
৯ আগস্ট, ২০২৬। কমলাপুর রেলস্টেশন। কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস। ছাড়ার সময় রাত ৮টা। ছেড়েছে রাত সাড়ে ১১টায়। লালমনিরহাট এক্সপ্রেস। ছাড়ার নির্ধারিত সময় রাত পৌনে ১০টা। ছেড়ে যায় রাত পৌনে ২টায়। যাত্রীদের অভিযোগ, ট্রেনের সময়সূচির এমন বিপর্যয় নিয়মিত ঘটনা। রেল কর্তৃপক্ষ জানায়, ইঞ্জিন কম থাকায় মাঝে মাঝে সময়সূচি ঠিক রাখতে সমস্যা হয়।
যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে ২০২২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে প্রায় ১ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০টি ইঞ্জিন কেনা হয়। এর ২৩টি এখন অকেজো! এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন ফান্ড থেকে ঋণ নিয়ে এসব ইঞ্জিন কেনা হয়েছিল।
ঋণ নিয়ে করা অনেক প্রকল্পের এমন অবস্থা। প্রকল্প থেকে মানুষের যেসব সুবিধা পাওয়ার কথা, বাস্তবে তা পাওয়া যায় না। এর মূল কারণ দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা। আবার বিদেশি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় অর্থনীতির ওপর এর চাপ তৈরি হচ্ছে। আর ঋণ পরিশোধে বাজেটের বড় একটি অংশ ব্যয় হচ্ছে।
সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এক বৈঠকে স্থানীয় সরকার বিভাগের (এলজিডি) অধীন কিছু প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। উচ্চ সুদহার এবং প্রকল্পের অকার্যকর ফলাফলের উদাহরণ তুলে ধরেন ইআরডির কর্মকর্তারা।
বৈঠকে এমন মত আসে, গত ২৫ বছরে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে একের পর এক বিদেশি ঋণনির্ভর প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। বরং বৈদেশিক ঋণের বোঝা বেড়েছে। ক্রমবর্ধমান সুদের কারণে স্থানীয় সরকার বিভাগের ওপর বিদেশি ঋণের দীর্ঘস্থায়ী নির্ভরতা তৈরি হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ ঋণ বুলেটিন অনুযায়ী, গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশি-বিদেশি মিলিয়ে সরকারের মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৬ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক উৎস থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ৯ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ১২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা।
আইএমএফের সর্বশেষ মূল্যায়নে বাংলাদেশের ঋণঝুঁকি নিম্ন থেকে মধ্যম পর্যায়ে গেছে বলে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপুল অঙ্কের ঋণের আসল ও উচ্চ সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারের রাজস্ব বাজেটের ওপর চাপ বাড়ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আরেকটি অভ্যন্তরীণ নথিতে বলা হয়েছে, সরকারের মোট ঋণের তুলনায় বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় বিনিময় হারজনিত ঝুঁকি আরও তীব্র হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবর্তনশীল সুদহারের ঋণের অংশ বাড়ায় সুদ পরিশোধের ঝুঁকিও বাড়ছে।
এ অবস্থায় প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের নতুন বিদেশি ঋণ গ্রহণের সীমা-সংক্রান্ত শর্ত আরোপ করে আইএমএফ। সংস্থার ঋণ কর্মসূচির আওতায় দেওয়া শর্ত অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নতুন বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের সর্বোচ্চ সীমা ৮৪৩ কোটি ৭৩ লাখ ডলার নির্ধারণ করে দেয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে প্রণীত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার শ্বেতপত্রে বলা হয়, গত ১৫ বছরে ভৌত অবকাঠামো, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে মেগা প্রকল্পের নামে অতিরিক্ত ব্যয় প্রাক্কলন, রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি এবং নজিরবিহীন লুটপাট হয়েছে। এসব প্রকল্পের অধিকাংশ ছিল দেশি-বিদেশি ঋণের অর্থে।
সম্প্রতি করা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মূল্যায়নেও বেশ কিছু বিদেশি ঋণের প্রকল্পে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
রেলের সময় যে কারণে ঠিক থাকে না
