বিদ্যুৎ-গ্যাস খাতে নানামুখী সমস্যা, সমাধান আমদানিতে

নয়াবার্তা প্রতিবেদক : গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের একাংশ বন্ধ থাকছে। দিনে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিংও করতে হচ্ছে। দেশে ৯ বছর ধরে গ্যাসের উৎপাদন কমছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করা কঠিন হয়ে গেছে। দামও বেড়েছে ব্যাপকভাবে। এদিকে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে সরকারের বকেয়া ৪৪ হাজার কোটি টাকা। বিপুল ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। সরকারের কাছে যথেষ্ট পরিমাণে টাকা নেই। বাড়তি দামে জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে।

সব মিলিয়ে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংকট নানামুখী। অবশ্য এ খাতের বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, সমাধানও আছে। সরকারকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাঁরা বলছেন, সাময়িক বাড়তি খরচ করে বিদ্যুৎ দিতে পারলে অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বে অনেক বেশি। পরোক্ষভাবে সরকার লাভবান হবে। সরকারের রাজস্ব বাড়বে। তাই ব্যয় বাড়লেও বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা উচিত।

কমেছে এলএনজি আমদানি

২০২৫ সালের জুলাই-আগস্টে ২১টি কার্গো আমদানি করা হয়। এবার এসেছে ১৫টি।

দেশে আগামী নভেম্বর থেকে তাপমাত্রা কমবে। তখন বিদ্যুতের চাহিদা কমে যাবে। ফলে দুই মাস (সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর) নিয়ে বেশি চিন্তা। এ সময়ে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালিয়ে গ্যাসের ওপর চাপ কমানোর পরামর্শ দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলছেন, বিদেশি গ্যাসের এখন যে দর, তার বদলে তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচই কম।

বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীরা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নানা পরামর্শ দিয়ে বলছেন, এ বিষয়ে পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে।

এদিকে সরকারও তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আরও বিদ্যুৎ নেওয়ার চিন্তা করছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেন, তেলচালিত কেন্দ্র থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। উৎপাদন বাড়াতে সরকার ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রকে নিয়মিত বিল দিয়ে তেল আমদানি করতে বলা হচ্ছে। তেল পেতেও একটু সমস্যা হচ্ছে। সবারই নজর এখন সিঙ্গাপুরের বাজারে।

গ্যাস আমদানি কমেছে

সংকটের মূল কারণ আমদানিনির্ভরতা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশে গ্যাস উত্তোলনে জোর না দিয়ে বিদেশ থেকে আমদানি শুরু করা হয়। এখন সরবরাহ পাওয়া কঠিন। দামও চড়া।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অনুমোদনে এলএনজি সরবরাহ তদারক করে পেট্রোবাংলা। এ সংস্থার অধীনে থাকা কোম্পানি আরপিজিসিএল আমদানির কাজটি করে। পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএল সূত্র বলছে, গত বছরের প্রথম ৮ মাসে ৭১টি এলএনজি কার্গো আনা হয়েছে, এবার এসেছে ৬৮টি। এর মধ্যে গত জুলাই-আগস্টে এসেছে ১৫টি। গত বছর একই সময়ে এসেছে ২১টি।

বিগত দুই মাসে ৬টি কার্গো কম আসায় এলএনজি সরবরাহ কমে গেছে। যদিও এর মধ্যে অগ্নিদুর্ঘটনায় একটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে ১৬ দিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল। ফলে তিনটি কার্গোর চাহিদা কমে গেছে।

সংকট বাড়িয়েছে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে (ডিপিএম) অনভিজ্ঞ কোম্পানিকে ক্রয়াদেশ দেওয়া। তারা আগস্টে চারটি কার্গো সরবরাহের কথা থাকলেও দিতে পারেনি।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে গরম তেমন কমবে না। এ সময় বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তি থাকবে। তাই এ দুই মাসে অন্তত ২০টি কার্গো আমদানি করতে হবে। না হলে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট কাটবে না।

দুটি উৎস থেকে দেশে এলএনজি আমদানি করা হয়। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির অধীনে এবং চাহিদা বুঝে খোলাবাজার থেকে কিনে। আমদানিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর চুক্তি থেকে এলএনজি আমদানি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। কাতার, ওমান ও মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেটের সঙ্গে চুক্তি আছে বাংলাদেশের। ওমান ও এক্সিলারেট কাতার থেকে নিয়েই বাংলাদেশকে এলএনজি সরবরাহ করে। এলএনজির বড় উৎস কাতার থেকে সরবরাহ কমায় বিশ্বে দামও বেড়েছে।

দেশে দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামলানো হয়েছে। গত ২১ জুলাই আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বন্ধ হলে গ্যাসের সংকট তীব্র হয়। গত ৭ আগস্ট টার্মিনাল থেকে আংশিক সরবরাহ শুরু হয়। এরপর ১৫ আগস্ট পুরো সরবরাহের জন্য টার্মিনালটি তৈরি হলেও পর্যাপ্ত কার্গো না আসায় সরবরাহ বাড়েনি।

