ক্যামেরা ট্রায়ালে বিচারিক ক্ষমতা হারালেন কামরুন্নাহার

গাজী আবু বকর : ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে ঢাকার সপ্তম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সাবেক বিচারক বেগম মোছা. কামরুন্নাহারের ফৌজদারি বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণের মামলায় এখতিয়ারবহির্ভূত পর্যবেক্ষণ দিয়ে এই বিচারক সমালোচিত হন।

সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র ও স্পেশাল অফিসার মোহাম্মদ সাইফুর রহমান সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানান।

প্রধান বিচারপতি এর আগে কামরুন্নাহারের বিচারিক ক্ষমতা সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করার পাশাপাশি তাকে আর আদালতে না বসার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আদালত থেকে প্রত্যাহার করে তাকে পাঠানো হয়েছিল আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগে।

তখন জানা যায়, স্থগিতাদেশ থাকার পরও অন্য এক ধর্ষণ মামলার এক আসামিকে জামিন দেওয়ার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে আপিল বিভাগ তাকে গত বছর তলব করেছিল। কোন এখতিয়ার বা ক্ষমতাবলে ওই আসামিকে তিনি জামিন দিয়েছিলেন, সে ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হয়েছিল তার কাছে।

গত ১৫ নভেম্বর কামরুন্নাহারের বিষয়টি আপিল বিভাগে ওঠে। সোমবার ফের আদেশের জন্য রাখা হয় মামলাটি। এদিন আদালত বসার আগেই ফাইল নিয়ে আপিল বিভাগের এক নম্বর বিচারকক্ষে হাজির হন কামরুন্নাহার।

তখন ওই বিচরকক্ষে গণমাধ্যমকর্মী, আইনজীবী, বেঞ্চ কর্মকর্তা, সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন কর্মকর্তাও ছিলেন। কিন্তু আদালতের বিচারকাজ শুরুর আগে সবাইকে বের হয় যেতে অনুরোধ করেন সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র ও হাই কোর্ট বিভাগের বিশেষ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুর রহমান।

আইনজীবী, সাংবাদিক, আপিল বিভাগের বেঞ্চ কর্মকর্তাসহ সবাই আদালত কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলে বেলা সোয়া ১১টার দিকে আপিল বিভাগের ভার্চুয়াল কার্যক্রম চলতে দেখা যায়। পরে বিকালে কামরুন্নাহারের বিষয়ে আদেশের কথা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানান সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র।

সেখানে বলা হয়, “আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগে বর্তমানে সংযুক্ত এবং ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ এর সাবেক বিচারক বেগম মোছা. কামরুন্নাহার অদ্য ২২/১১/২০২১ তারিখ সকাল ৯:৩০ ঘটিকায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আপিল বিভাগে সশরীরে উপস্থিত হন।

“বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ অদ্য আপিল বিভাগের কার্যতালিকার ১ নং ক্রমিকের মামলায় শুনানিঅন্তে – তাহার ফৌজদারী বিচারিক ক্ষমতা সিজ (seize) করা হয়েছে- মর্মে আদেশ প্রদান করেন। পূর্ণাঙ্গ রায় পরবর্তীতে প্রকাশ হবে।”

যে মামলায় আপিল বিভাগ বিচারক কামরুন্নাহারকে তলবের আদেশ দিয়েছিলো : যে মামলায় জামিনের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে কামরুন্নাহার সর্বোচ্চ আদালতে এসেছিলেন, তার আসামি ছিলেন এটিএন বাংলার সাবেক অনুষ্ঠান প্রযোজক আসলাম শিকদার। ২০১৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার হাতিরঝিল থানায় তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের এই মামলা করেন এক নারী।

পুলিশ ওদিনই আসলামকে গ্রেপ্তার করে এবং পরদিন তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

এ মামলায় ২০১৯ সালের ১৮ জুন হাই কোর্ট আসলাম শিকদারকে জামিন দিলে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত তা স্থগিত করে দেয়। পরে ওই স্থগিতাদেশ বাড়ানোর জন্য আপিল বিভাগে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ।

এদিকে চেম্বার আদালতে জামিন স্থগিত থাকার পরও আসামি আসলামকে জামিন দেন ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ এর তখনকার বিচারক কামরুন্নাহার।

রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের শুনানির সময় নিম্ন আদালত থেকে আসলাম শিকদারের জামিন পাওয়ার বিষয়টি সর্বোচ্চ আদালতের নজরে এনেছিলেন তখনকার অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

তখন আপিল বিভাগ বিশেষ বার্তা বাহকের মাধ্যমে নিম্ন আদালত থেকে মামলার নথি আনে। নথি আসার পর তা পর্যালোচনা করেন আপিল বিভাগের বিচারকরা। এরপর বিচারক কামরুন্নাহারকে তলবের আদেশ দেয় আপিল বিভাগ।

এদিকে গত বছরের ১৪ অক্টোবর ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫ এর বিচারক সামছুন্নাহার এ মামলার রায়ে আসলাম শিকদারকে খালাস দেন। সে রায়ের বিরুদ্ধে হাই কোর্ট আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ।

গত ২০ জানুয়ারি সে আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাই কোর্ট বেঞ্চ মামলার নথি তলব করে। সেই সাথে আসলাম শিকদারকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়।

আলোচিত রেইনট্রি মামলা : ঢাকার বনানীর রেইনট্রি হোটেলে চার বছর আগে দুই তরুণীকে ধর্ষণের আলোচিত মামলার রায় আসে গত ১১ নভেম্বর।

বিচারক বেগম মোছা. কামরুন্নাহার ওই রায়ে আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদসহ পাঁচ আসামির সবাইকে খালাস দেন।

তার সঙ্গে ধর্ষণ প্রমাণে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ফরেনসিক পরীক্ষা করার বাধ্যবাধকতার যুক্তি দিয়ে ওই সময়ের পর মামলা না নিতে মৌখিক পর্যবেক্ষণ দেন তিনি।

তার ওই পর্যবেক্ষণকে ‘সম্পূর্ণ বেআইনি ও অসাংবিধানিক’ হিসেবে বর্ণনা করেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। ১৪ নভেম্বর কামরুন্নাহারের বিচারিক ক্ষমতা সাময়িকভাবে প্রত্যাহারের আদেশ আসে আপিল বিভাগ থেকে। পরে মন্ত্রণালয় তাকে আদালত থেকে সরিয়ে নেয়।

অবশ্য রায় ঘোষণার পাঁচ দিন পর ১৭ নভেম্বর ওই মামলার লিখিত রায় প্রকাশিত হলে দেখা যায়, ধর্ষণের মামলা ৭২ ঘণ্টা পর না নেওয়ার সেই মৌখিক পর্যবেক্ষণ লিখিত রায়ে তিনি রাখেননি।

রায় হচ্ছে কোনো একটি মামলায় দণ্ড বা সাজার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত। আর রায়ের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, ওই মামলা প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিচারকের অভিমত, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ।

বিচারক মোছা. কামরুন্নাহারের সব বিচারিক ক্ষমতা সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকার সপ্তম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের এই বিচারককে রোববার সকাল থেকে আদালতে না বসারও নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। ‘দ্য রেইন ট্রি’ হোটেলে দুই ছাত্রী ধর্ষণ মামলার রায়ে পর্যবেক্ষণ দেওয়ার পর এ আদেশ দেওয়া হয়। ধর্ষণের ৭২ ঘণ্টা পর মামলা না নেওয়ার জন্য তিনি ওই রায়ে পর্যবেক্ষণ দেন। ১১ নভেম্বর মামলাটির রায় হয়।