দক্ষিণ কোরিয়া থেকে কেনা ৩০০০ সিরিজের ৩০টি ইঞ্জিনের মধ্যে মাত্র চার বছরে ২৩টি প্রায় অকেজো হয়ে গেছে। ঢাকার কমলাপুর ওয়ার্কশপে গিয়ে দেখা যায়, এ সিরিজের ৩০০৮ নম্বরের ইঞ্জিনটি একেবারে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। মেকানিক দেলওয়ার হোসেন জানান, কিছুদিন ধরে ইঞ্জিনটি অকেজো অবস্থায় এখানে রয়েছে।
অন্য একজন মেকানিক বলেন, এ সিরিজের ইঞ্জিনগুলো প্রায়ই নষ্ট হয়ে যায়। পরে সেগুলো ওয়ার্কশপে আনা হয়। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ না থাকা ও সারানোর যোগ্য না হওয়ায় ঈশ্বরদী কিংবা চট্টগ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এগুলোর অধিকাংশই এমন অবস্থায় গেছে, ঠিক করা সম্ভব না-ও হতে পারে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পরিকল্পিতভাবে নিম্নমানের এসব ইঞ্জিন কেনা হয়। এতে রাষ্ট্র তথা জনগণের ক্ষতি হলেও সিন্ডিকেটের পকেট ভারী হয়েছে। তখন রেলমন্ত্রী ছিলেন নুরুল ইসলাম সুজন।
বাংলাদেশ রেলওয়ের যুগ্ম মহাপরিচালক (লোকো) মো. বোরহান উদ্দিন বলেন, প্রতিবছর ইঞ্জিনগুলো সার্ভিসিং করা দরকার ছিল। কিন্তু যন্ত্রাংশ পাওয়া যায়নি। এসব ইঞ্জিনের কার্যকারিতা ২০ বছর থাকলেও গত বছরের আগস্টে ৩০টি ইঞ্জিনের মধ্যে মাত্র সাতটি সচল ছিল। পরে কিছু ইঞ্জিন সার্ভিসিং করায় বর্তমানে ১৩টি ইঞ্জিন চলাচলের উপযোগী। অন্যগুলোও সার্ভিসিং করা হবে।
ট্রেনের সূচি বিপর্যয় বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবেই যাতায়াতে কিছুটা বেশি সময় লেগে যায়। অতিরিক্ত ট্রেন বা ইঞ্জিন থাকলে এ বাড়তি সময়টুকু পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হতো। প্রায় ৩০টি ইঞ্জিনের প্রয়োজন হলেও কখনও ১২ থেকে ১৩টি অথবা ১৬টি ইঞ্জিন পাওয়া যায়। ইঞ্জিন সংকটের কারণে শিডিউল বিপর্যয় বেড়ে যায়। ৩০০০ সিরিজের সব ইঞ্জিন সচল থাকলে শিডিউল বিপর্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতো।
ইঞ্জিন ছিল নিম্নমানের, হয়েছে দুর্নীতি
২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানি হুন্দাই রোটেমের সঙ্গে ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল ইঞ্জিন কেনার চুক্তি করে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এডিবির কাছ থেকে ঋণ নিয়ে প্রথম ধাপে ২৯৮ কোটি টাকায় ১০টি ইঞ্জিন কেনা হয়। পরে দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন ফান্ড থেকে ঋণ নিয়ে ৮৪১ কোটি টাকায় আরও ২০টি ইঞ্জিন কেনা হয়।
প্রথম ধাপের ১০টি ইঞ্জিন ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে সরবরাহ করে হুন্দাই। চট্টগ্রাম বন্দরে খালাসের পর রেলওয়ের কমিশনিং কমিটি পরীক্ষা করে। পরীক্ষায় দেখা যায়, ইঞ্জিনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ চারটি কারিগরি উপাদান (মেইন ইঞ্জিন, অলটারনেটর, কম্প্রেসর ও ট্র্যাকশন মোটর) চুক্তিতে উল্লেখ করা মডেলের চেয়ে নিম্নমানের।
ওই বছরের ৩১ আগস্ট রেলওয়ের নিযুক্ত পরিদর্শক প্রতিষ্ঠান গ্রিন বাংলা ইন্সপেকশন কোম্পানি লিমিটেড ১০টি ইঞ্জিনকে ত্রুটিপূর্ণ বলে উল্লেখ করে। এরপর তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক নুর আহম্মদ হোসেন চুক্তির শর্তবহির্ভূত এসব ইঞ্জিন গ্রহণে আপত্তি জানান। একই সঙ্গে কার্যকারিতা পরীক্ষা ও ট্রায়াল রানের মাধ্যমে কমিশনিংয়ের সুপারিশ করেন।
রেলওয়ে রোলিং স্টক (লোকোমোটিভ, রিলিফ ক্রেন ও লোকোমোটিভ সিমুলেটর ক্রয়) প্রকল্পের ওপর মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ের নিরীক্ষায় চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে নিম্নমানের ইঞ্জিন কেনার বিষয়টি ধরা পড়ে।
সিএজির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইঞ্জিনের বিষয়ে গঠিত চার সদস্যের কারিগরি কমিটি ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর প্রতিবেদন দেয়। এতে দেখা যায়, চুক্তিতে নির্ধারিত ১২ সিলিন্ডারের ৭১০ সিরিজের মেইন ইঞ্জিনের পরিবর্তে ৮ সিলিন্ডারের ইঞ্জিন দেওয়া হয়েছে। ৩০০০ হর্সপাওয়ারের অলটারনেটরের বদলে দেওয়া হয়েছে ২০০০ হর্সপাওয়ার। একইভাবে নির্ধারিত মডেলের ট্র্যাকশন মোটর দেওয়া হয়নি। কম্প্রেসরেও চুক্তির শর্তের সঙ্গে অমিল পাওয়া যায়। কমিটি জানায়, এসব ত্রুটিপূর্ণ উপাদান দিয়ে তৈরি ইঞ্জিন সফলভাবে চালানো সম্ভব নয়।
