রোমানদের তৈরি রাস্তা যে কারণে আজও মহাসড়কের ভিত্তি


নয়াবার্তা ডেস্ক : রোমান সাম্রাজ্যের বড় সড়ক নেটওয়ার্ক বা প্রাচীন অবকাঠামো কেবল যোগাযোগের মাধ্যমই ছিল না, বরং মহাদেশ জুড়ে সভ্যতা ও বাণিজ্যের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।

প্রাচীন রোমের প্রথম সম্রাট অগাস্টাস খ্রিস্টপূর্ব ২০ অব্দে রোমান ফোরামে ‘মিলিয়ারিয়াম অউরেয়াম’ বা ‘গোল্ডেন মাইলস্টোন’ নামের এক সোনালি স্তম্ভ স্থাপন করেছিলেন, যা বিশাল সাম্রাজ্যের সব সড়কের প্রতীকী সূচনাবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হত। বাস্তবেও এসব সড়ক ছিল বিশ্বের প্রথম মহাদেশীয় আকৃতির পরিবহন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি।

সম্প্রতি গবেষকরা এ সাম্রাজ্যের সড়ক নেটওয়ার্ক নিয়ে বিস্তারিত কাঠামোগত বিশ্লেষণ চালিয়েছেন। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা জুড়ে বিস্তৃত প্রায় ৩ লাখ কিলোমিটার পথ নিয়ে করা গবেষণাটির কথা প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।

মঙ্গলবার গবেষাণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার কমিউনিকেশন্স’-এ।

এ গবেষণার সহ-প্রধান ডেনমার্কের ‘আরহুস ইউনিভার্সিটি’র ক্লাসিক্যাল আর্কিওলজিস্ট টম ব্রুগম্যানস বলেছেন, “এই অবকাঠামোর কারণে বড় অঞ্চল আরও সুসংহত হয়ে ওঠে, যেখানে এ রাস্তা মানুষ, প্রাণী, জীবাণু, পণ্য ও ধারণা ছড়িয়ে পড়ার জন্য মহাদেশের সমান একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছিল।”

গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রচলিত প্রবাদ ‘সব সড়ক রোমে যায় না’ কথাটি পুরোপুরি সত্য নয়। কারণ, সাম্রাজ্যের পরবর্তী রাজকীয় রাজধানী কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) এ প্রবাদের সঙ্গে বেশি মানানসই।

রোমানরা সোজা রাস্তা তৈরি করতে পছন্দ করলেও কঠিন ভূপ্রকৃতি মাঝেমধ্যে সেই লক্ষ্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াত। প্রাচীন রোমান সড়কগুলোর সঙ্গে আধুনিক বিভিন্ন মহাসড়কের পারস্পরিক মিলও খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা।

মরক্কো ও আরবীয় মরুভূমি থেকে শুরু করে স্কটল্যান্ড ও আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এসব সড়ক নদী ও সমুদ্রপথের সঙ্গে যোগ হয়ে পূর্ণাঙ্গ পরিবহন জালে রূপ নিয়েছিল।

ব্রুগম্যানস বলেছেন, “রোমান সৈন্যরা হুমকি ঠেকাতে, সহকর্মীদের সহায়তা দিতে ও নতুন অঞ্চল উপনিবেশের জন্য এসব রাস্তা দিয়ে মার্চ করত। স্থল ও জলপথ ধরে মানুষের হাত ধরেই খ্রিস্টধর্মের মতো নতুন বিপ্লবী ধারণাগুলো ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে রাস্তাগুলো সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হত খামার ও মাঠের মধ্যে নিয়মিত যাতায়াত বা স্থানীয় বাজারে কৃষিপণ্য বিক্রির জন্য।”

রোমানদের তৈরি কিছু রাস্তা ছিল টেকসই, যা চূর্ণ পাথর, চুন সিমেন্ট, নুড়ি পাথর ও পেভিং স্টোন বা বাঁধানো পাথরের সমন্বয়ে নির্মিত হয়েছিল। ওই সময় যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে প্রধানত মানুষ পায়ে হেঁটে বা ঘোড়া, গাধা, খচ্চর এবং উটের পিঠে চড়ে যাতায়াত করত। পাশাপাশি ছিল মালবাহী পশু এবং পশুটানা গাড়ি।

রোম থেকে রাস্তার দূরত্ব মাপা হত ‘মিলিয়ারিয়াম অউরেয়াম’ থেকে। তবে এ প্রাচীন মহানগরী কি সত্যিই নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দু ছিল?

