রয়টার্সে সাক্ষাৎকার: ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করবেন শেখ হাসিনা

নয়াবার্তা ডেস্ক : জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ভারতে আশ্রিত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের চিন্তা করছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ৭৮ বছর বয়সী হাসিনা নিজের এ ভাবনার কথা জানিয়েছেন।

শুক্রবার (১০ জুলাই) প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা আগামী ডিসেম্বর নাগাদ দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনা করছেন। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ।

এছাড়া দলটির ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ।
বিতর্কিত ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০০৮ সালের নির্বাচনে জিতে সরকার গঠনের পর প্রায় দেড় দশক ক্ষমতা আঁকড়ে ছিলেন শেখ হাসিনা।

গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করে এত দীর্ঘ সময় রাষ্ট্র চালানোর সময় তার বিরুদ্ধে বিরোধীদের হত্যা, গুম, নির্বিচারে কারাবন্দি রাখা, নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ ওঠে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন দমনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ব্যাপক দমন-পীড়ন শুরু করলে তা সরকার পতন আন্দোলনে রূপ নেয়।

এক পর্যায়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে চলে যান। তার সঙ্গে পালান আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী এবং হাসিনার অনুগত পুলিশ-প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরাও।
পরে ওই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে সংঘটিত সহিংসতার তদন্ত শেষে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তুলে ধরা হয় এবং সেই সংঘাতে অনেক শিশু-কিশোরসহ প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়। এই দমন-পীড়নে খোদ শেখ হাসিনাই সমন্বয়কারীর ভূমিকায় ছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাসিনা জানান, তিনি ও তার দল আওয়ামী লীগের সদস্যরা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে যেতে চান। আদালতে আত্মসমর্পণ করে তারা দেখতে চান, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে তাদের কীভাবে মোকাবিলা করা হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনা দেশে ফেরার পর গ্রেপ্তার ও প্রাণহানির আশঙ্কা করে বলেন, ‘তবুও আমাকে যেতেই হবে।’ কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির নেতা-কর্মীরা চরম নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি।

যদিও সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে সংঘটিত অপরাধের সঙ্গে দল হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে এবং এ কারণে তদন্ত চলছে।

নির্বাসনের কারণে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপড়েন
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত দুই বছরের অস্থিরতা কাটিয়ে স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশের নতুন সরকার। এমন সময় শেখ হাসিনার ফেরার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও তীব্র করতে পারে। অন্যদিকে, এর মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে টানাপড়েনে থাকা সম্পর্কের উন্নতি হতে পারে। শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে ব্যাপক অবনতি হয়।

তার মধ্যেই শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দিতে বাংলাদেশ বারবার ভারতকে আহ্বান জানিয়ে আসছে।

শেখ হাসিনা নির্বাসনে থাকাকালীন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের লিখিত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। তবে এর আগে কোনো সাক্ষাৎকার দেননি। নির্বাসন থেকে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ফেরার সময় বা পদ্ধতি নিয়ে তিনি কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেননি।

এই প্রথম শেখ হাসিনা নিজের ফেরার এবং তিনি ও আওয়ামী লীগের অন্য নির্বাসিত নেতারা যে আত্মসমর্পণ করবেন, তা স্পষ্ট করেছেন। নির্বাসিত অন্য নেতাদের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। রয়টার্স অন্য দলীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বা তাদের অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি।

শেখ হাসিনা বলেন, ঢাকার কর্তৃপক্ষ ‘আমাকে ফিরিয়ে নিতে চায়, তারা বারবার ভারতকে চিঠি দিচ্ছে যেন আমাকে ফেরত পাঠানো হয়। আমি নিজেই ফিরে যাব।’

তবে তিনি কবে ফিরবেন বা কোথায় আত্মসমর্পণ করবেন, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ জানাতে রাজি হননি। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি ন্যায়বিচারে বিশ্বাসী এবং আমার ধারণা, বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে মানুষ বুঝতে পারবে আদালতটি কতটা প্রহসনের– এবং আমি তা প্রমাণ করতে চাই।’

এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা সাড়া দেননি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

তবে গত এপ্রিলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, তারা শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ যাচাই করছে। তারা বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করতে ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে চান।

ফেরার পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি ঢাকার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি। শেখ হাসিনা বলেন, ‘গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার– এগুলো গোপন আলোচনার বিষয় নয়।’

দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে শেখ হাসিনা বলেন, তার বাসভবনের দিকে জনতা এগিয়ে আসায় তার জীবনের প্রতি ‘হুমকি’ তৈরি হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন সরকার চালালে ভুল হতে পারে– কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু সরকারের ভালো-মন্দ, ঠিক-ভুল বিচার করার অধিকার জনগণের। আমি সেই বিচারের ভার জনগণের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি।’

আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসনের নেতাদের সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক করেছেন বলে জানান হাসিনা। তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে, আমি হয়ত নির্বাচনে লড়তে পারব না। কিন্তু আওয়ামী লীগকে কেন নিষিদ্ধ করা হবে? আমরা যদি খারাপ কাজ করে থাকি, তবে মানুষই সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিক।’

সূত্র: রয়টার্স

Share