এ অবস্থায় প্রকল্প পরিচালক চুক্তিমূল্যের ৬৫ শতাংশ পরিশোধে আপত্তি জানান। ২০২১ সালের ৩ মার্চ রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান চুক্তি অনুযায়ী ইঞ্জিন সরবরাহ করেনি মর্মে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। তবে বাংলাদেশ রেলওয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক নির্দেশনা অনুযায়ী তদন্ত কমিটি গঠন করেননি।
এরপর প্রকল্প পরিচালক নুর আহম্মদ হোসাইনকে অন্যত্র পদায়ন করা হয়। তাঁর জায়গায় মোহাম্মদ হাসান মনসুরকে প্রকল্প পরিচালক করা হয়। নতুন প্রকল্প পরিচালক ত্রুটিপূর্ণ কম্পোনেন্ট পরিবর্তন না করেই ইঞ্জিনগুলো রেলবহরে যুক্ত করেন। ২০২১ সালের ৩ ডিসেম্বর চুক্তিমূল্যের ৬৫ শতাংশ ২৬৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়।
সিএজির নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর), ২০০৮-এর বিধি ১২৭(২)(ক) অনুযায়ী ক্রয় প্রক্রিয়ায় দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত বা পদ্ধতি গ্রহণে প্ররোচিত করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই চুক্তিবহির্ভূত সাব-স্ট্যান্ডার্ড রেল ইঞ্জিন গ্রহণের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ আবশ্যক বলে রেলপথ মন্ত্রণালয়কে জানায় সিএজি কার্যালয়। তবে এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি মন্ত্রণালয়।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর নিম্নমানের ১০টি মিটারগেজ রেল ইঞ্জিন কিনে সরকারের ৩২৪ কোটি টাকার ক্ষতিসাধন ও আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করে দুদক। মামলায় রেলের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) শামসুজ্জামান, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) মঞ্জুরুল আলম চৌধুরী এবং প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ হাসান মনসুরকে আসামি করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগ আনা হয়।
মামলার এজাহারে বলা হয়, আসামিরা যোগসাজশে অসৎ উদ্দেশ্যে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। সেই অনুযায়ী তারা প্রতারণা, জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ১০টি লোকোমোটিভ কেনা-সংক্রান্ত দরপত্রে উল্লিখিত নির্দিষ্ট মান বা বৈশিষ্ট্য এবং সম্পাদিত ক্রয় চুক্তি লঙ্ঘন করেন। এর মাধ্যমে তারা ইঞ্জিনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করেন এবং পিএসআই সনদ ছাড়াই ইঞ্জিনগুলোর মান বা বৈশিষ্ট্য চুক্তি অনুযায়ী সঠিক হিসেবে উপস্থাপন করেন।
এজাহারে আরও বলা হয়, আসামিরা তদারককারী প্রতিষ্ঠানের মতামত ছাড়াই ইঞ্জিন ক্রয় দেখিয়ে ১ কোটি ৩৬ লাখ ৫৬ হাজার ১৯২ টাকা আত্মসাৎ করেন। অন্যদিকে নিম্নমানের ইঞ্জিন কিনে সরকারের ৩২২ কোটি ৬৮ লাখ ৮৯ হাজার টাকার ক্ষতিসাধন করেন। তবে এ মামলায় তৎকালীন রেলমন্ত্রী ও সচিবের নাম নেই। এ বিষয়ে ইঞ্জিন কেনাকাটার আগের প্রকল্প পরিচালক নুর আহম্মদ হোসাইন বলেন, সাবেক রেলমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজনের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারের এ ক্ষতি হয়েছে। দায়িত্বে থাকাকালে চুক্তির শর্তবহির্ভূত এসব ইঞ্জিন গ্রহণ করে অর্থ পরিশোধের করার জন্য তাঁকে দফায় দফায় চাপ দেন মন্ত্রী। এক পর্যায়ে সিন্ডিকেটের ইশারায় তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে অন্য একজনকে নিয়োগ দিয়ে এসব ইঞ্জিন গ্রহণ করা হয়।
দুদকের মামলায় মন্ত্রীর নাম না থাকা আশ্চর্যজনক বলে উল্লেখ করেন নুর আহম্মদ। মামলার শুনানিতে অংশ নিয়েও তিনি একই কথা বলেছেন বলে জানান।
জানতে চাইলে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, মামলা এখনও চলমান। এর বাইরে বেশি কিছু বলা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
সিএজির কার্যালয়ের সুপারিশ অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বলেন, ‘এখনও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। শুনেছি, দুদক মামলা করেছে।’
একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। সে সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হবে কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে রেলসচিব বলেন, দুদক বিষয়টি তদন্ত করছে। তাদের তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম শেষ হোক। এরপর এ বিষয়ে কী করা যায়, তা দেখা হবে।
