ধর্ষণের ঘটনায় মামলা বাড়ছে, নিষ্পত্তি কম

নয়াবার্তা প্রতিবেদক : দিনাজপুরের পার্বতীপুরের জমিরহাটে চার বছরের একটি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। সেটা ২০১৬ সালের ঘটনা। বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় আইনের আশ্রয় নেয় ভুক্তভোগী পরিবার। এক বছর পর পার্বতীপুর মডেল থানা-পুলিশ সেই মামলার অভিযোগপত্রও দেয়। কিন্তু পাঁচ বছর পরও মামলাটি জেলার নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যগ্রহণ (নারী ও শিশু মামলা নম্বর ১৪৯/১৭) পর্যায়ে আছে। তদন্ত প্রতিবেদন, মেডিকেল প্রতিবেদন আর সাক্ষ্য গ্রহণেই ধর্ষণের এই মামলাটি ঝুলে আছে বছরের পর বছর।

যদিও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ধারা ২০(৩)-এ বলা আছে, বিচারের জন্য মামলার প্রাপ্তির তারিখ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল কার্য শেষ করতে হবে।

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলা যে হারে বাড়ছে, সে অনুযায়ী নিষ্পত্তির হার একেবারেই কম। যার ফলে বিচার না পেয়ে উল্টো হয়রানির শিকার হচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবার। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, আইনের ত্রুটি, ফরেনসিক পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা, প্রভাবশালীদের চাপ, সাক্ষী না পাওয়া, অর্থের দাপট এবং সামাজিক কারণে বিচারের এই ধীরগতি। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট (উই ক্যান) বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ধর্ষণের ঘটনায় ৩৪৭টি মামলা হয়েছে। তবে এসব মামলার বিচার শুরু হয়েছে মাত্র ৭টির।

মামলার বিচারিক কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ধর্ষণের মামলায় আদালতে অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে সাক্ষ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ধর্ষণের মামলায় বেশির ভাগ অভিযুক্ত খালাস পেয়ে যাওয়ার মূল কারণ সাক্ষীর অভাব। মামলার অভিযোগপত্র দেওয়ার পরপরই সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। প্রথম সাক্ষ্য নেওয়া হয় ভুক্তভোগীর। তারপর যিনি মেডিকেল করেছেন, সেই ডাক্তার, জবানবন্দি নেওয়া ম্যাজিস্ট্রেট, সংশ্লিষ্ট সরকারি অন্য কর্মকর্তা। সাক্ষ্য নেওয়া হয় ভুক্তভোগীর পরিবার বা যাঁরা ঘটনার বিষয়ে জানেন। কিন্তু দু-একবার আদালতে আসার পর কোনো সাক্ষীই আর আসতে চান না।

আদালত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাক্ষীর গাফিলতির কারণেই মামলার কার্যক্রম আর এগোনো যায় না। কেননা, এ কাজে তাঁদের কোনো জবাবদিহি থাকে না।

তবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, মামলা নিষ্পত্তি করার প্রধান বাধা সাক্ষী হলেও তদন্ত সংস্থাও কম যায় না। দুর্বল তদন্তে ভরা থাকে প্রতিটি মামলা। অভিযোগ আছে, প্রভাবমুক্ত তদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া। তদন্তের দুর্বলতার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, তদন্তে দুর্বলতা থাকে না। যেটা হয়, এ ধরনের মামলায় বাদী-বিবাদী একসময় আপস করে ফেলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ঢাকায় নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার বিচারকাজ পরিচালনার জন্য ট্রাইব্যুনাল ঢাকা-১, ২, ৩, ৪ ও ৫ কাজ করেন। যেখানে নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল ঢাকা-১-এ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ২০১৭ সালে ৬ হাজার ২২৭টি মামলা আসে। চার বছর পর এখনো ওই মামলার ২ হাজার ৯০২টির বিচার চলমান রয়েছে। ঢাকা-২-এ ২০১৭ সালে মোট মামলা আসে ৫ হাজার ২৭২টি, এখনো বিচারাধীন ৯৪৭টি মামলা। একইভাবে ঢাকা-৩-এ একই বছর মামলা আসে ৫ হাজার ৯৩২টি, এখনো বিচারাধীন ১ হাজার ১০৪টি। ঢাকা-৪-এ মামলা আসে ৬ হাজার ৮২৯টি, বিচারাধীন ৩ হাজার ৭২৩টি। ঢাকা-৫-এ মামলা আসে ৬ হাজার ১০১টি, বিচারাধীন ২ হাজার ৩৯৪টি মামলা।

কেন এই মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলছে—জানতে চাইলে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ফারহানা আফরোজ বলেন, তদন্ত হতে দেরি হওয়া, ভুল প্রতিবেদন দেওয়া, মেডিকেল প্রতিবেদনে অতিরিক্ত সময় লাগা, ঘটনাস্থলের দূরত্ব, আসামি পালিয়ে যাওয়া, পুলিশ সদস্যদের বদলি, নির্যাতনের শিকার মেয়েটির পরিবারের সদস্যদের আর্থসামাজিক অবস্থান প্রভৃতি কারণে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার নিষ্পত্তি হতে দেরি হয়।

তাহলে এর সমাধান কী? কীভাবে এগোলে স্পর্শকাতর এই মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব। বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের পরিচালক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ গোলাম কিবরিয়া বলছেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ১৮০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। কেননা, ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা অনুযায়ী মামলার চাপ অনেক বেশি। একটি ট্রাইব্যুনালে দেড় থেকে দুই হাজার মামলা থাকে। আবার মামলার চার্জশিট অনুযায়ী সাক্ষী পাওয়া যায় না। থাকলেও তাঁদের সময়মতো হাজির করা সম্ভব হয় না। ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানো, আর সাক্ষীদের আদালতে আনা নিশ্চিত করতে পারলে এই জট কিছুটা কমতে পারে।