
নয়াবার্তা প্রতিবেদক : চলতি বছরের শুরুতে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় দেশে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৫ মার্চ থেকে নতুন করে হামের হিসাব রাখছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রতিদিন হাম সংক্রান্ত পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সংস্থাটি। সেখানে ‘সন্দেহজনক’ এবং ‘নিশ্চিত’ হাম দুটো ক্যাটাগরিতে আক্রান্ত ও মৃতের হিসাব দেওয়া হয়।
তবে জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, হামে মৃত্যুর ক্ষেত্রে ‘সন্দেহজনক’ শব্দ ব্যবহার অবৈজ্ঞানিক এবং ভুল। এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের নয়, বরং অনেকটা রাজনৈতিক ভাষা।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেছেন, হামে আক্রান্ত হলে রোগী হাম পরবর্তী সময়ে যেকোনো জটিলতা যেমন নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা শ্বাসকষ্ট হয়ে মারা যেতে পারে। হামের উপসর্গ নিয়ে যে শিশুরা মারা যাচ্ছে, তা সবই হাম বিবেচনা করতে হবে। নমুনা পরীক্ষা না করা হলে কৌশলগতভাবে ‘সম্ভাব্য’ হাম বলা যেতে পারে, তবে কোনোভাবেই ‘সন্দেহজনক মৃত্যু’ বলার সুযোগ নেই। এটা অবৈজ্ঞানিক এবং ভুল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হয় না জেনে অথবা নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা করার জন্য এমন একটি শব্দ বেছে নিয়েছে।
দেশ এখনো হাম মহামারীর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং হার্ড ইমুইনিটি তৈরি হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলছেন, যখন মহামারী চলে তখন হামের লক্ষণ নিয়ে মারা যাওয়া প্রত্যেকটি মানুষের নমুনা পরীক্ষা করার দরকার হয় না। সরকার পরীক্ষা না করে ঠিক কাজই করছে। তাছাড়া এতো রোগীর পরীক্ষা করার সক্ষমতা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেই।
নাম না প্রকাশের শর্তে চার দশক ধরে জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছেন এমন একজন বিশেষজ্ঞ বলছেন, ‘সন্দেহজনক হামে মৃত্যু’ হচ্ছে রাজনৈতিক ভাষা। জনগণের সামনে হামে মৃত্যুর সংখ্যা কম দেখানোর জন্য এমন শব্দের ব্যবহার হতে পারে। আবার অনুবাদজনিত গণ্ডগোলও হতে পারে। তবে ভুল হলেও গত ৫ মাস ধরে ভুলটি চলতে থাকা অপ্রত্যাশিত। সঠিক তথ্য দেওয়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দায়িত্ব।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) মো. জাহিদ রায়হানের স্বাক্ষর থাকে। এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) জিয়াউদ্দিন হায়দার আগামীর সময়কে বলেছেন, হামে মৃত্যুর ক্ষেত্রে ‘সন্দেহজনক’ শব্দটি ব্যবহার সঠিক নয়।
হাম থামছে না
টিকা পেলে যে রোগে কেউ মারা যাওয়ার কথা নয়, সে রোগে রোজই কয়েকটি প্রাণ চলে যাচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় (২১ জুলাই সকাল ৮টা -২২ জুলাই সকাল ৮টা) হামে আক্রান্ত হয়ে ৬ জন মারা গেছে। এরমধ্যে ঢাকা বিভাগে ৪ জন, সিলেট বিভাগে ২ জন। এ নিয়ে মার্চ থেকে হামে মৃত্যু দাঁড়াল ৮০০ তে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী বলছেন, দেশে প্রতিবছর গড়ে ৩২-৩৪ লাখ শিশুর জন্ম হয়। আগে টিকার ক্যাম্পেইন না হওয়ায় এবং সাম্প্রতিক ক্যাম্পেইনে টিকার কাভারেজ কম হওয়ায় ১ থেকে দেড় কোটি শিশু টিকার বাইরে রয়ে গেছে। যারা হামের সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে।
গেল ২৪ ঘণ্টায় হামে ১০৩৭ জন হামে আক্রান্ত হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৪৫ হাজার ১৯৩ জন। আক্রান্তের সংখ্যা ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি, ৫৪ হাজার ৭২ জন।
হাম থামাতে টিকার বিকল্প নেই উল্লেখ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী বলছেন, টিকার পরিধি বাড়াতে হবে। তা না হলে মৃত্যু থাকবে না। অথচ হামে একটি মৃত্যুও কাম্য নয়।
