নানা ইস্যুতে সরব সংসদ

ইসলামী ব্যাংক, ’৭১-এ জামায়াতের ভূমিকা, মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি

নয়াবার্তা প্রতিবেদক : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন ছিল বাজেট অধিবেশন। কিন্তু আলোচনা শুধু আয়-ব্যয়, কর বা বরাদ্দে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইসলামী ব্যাংক, ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা, মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি, প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর—এমন নানা বিষয় আলোচনায় এসেছে।

গত ৭ জুন শুরু হয় বাজেট অধিবেশন। ১১ জুন সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দীর্ঘ আলোচনা শেষে গত ৩০ জুন বাজেট পাস হয়। তবে অধিবেশন এখনো শেষ হয়নি। ৭ জুলাই পর্যন্ত অধিবেশন মুলতবি রাখা হয়েছে। ওই দিন আবার বৈঠক বসবে।

সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার বাজেটের ওপর মোট ৪৮ ঘণ্টা ৫৪ মিনিট আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে সম্পূরক বাজেটের ওপর ৩ ঘণ্টা ৩ মিনিট এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর ৪৫ ঘণ্টা ৫১ মিনিট আলোচনা হয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতাসহ মোট ২৯১ জন সংসদ সদস্য বক্তব্য দেন। তাঁদের মধ্যে সরকারি দলের সদস্য ছিলেন ২০০ জন, আর বিরোধী দলের ৯১ জন।

বাজেট আলোচনায় সরকারি দলের সদস্যদের বক্তব্যে ঘুরেফিরে এসেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও প্রস্তাবিত বাজেটের প্রশংসা। তাঁরা বাজেটকে বৃহৎ, জনকল্যাণমুখী, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিবান্ধব হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁদের মতে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানে বরাদ্দ বৃদ্ধির মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের চেষ্টা করা হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর কমানোর প্রস্তাবে সাধারণ মানুষ স্বস্তি পাবে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।

অন্যদিকে বিরোধী দলের সদস্যরা বাজেটকে অতি উচ্চাভিলাষী ও ঋণনির্ভর বলে বর্ণনা করেন। তাঁদের মতে, বড় বাজেটের চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এর বাস্তবায়ন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ঋণের চাপ, রাজস্ব আহরণ, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত না হলে বাজেটের সুফল পাওয়া যাবে না। এসবের জন্য কাঠামোগত সংস্কার জরুরি বলেও তাঁরা মত দেন। এর বাইরে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সুদমুক্ত ও জাকাতভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু এবং অর্থবছর জানুয়ারি-ডিসেম্বর করার দাবিও ওঠে।

বাজেট আলোচনায় স্বাস্থ্য খাতও গুরুত্ব পেয়েছে। হাসপাতালের শয্যা বৃদ্ধি ও বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও সংসদ সদস্যরা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসক–সংকট, দুর্বল চিকিৎসাসেবা ও নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তাঁদের বক্তব্যে মাদক নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় রাস্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাঁধ, কৃষি প্রকল্প ও শিল্প স্থাপনের দাবিও আসে।

মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকার সমালোচনা

এবারের বাজেট আলোচনায় অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক বিষয় ছিল ১৯৭১ সালে বর্তমান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা। দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি করেন বিএনপির সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম। তাঁর মতো আরও কয়েকজন সদস্য মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকার সমালোচনা করেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের মতো শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাও জামায়াতের সমালোচনা করেন।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধে জামায়াতের অবস্থানের জন্য দলটির জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল। এখনো সে সুযোগ রয়েছে। তাঁর মতে, একাত্তরের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিলে জামায়াতের রাজনীতি করা সহজ হবে। একই সঙ্গে তিনি এনসিপিকেও স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী দলের সঙ্গে জোট করার বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করার আহ্বান জানান।

জামায়াতে ইসলামীর ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কঠোর সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘১৯৯০ ও ২০২৪ সালে আপনাদের কিছু ভূমিকার স্বীকৃতি আমরা দিই। কিন্তু ইতিহাসের যে অংশগুলো আপনাদের পক্ষে যায় না, সেগুলোও ভুলে গেলে চলবে না।’