এ প্রশ্নের জবাবে ব্রুগম্যানস বলেছেন, “সব সড়ক রোমে যায় না!- বিষয়টি আসলে তা নয়। রোম ভূমধ্যসাগরীয় নৌপরিবহনের জন্য কেন্দ্রীয় অবস্থানে থাকলেও রোমান সড়ক ব্যবস্থার ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল না।

“আমরা দেখেছি, বিভিন্ন প্রদেশের রাস্তাগুলোর এমন জায়গায় চমৎকারভাবে তাদের প্রাদেশিক রাজধানী অবস্থিত ছিল, যা কার্যকর প্রাদেশিক প্রশাসন ও কর আদায়কে সহজ করেছিল।”

আঙ্কারা, লন্ডন ও করিন্থের মতো শহরগুলো ছিল এমনই কিছু প্রাদেশিক রাজধানী।

“ইতালির তিরানিয়ান উপকূলের বিভিন্ন রাস্তার ক্ষেত্রে রোম কেন্দ্রীয় অবস্থানে ছিল। তবে যখন আমরা সমগ্র ইতালীয় উপদ্বীপের চলাচল বিবেচনা করি তখন আমরা অবাক হয়ে আবিষ্কার করি যে, সবচেয়ে বড় রাস্তাটি আসলে এর বিপরীত দিকের অ্যাড্রিয়াটিক উপকূল ধরে গিয়ে রোমকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছে।

রোমান সাম্রাজ্যের নতুন রাজধানী

চতুর্থ শতকের শুরুতে রোমান সম্রাট কনস্টান্টিন সাম্রাজ্যের রাজধানী স্থানান্তরিত করেন কনস্টান্টিনোপলে। নতুন এ রাজধানী এমন এক কৌশলগত স্থানে গড়ে উঠেছিল, যেখানে ইউরোপ ও এশিয়া মিলিত হয়েছে।

ব্রুগম্যানস বলেছেন, “নতুন রাজধানীটি এমন এক জায়গায় অবস্থিত ছিল, যেখানে ইউরোপ ও এশিয়া মিলিত হয়েছে এবং আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, এটা সাম্রাজ্যজুড়ে স্থলপথের যাতায়াতের জন্য রোমের চেয়েও বেশি কেন্দ্রীয় অবস্থানে ছিল।

রাজধানীটি বসফরাস প্রণালীতে অবস্থিত ও প্রাচীনকালেই এ প্রণালী পারাপারের জন্য ফেরির ব্যবহারের কথা জানা যায়, যা ইউরোপীয় ও এশীয় সড়ক পথকে যুক্ত করেছিল।

রোমান প্রকৌশলীরা রাস্তাগুলো যতটা সম্ভব সোজা করার জন্য বিভিন্ন সরঞ্জাম ও কৌশল ব্যবহার করতেন, যার একটি হল রোমের দক্ষিণ দিকের ‘ভিয়া আপ্পিয়া’।

ব্রুগম্যানস বলেছেন, “রোমানদেরও প্রকৃতির কাছে নতি স্বীকার করতে হয়েছিল। আমরা দেখেছি, রোমান সড়কগুলো কেবল তখনই সোজা হত যখন স্থানীয় ভূপ্রকৃতি এর অনুমতি দিত, যেমন বেলজিয়াম, উত্তর ফ্রান্স বা ইতালির পো উপত্যকার সমতল অঞ্চলগুলোতে। মোটের ওপর, তারা কেবল একটি রাস্তা তৈরি করার জন্য পাহাড় টপকে যায়নি।”

পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে ও পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য (যা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য নামেও পরিচিত) ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে পতন হওয়ার পরও এসব প্রাচীন সড়কের বহুলাংশে ব্যবহার অব্যাহত ছিল। এসব প্রাচীন সড়ক দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে শত কোটি মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা করেছিল।

‘অটোনমাস ইউনিভার্সিটি বার্সেলোনা’র পোস্টডক্টরাল ফেলো ও এ গবেষণার সহ-গবেষক অ্যাডাম পাজৌত বলেছেন, “ব্রিটেন থেকে শুরু করে নিকট প্রাচ্য পর্যন্ত অনেক অঞ্চলেই রোমান সড়ক নেটওয়ার্কের এ স্থায়িত্ব প্রমাণ করা সম্ভব।

“এসব সড়ক অনেক জায়গায় মধ্যযুগ জুড়ে, ১৯ শতকে রেলওয়ে ও ২০ শতকে আধুনিক মহাসড়ক গড়ে ওঠার আগ পর্যন্ত প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে।”

বর্তমানের অনেক আধুনিক মহাসড়কও প্রাচীন রোমান সড়কগুলোর পথ অনুসরণ করেছে।

ব্রুগম্যানস বলেছেন, “ভিয়া অগাস্টা স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলের ক্যাডিজ থেকে পিরানিস পর্যন্ত বিস্তৃত। রাস্তাটি তারাগোনা ও বার্সেলোনার মধ্যবর্তী ‘আর্ক দে বেরা’ নামের এক বিজয় মেহরাবের নিচ দিয়ে চলে গেছে, যেখানে খুব স্পষ্টভাবেই দেখা যায়, এর পথ ঠিক আধুনিক এন-৩৪০ মোটরওয়ের মতো।”

Share