সহায়তার নামে হরিলুট: ৮ কোটি টাকা বিতরণে ৫৩ কোটি ব্যয়

নয়াবার্তা প্রতিবেদক : জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘরবাড়ি হারানো অসহায় মানুষের ভাগ্য বদলের দোহাই দিয়ে আমলা ও পরামর্শকদের পকেট ভরার এক অভিনব ‘লুটপাটের’ প্রকল্প প্রস্তাব করেছিল সমাজসেবা অধিদপ্তর। তবে মাত্র ৮ কোটি টাকা সহায়তা বিতরণের বিপরীতে ৫৩ কোটি টাকা প্রশাসনিক ও পরামর্শক ব্যয়ের অস্বাভাবিক প্রস্তাব নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা ও তীব্র জনক্ষোভের মুখে অবশেষে বিতর্কিত এই প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান সরকার।

পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় এই প্রকল্পের অস্বাভাবিক ব্যয় কাঠামো নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তোলা হয় এবং শেষ পর্যন্ত এটি সম্পূর্ণ বাতিলের পক্ষে চূড়ান্ত মতামত দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দরিদ্র ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সহায়তার সাইনবোর্ড ব্যবহার করে প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থই সুকৌশলে আমলা ও পরামর্শকদের পকেটে ভরার যে চাতুর্যপূর্ণ ছক আঁকা হয়েছিল, সরকারের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে তা নস্যাৎ হয়ে গেল।

বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ‘অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নগর একীভূতকরণ সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ এবং স্বাগতিক সম্প্রদায়কে সহায়তা প্রদান (ইন্টিগ্রেট)’ শীর্ষক এই প্রকল্পের মোট বাজেট ধরা হয়েছিল ৬১ কোটি ২৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। জার্মান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জিআইজেড) অর্থায়নে ১ বছর ৯ মাস মেয়াদি এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জের উদ্বাস্তুদের স্বাবলম্বী করা।

কিন্তু নথিপত্র বলছে, প্রকৃত অভাবী মানুষের কপালে জুটত মাত্র ৮ কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজার টাকা, যা মোট বাজেটের মাত্র ১৩ দশমিক ২৩ শতাংশ। আর এই সামান্য টাকা বিতরণের নাম করে কর্মকর্তাদের ব্যবস্থাপনা খরচ, অফিস ভাড়া আর বিলাসিতাতেই উড়িয়ে দেওয়ার ছক ছিল বাকি ৫৩ কোটি ১৮ লাখ ৭৪ হাজার টাকা।

প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ৩০০ জন দরিদ্র মানুষের (২৭০ জন নারী ও ৩০ জন প্রতিবন্ধী) ক্ষুদ্র ব্যবসার ‘পরামর্শ’ দেওয়ার জন্য নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল ৪৭৩ জন দেশি-বিদেশি পরামর্শক! এই এক খাতেই খরচ ধরা হয়েছিল ২৯ কোটি ৬২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় অর্ধেক (৪৮.৩৩ শতাংশ)। অর্থাৎ, হতদরিদ্র মানুষরা যা অনুদান পেতেন, তার চেয়ে প্রায় ৪ গুণ বেশি টাকা ঢালতে চাওয়া হয়েছিল তথাকথিত পরামর্শকদের পেছনে।

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে সরকারের পক্ষ থেকে কৃচ্ছ্রসাধন এবং বিদেশ ভ্রমণে কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও আমলাদের বিদেশ ভ্রমণের ‘সাধ’ মেটাতে ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা খরচের প্রস্তাব করা হয়েছিল। এর বাইরে অভ্যন্তরীণ ভ্রমণের নামেই ওড়ানোর কথা ছিল আরও ১ কোটি ২৭ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।

এখানেই শেষ নয়, এই প্রকল্পে শুধু ব্যবস্থাপনা চার্জ হিসেবে রাখা হয়েছিল ১০ কোটি ৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা এবং বিলাসবহুল অফিস ভাড়ার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল ৩ কোটি ১৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এমনকি আইটি সামগ্রী ক্রয়ের ক্ষেত্রেও আকাশচুম্বী ভুয়া মূল্য ধরা হয়েছিল। লুটপাটের এই মহোৎসবে যুক্ত হয়েছিল চরম ধোঁয়াশা। কোন পদ্ধতিতে এই সুবিধাভাবী মানুষ বা প্রতিবন্ধীদের বাছাই করা হবে, তার কোনো স্বচ্ছ রূপরেখা দেওয়া হয়নি। এছাড়া প্রকল্পের কেনাকাটায় সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ-২০০৬) ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর-২০০৮) সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করা হয়েছিল।

পরিকল্পনা কমিশনের পিইসি সভায় এই হরিলুটের বাজেট নিয়ে তীব্র তোপের মুখে পড়ে সমাজসেবা অধিদপ্তর। তবে এই প্রকাশ্য অনিয়ম ও ব্যয়ের অস্বাভাবিকতা নিয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কোনো অনুশোচনা ছিল না। দায় এড়াতে তারা দাতা সংস্থা জিআইজেড-এর দোহাই দিয়ে বলছিলেন, দাতা সংস্থার শর্তের কারণেই পরামর্শক ও কর্মকর্তাদের পেছনে বিপুল ব্যয় ধরে এই প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছিল। তবে বর্তমান সরকার ও পরিকল্পনা কমিশন দরিদ্র মানুষের নামে এমন ‘নকশাকৃত লুটপাট’ ও আমলাতান্ত্রিক বিলাসিতার প্রস্তাবকে কঠোর হস্তে নাকচ করে দিয়ে প্রকল্পটির ফাইল চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছে।

Share