২ সালের আগে বছরজুড়ে ফার্মের মুরগির বাদামি ডিমের ডজন ৯০–১২০ টাকার মধ্যে থাকত। এখন তা ১২০ থেকে ১৬০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে। গতকাল ঢাকার তিনটি বাজারে ডিম বিক্রি করতে দেখা যায় ডজনপ্রতি ১৫০ টাকা দরে। রওশন আরা বলছিলেন, ডিমের পেছনেই খরচ অনেক বেড়ে গেছে।

ডিমের মতোই চড়া ব্রয়লার মুরগির দাম। কেজিপ্রতি ১৮০–২০০ টাকা। গরুর মাংস নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালছাড়া অনেক আগে থেকেই। কেজিপ্রতি দর ৭৮০–৮৫০ টাকা।

অতীতের সরকারগুলো ডিম, মুরগি ও গরুর মাংসের দাম কমাতে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। নতুন সরকারেরও কার্যকর উদ্যোগ নেই। বিশ্লেষকেরা এই তিন পণ্যের দাম কমাতে চাষিদের সুরক্ষার জন্য উপযুক্ত হারে শুল্ক রেখে আমদানি উন্মুক্ত করা অথবা সীমিত পরিসরে আমদানির সুযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে আসছেন। তাঁরা বলেছেন, প্রতিযোগিতা না থাকলে উচ্চ মূল্য নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। কোনো সরকারই এতে কান দেয়নি।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, ‘ডিমের দাম একটু বাড়তি। সব সময়ই এটা ডজনে ৫ থেকে ১০ টাকা ওঠানামা করে। পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে এ নিয়ে আমরা বসেছিলাম। কারণ অনুসন্ধানের জন্য আবার বসব।’ তিনি বলেন, ‘গরুর মাংসের দাম বৃদ্ধিও আমাদের নজরে এসেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে সঙ্গে নিয়ে শিগগির আলোচনায় বসব। কাজ করছি, আশা করি একটা সমাধান আসবে।’

গরুর মাংস, মুরগির মাংস ও ডিমের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য কী উদ্যোগ নিয়েছেন জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহজামান খান বলেন, খাদ্যের দাম কমানোর জন্য গত সপ্তাহে একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। খাদ্যের দাম কমলে উৎপাদন খরচ কমবে। উৎপাদন খরচ কমলে সবকিছুর দাম নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তিনি বলেন, শুধু ডিমের কথা আসে কেন; ফলের দাম বাড়েনি, চালের দাম বাড়েনি, তেলের দাম বাড়েনি? কৃষক ও চাষিদের কথা চিন্তা করতে হবে।

বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরির পরামর্শকে মহাপরিচালক ‘শিল্পকে ধ্বংস করার’ চিন্তা বলে উল্লেখ করেন। অবশ্য বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) ২০২৪ সালের একটি সমীক্ষা বলছে, এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চা, মুরগির খাবার ও ডিমের দাম ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশে বেশি। এর কারণ, আমদানি একেবারেই নিয়ন্ত্রিত রেখে ‘অতিমাত্রায়’ সুরক্ষা প্রদান।

অতিমাত্রায় সুরক্ষার জন্য প্রান্তিক খামারির কথা বলা হলেও এর সুফল পায় মূলত বড় করপোরেটরা। তাদের কাছ থেকে নীতিনির্ধারকেরা সুবিধা নেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সরবরাহ যথেষ্ট থাকলে যে বাজারে কারসাজি করা যায় না, তার উদাহরণ পেঁয়াজ ও আলু। মৌসুমের শেষ দিকে এসেও পেঁয়াজের কেজি এখন ৫০ টাকার আশপাশে। আমদানিও খুব একটা প্রয়োজন হচ্ছে না। অন্যদিকে আলুর দর কেজিপ্রতি মাত্র ২৫–৩০ টাকা।

তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ১২ কেজির সিলিন্ডারের নির্ধারিত দর ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। ঢাকায় তা বিক্রি হয় ২ হাজার টাকার আশপাশের দরে। মাসের পর মাস ধরে এই অনিয়ম চললেও সরকারি সংস্থাগুলো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। গ্রামে সরকার নির্ধারিত দরের কিছু বেশি দামে এলপিজি পাওয়া যায়।

দরকার ভিন্ন রকম উদ্যোগ

বাজারে চাল, ডাল, তেল, চিনিসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দামও চড়া। ঢাকার কেন্দ্রে চারজনের একটি পরিবারের মাসিক খাবার খরচ এখন ২৬ হাজার ৮৮৪ টাকা। বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য খরচও যুক্ত হবে। কিন্তু দেশের শীর্ষ রপ্তানি খাত পোশাক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা। সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামোয় সর্বনিম্ন বেতন ধরা হয়েছে ঢাকায় ভাতাসহ ৩৬ হাজার টাকার কিছু বেশি।

উল্লেখ্য, চারজনের পরিবারের ব্যয়টি হিসাব করা হয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৯ সালের নগর আর্থসামাজিক অবস্থা নিরূপণ জরিপে উল্লিখিত পণ্যের চাহিদা এবং টিসিবির বর্তমান বাজারদর ধরে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লেও অনানুষ্ঠানিক ও বেসরকারি খাতের বহু মানুষ বিপাকে রয়েছেন। মূল্যস্ফীতি সহনীয় করতে সুদের হার বৃদ্ধির কৌশলের পাশাপাশি দরকার পণ্যভিত্তিক ভিন্ন রকম উদ্যোগ। বাজারে অভিযান চালিয়ে অতীতে সমস্যার সমাধান হয়নি, হবেও না। দরকার সরবরাহ এবং প্রতিযোগিতা বাড়ানো। নইলে সরকার বাজেটে যে করছাড় দিয়েছে, তার সুফল পাওয়া যাবে না। দারিদ্র্য আরও বাড়বে।

মোহাম্মদপুরে একটি বাসায় নিরাপত্তাকর্মীর কাজ করেন আনসার হোসেন। বয়স ষাটের বেশি। তিনি বেতন পান ১৫ হাজার টাকা। স্ত্রী ঠিকা গৃহকর্মীর কাজ করে আরও হাজার পাঁচেক টাকা আয় করেন। জানতে চাইলে আনসার হোসেন বলেন, খুব হিসাব করে চলেও মাস শেষে হাত পাততে হয়। তিনি বলেন, ‘এসব কথা কইয়া কী লাভ হইব। আমগো কথা তো কেউ শোনে না। দামও কমবো না।’

Share