পেট্রোবাংলার দুজন কর্মকর্তা বলেন, সেপ্টেম্বরে ১০টি এলএনজি কার্গো আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৮টি নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে ৪টি আসবে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির অধীনে। আর বাকি ৪টি দরপত্রের মাধ্যমে খোলাবাজার থেকে কেনা হয়েছে। এতে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম প্রায় ২২ ডলার থেকে সর্বোচ্চ ২৪ দশমিক ৬২ ডলার পর্যন্ত আছে। বাকি দুটি কার্গো কিনতে ডাকা দরপত্রের একটিতে গত সোমবার ২৬ ডলারের দর এসেছে, আরেকটিতে কোনো দর আসেনি। তাই ওই দুটি কার্গোর জন্য গতকাল আবারও দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

তেলের বিদ্যুতে খরচ কত

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বলছে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করা যাচ্ছে। লোডশেডিং কোনো কোনো দিন সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আছে ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু উৎপাদন করা যাচ্ছে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কম। দেশে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় কয়লা থেকে। বকেয়া বিলের কারণে কয়লা আমদানি ব্যাহত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কারিগরি ত্রুটি।

দেশে ৮টি কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা এখন প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট। গতকাল উৎপাদন হয়েছে ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের কম। পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬১২ সক্ষমতার একটি ইউনিটে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছে। মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬১২ সক্ষমতার একটি ইউনিট নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে গেছে। বড়পুকুরিয়া কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটে কারিগরি ত্রুটি আছে। এর বাইরে ভারতের ঝাড়খন্ডে নির্মিত আদানির কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা দেড় হাজার মেগাওয়াট।

৭ আগস্ট থেকে উৎপাদন কমিয়েছে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র। কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদন কমেছে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির। দিনের বেলায় ৯০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করলেও সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত সরবরাহ দিচ্ছে তারা।

ব্যয়বহুল বলে জ্বালানি তেলচালিত কেন্দ্র থেকে রাতের বেলা কয়েক ঘণ্টা সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত উৎপাদন করা হচ্ছে। দিনে এটি দুই হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে থাকছে। উৎপাদন ক্ষমতা আছে ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। তাই তেলচালিত কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ আছে।

পিডিবি সূত্র বলছে, এখন প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সবচেয়ে কম খরচ হয় গ্যাস থেকে। তবে বর্তমান দাম বিবেচনায় সবচেয়ে বেশি খরচ হয় এলএনজি থেকে। ফার্নেস তেলচালিত কেন্দ্র থেকে এখন প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হয় ২১ টাকা ৫১ পয়সা। আর এলএনজির দাম ২৪ ডলার ধরা হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হবে ২৩ টাকার বেশি। তবে এলএনজি আমদানিতে শুল্ক আছে সাড়ে ৯ শতাংশ। আর ফার্নেস তেল আমদানিতে শুল্ক-কর আছে সাড়ে ২৬ শতাংশ। তেলের মতো একই শুল্ক থাকলে এলএনজি থেকে উৎপাদন খরচ ১৭ টাকায় নেমে আসবে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকেরা বলছেন, তেলচালিত কেন্দ্রগুলো ৬০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন করলে শুল্ক হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পাওনা হবে মাসে প্রায় ১ হাজার ৯৬ কোটি টাকা। ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় ১ হাজার ২৭৯ কোটি টাকা ও ৮০ শতাংশ সক্ষমতায় ১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। সরকার চাইলে আপাতত ফার্নেস তেলের শুল্ক প্রত্যাহার করতে পারে। তাহলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ১৭ টাকায় নেমে আসবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া শোধেও ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে তারা তেল আমদানি করতে পারে।

তেলচালিত কেন্দ্রগুলো ৮০ শতাংশ সক্ষমতায় ব্যবহার করলে দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন বেড়ে যাবে। কয়লা থেকেও ১ হাজার মেগাওয়াট বাড়ানোর সুযোগ আছে।

বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, নভেম্বর থেকে শীত শুরু হলে সরকার অন্তত চার মাস স্বস্তিতে থাকবে। কিন্তু পরের গ্রীষ্মের জন্য এ সময়ে প্রস্তুতি নিতে হবে। মধ্যমেয়াদে সৌরবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানী এবং দীর্ঘ মেয়াদে দেশীয় গ্যাস উত্তোলনে জোর দিতে হবে।

জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, এলএনজির দাম অনেক বেশি, কেনাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তবু কিনতে হবে। তবে আগের মতো সরবরাহ করা সম্ভব না–ও হতে পারে, কিছু ঘাটতি থাকবে। অগ্রাধিকার চাহিদা বুঝে সরবরাহ করতে হবে। আর তেল ও কয়লাচালিত কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে।

Share