
গাজী আবু বকর : বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে গেছে। সরকারের একাধিক উচ্চপর্যায়ের সূত্র এ তথ্য নিশ্চিৎ করেছে।
ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে সাধারণত জোটের বাইরের নির্বাচিত দেশ ও আঞ্চলিক সংগঠনের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গত ১৪ জুলাই এ-সংক্রান্ত একটি কূটনৈতিক পত্র পাঠানো হয়।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষনিকভাবে এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করা না হলেও দিল্লিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, সাম্প্রতিক উত্তেজনা যেন দীর্ঘমেয়াদি সংকটে রূপ না নেয়, সে বিষয়ে দুই দেশই সতর্ক। সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখা এবং পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের উপায় নিয়েও কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে আগামীকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ঢাকায় ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর প্রথম সৌজন্য সাক্ষাৎ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে আজ রবিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গেও ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠকের কথা রয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রের ভাষ্য, এসব বৈঠকে সাম্প্রতিক উত্তেজনা, দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
গত বুধবার নয়াদিল্লিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ পাওয়ার পর ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে অসন্তোষ প্রকাশ করে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, শেখ হাসিনাকে গণমাধ্যমের সামনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবে নেয়নি।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, ওই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীরা বাংলাদেশ সরকার ও দেশের জনগণের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন।
তবে শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, ওই অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে বাংলাদেশের বৈধভাবে গঠিত সরকারের বিরুদ্ধে যেসব বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, ভারত সরকার সেগুলো অনুমোদন করে না।
ভারতের এই বক্তব্যকে ঢাকার কূটনৈতিক মহল কিছুটা ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, সাম্প্রতিক উত্তেজনা থাকলেও দুই দেশ সম্পর্ককে আরও অবনতির দিকে নিতে চায় না—ভারতের অবস্থান থেকে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে নতুন ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তবে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পর সেই ঘাটতি আরও স্পষ্ট হয়েছে। এখন দুই দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো উত্তেজনা কমিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সার্বভৌমত্ব ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ককে আবার স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনা।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ভারতকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, ভারত যদি শেখ হাসিনাকে দেশটিতে অবস্থান করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দেয়, তাহলে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়টি নতুন করে বিবেচনার প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
ভারতের কূটনীতি বিষয়ক সাংবাদিক সুহাসিনী হায়দারও সাম্প্রতিক উত্তেজনা কাটিয়ে সম্পর্ককে ইতিবাচক পথে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ অবস্থান তার নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয় হলেও বাংলাদেশ ও ভারতের উচিত বর্তমান উত্তেজনার ঊর্ধ্বে উঠে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দিকে মনোযোগ দেওয়া।
সব মিলিয়ে ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়লেও আগামী দিনের ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক কোন পথে এগোয়, তা নির্ভর করবে সাম্প্রতিক উত্তেজনা কতটা দ্রুত কূটনৈতিকভাবে সামাল দেওয়া যায় তার ওপর।