মুক্তিযুদ্ধে দলের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি ব্যাখ্যা না দিলেও জামায়াতের সংসদ সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম পাল্টা প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, জামায়াত না থাকলে সেই রাজনৈতিক শূন্যতা কে পূরণ করবে? সরকার আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে চাইছে কি না, সে প্রশ্নও রাখেন তিনি।

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে বিতর্ক

এ অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের আনা একটি প্রস্তাবে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা, ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক হয়। বিরোধী দল দাবি করে, ডিজিএফআইয়ের সহায়তায় ব্যাংকটির শেয়ার দখল করে নেওয়া হয়েছে। তারা ‘প্রকৃত মালিকদের কাছে’ শেয়ার ফিরিয়ে দেওয়া, ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পুনর্বহাল এবং সংসদীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানায়।

অন্যদিকে সরকারি দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, ইসলামী ব্যাংককে অস্থিতিশীল করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা চলছে। গণ–অভ্যুত্থানের পর ‘নারায়ে তাকবির’ বলে ব্যাংকটি দখল করা হয়েছে। সেখানে নানা অনিয়ম হয়েছে। ব্যাংকটির একটি ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প থেকে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনে অর্থায়ন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলা হয়। সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, আগে ১১ হাজার কোটি টাকা এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আরও ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।

নির্ধারিত ওই বিতর্কের বাইরেও বাজেট আলোচনায় বিরোধী দলের অনেক সদস্য ইসলামী ব্যাংক নিয়ে বক্তব্য দেন। ঋণখেলাপি, অর্থ পাচার, এস আলম, আদানি ও সামিটের সঙ্গে চুক্তির বিষয়েও সরকারের অবস্থান জানতে চাওয়া হয় বিরোধী দলের পক্ষ থেকে।

‘পুশ ইন’ নিয়ে আলোচনা স্থগিত

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক ‘পুশ ইন’ ও সীমান্ত হত্যা নিয়ে আলোচনার জন্য একটি নোটিশ দিয়েছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম। নোটিশটি গ্রহণ করে আলোচনার দিনও ঠিক করা হয়েছিল। কিন্তু ১৪ জুন আলোচনার নির্ধারিত দিনে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল জানান, ‘অনিবার্য কারণে’ এ আলোচনা স্থগিত করা হয়েছে।

এ নিয়ে আহমাদ বিন কাসেম প্রশ্ন তুললে ডেপুটি স্পিকার জানান, বাজেট অধিবেশনের সময় সংকটের কারণে আলোচনা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

বাজেট আলোচনার সময় সরকারের মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে একাধিক দিন প্রশ্ন তোলে বিরোধী দল। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যায়, যে মন্ত্রণালয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেই মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রতিনিধি সংসদ কক্ষে উপস্থিত থাকেন না। এটা সংসদের মেজাজের সঙ্গে যায় কি না, স্পিকার সে সিদ্ধান্ত দেবেন।’ মন্ত্রীরা যাতে সংসদে উপস্থিত থাকেন, তা নিশ্চিত করতে চিফ হুইপের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় কোনো কাজ সংসদ অধিবেশনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়।

চলতি অধিবেশন চলাকালেই ২১ থেকে ২৬ জুন পর্যায়ক্রমে মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। তিনি দেশে ফেরার পরদিন ২৭ জুন প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে সংসদ।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রস্তাবটি আনেন। প্রস্তাবে বলা হয়, ‘সংসদের অভিমত, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২১ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত মালয়েশিয়া এবং চীন সফরে অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য এই মহান সংসদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে।’

প্রস্তাবটির ওপর আলোচনায় অংশ নেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। পরে কণ্ঠভোটে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।

চলতি অধিবেশনে এক দিন ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। গত ২৮ জুন বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা ও দলটির রাজনীতির সমালোচনা করেন। সেদিন সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। পূর্বঘোষণা ছাড়া দুটি বিল উত্থাপন, বিলের কপি আগে না দেওয়া, পয়েন্ট অব অর্ডারে কথা বলার সুযোগ না দেওয়া এবং সরকারি দলকে তুলনামূলক বেশি সময় দেওয়ার অভিযোগ তুলে তারা ওয়াকআউট করে।

Share