ইঞ্জিন সংকট কাটিয়ে উঠতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কিনা– জানতে চাইলে মো. ফাহিমুল ইসলাম বলেন, ৩০টি মিটারগেজ ও ৪০টি ব্রডগেজ— মোট ৭০টি লোকোমোটিভ মেরামত করে সচল করতে হবে। এজন্য একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সার্ভিস চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে।
স্থানীয় সরকারের কিছু প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন
উপজেলা গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (ইউজিডিপি) প্রথম পর্যায়ে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ঋণের সুদের হার ছিল মাত্র ০.০১ শতাংশ। প্রস্তাবিত দ্বিতীয় পর্যায়ে তা বেড়ে ২.৩৫ শতাংশ হয়েছে। ইআরডির মূল্যায়ন, সুশাসন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো খাতে এ ধরনের উচ্চ সুদের বৈদেশিক ঋণ ব্যয়বহুল ও অযৌক্তিক।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত লোকাল গভর্ন্যান্স সাপোর্ট প্রজেক্টের (এলজিএসপি) তিনটি ধাপ, ইউএনডিপির ইউনিয়ন পরিষদ গভর্ন্যান্স প্রজেক্ট (ইউপিজিপি) এবং জাইকার অর্থায়নে ইউজিডিপি-১ বাস্তবায়িত হলেও এসব প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত কাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি বলে ইআরডির মূল্যায়নে বলা হয়। পরামর্শকনির্ভর এই মডেলও কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। ঋণের অর্থের বড় অংশ পরামর্শক নিয়োগ, কর্মশালা ও সেমিনারে ব্যয় হলেও বাস্তব প্রশাসনিক সংস্কার বা টেকসই সক্ষমতা তৈরি হয়নি। সরকারি অর্থায়ন ও নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে একই লক্ষ্য আরও কার্যকরভাবে অর্জন সম্ভব বলে মনে করে ইআরডি।
সভার কার্যপত্রে বলা হয়, ইউজিডিপি-১ প্রকল্পে জাইকার ঋণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ১ হাজার ১৫১ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ইউজিডিপি-২-এ প্রায় ২ হাজার ৩১০ কোটি টাকা ঋণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে বাস্তবায়িত ইউজিডিপি-১-এর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে।
ইআরডির প্রশ্ন, ইউজিডিপি-১ বাস্তবায়নের এক দশক পরও যদি উপজেলা পরিষদকে শক্তিশালী করতে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রয়োজন হয়, তাহলে প্রথম প্রকল্পের কার্যকারিতা কতটুকু ছিল। ইআরডির তাদের মূল্যায়নে বলা হয়, উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে সফল দেশগুলো এ ধরনের সুশাসন প্রকল্পে ঋণ নেয়নি। ঋণের ওপর নির্ভরতা অব্যাহত থাকলে স্থানীয় সরকার বিভাগ নিজস্ব ব্যবস্থা ও শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করতে পারবে না।
এ কারণে এলজিএসপি, ইউপিজিপি, ইএলএজি ও ইউজিডিপি-১ প্রকল্পের সমন্বিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন চেয়েছে ইআরডি। একই সঙ্গে ইউজিডিপি-২ উচ্চ সুদের ঋণে বাস্তবায়নের পরিবর্তে সরকারি অর্থায়নের সম্ভাবনা যাচাইয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
একই ধরনের আপত্তি উঠেছে বিশ্বব্যাংকের ঋণে বাস্তবায়িত ‘রিকভারি অ্যান্ড অ্যাডভান্সমেন্ট অব ইনফরমাল সেক্টর এমপ্লয়মেন্ট (রেইজ)’ প্রকল্প নিয়েও। ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদের এ প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ঋণ ২০ কোটি ডলার। এর মধ্যে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ব্যবহার করছে ১৫ কোটি ডলার এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের (ডব্লিউইডব্লিউবি) আওতায় প্রায় ৫ কোটি ডলার।
ইআরডির মতে, কভিড-১৯-এর কারণে ফেরত আসা প্রবাসীদের এককালীন ১৩ হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা দেওয়া হলেও তা টেকসই কর্মসংস্থান বা আয় সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখেনি। ইআরডির মূল্যয়নের সূত্র ধরে এ প্রকল্পের উপকারভোগী ঢাকার নবাবগঞ্জ দোহারের নয়ন উদ্দীন এবং নাটোরের শফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা সমকালকে জানান, ওই অর্থ সংসারের প্রয়োজন মেটাতেই শেষ হয়ে গেছে। টেকসই আয়মূলক কাজ করা সম্ভব হয়নি। ইআরডি জানিয়েছে, প্রায় ২৫ হাজার উপকারভোগীর মধ্যে ২০ জেলার মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে দেখা গেছে, এত কম অঙ্কের সহায়তায় ঘুরে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব।
আধুনিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি
বিদেশি ঋণের সুদের হার ও মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামা থেকে সৃষ্ট ঝুঁকি কমাতে ভারত, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ আধুনিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ব্যবহার করে। এর মধ্যে ঝুঁকি সুরক্ষা ব্যবস্থা, মুদ্রা বিনিময় চুক্তি ও ভবিষ্যৎ বিনিময় চুক্তি উল্লেখযোগ্য। এসব পদ্ধতিতে ভবিষ্যতের বিনিময় হার আগেই নির্ধারণ করে রাখা যায়। এতে টাকার অবমূল্যায়ন হলেও পূর্বনির্ধারিত হারে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশে সরকারি ঋণের ক্ষেত্রে এ ধরনের আধুনিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে ওঠেনি। এমনকি সরকারের ঋণ গ্রহণের জন্য সুস্পষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক মানদণ্ড নেই বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মতে, পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণে দুর্বলতার কারণে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রয়োজনীয় অনেক প্রকল্পে বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের আর্থিক চাপ ও ঋণঝুঁকি বাড়ছে।
মন্ত্রণালয়ের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিদেশি ঋণের বড় অংশ নেওয়ার সময় প্রকল্পের বাস্তব প্রয়োজন, অর্থনৈতিক ফেরত ও দীর্ঘমেয়াদি দায় বহনের সক্ষমতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। এতে সুদের হার, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং ঋণ পরিশোধের চাপ— তিন দিক থেকেই ঝুঁকি বাড়ছে। তবে ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও ঝুঁকিসচেতন করতে উদ্যোগ নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ঋণ থেকে উদ্ভূত ঝুঁকি কমাতে ঝুঁকি সুরক্ষা ব্যবস্থা, মুদ্রা বিনিময় চুক্তিসহ আধুনিক আর্থিক উপকরণ ব্যবহারের বিষয়টি অর্থ বিভাগের কার্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগ প্রথমে নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এ সরকার উদ্যোগটি বাস্তবায়নে এগোচ্ছে। এরই মধ্যে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়েছে অর্থ বিভাগ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে দেশের বাজেট ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে স্থানীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ ধীরে ধীরে কমিয়ে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ বাড়ানো হবে। সার্বিকভাবে সরকারের ঋণনির্ভরতা কমাতে রাজস্ব আয় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আগের সরকারের আমলে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে দুদকে যেসব মামলা হয়েছে, সেগুলো আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, সাম্প্রতিক বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যয়ের খাত হয়ে উঠেছে ঋণের সুদ পরিশোধ। এ প্রবণতা বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে ঋণের ফাঁদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বিদেশি ঋণের সুদের হার আরও বাড়তে পারে। এতে ভবিষ্যতে বিদেশি ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে হবে। অর্থ বিভাগ বিদেশি ঋণ নেওয়ার আগে ঝুঁকি সুরক্ষা ব্যবস্থার উদ্যোগ নিয়েছে, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশ ঋণের ফাঁদের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কিছুটা হলেও কমাতে পারবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সিঙ্গাপুরসহ যেসব দেশ উন্নতি করেছে, তারা ১০০ বছর পর কোনো সিদ্ধান্তের কী প্রভাব পড়বে, সেটিও বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু আমাদের স্বল্পমেয়াদি চিন্তা প্রবণতার কারণে ঋণের বোঝা বেড়েছে।
