
নয়াবার্তা প্রতিবেদক : জামায়াত ইসলামীর নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে শুক্রবার গ্রেপ্তারের পর আজ শনিবার নেওয়া হয় চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে।
প্রিজন ভ্যান থেকে নামার সময় হেলমেট ছুড়ে ফেলা, আদালতে শুনানিতে বিচারককে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য, আদালতের সামনে স্লোগান দেওয়া ইত্যাদির মাধ্যমে আবারও আলোচনা তৈরি করেন আখতারুজ্জামান।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেছেন, আখতারুজ্জামান আদালতকে হেয় করে বক্তব্য দিয়েছেন এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। অবশ্য আখতারুজ্জামানের পক্ষে শুনানি করা আইনজীবীর দাবি, তিনি আদালতে সুন্দর বক্তব্য দিয়েছেন।
হেলমেট ছুড়ে ফেলা
ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি–সংকটকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে গত শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্টের ডিওএইচএসের বাসা থেকে আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।
আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ‘আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা’, ‘ঘাড় ধরে বের করে দিবো’ বলে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছেন তিনি।
আখতারুজ্জামানকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে শনিবার আদালতে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিমানবন্দর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাজেদুল ইসলাম। অন্যদিকে তাঁর আইনজীবীরা জামিন চেয়ে আবেদন করেন।
শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার কিছু পরে আখতারুজ্জামানকে প্রিজন ভ্যানে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের সামনে নেওয়া হয়। তখন প্রিজন ভ্যান থেকেই সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের মিস ম্যানেজমেন্ট আর চলতে পারে না। এভাবে রাষ্ট্র চলতে পারে না। এ রকম অবস্থায় কোনো সরকার টিকে থাকতে পারে না।’
আখতারুজ্জামান যখন নানা কথা বলছিলেন, তখন একজন পুলিশ সদস্য প্রিজন ভ্যানে প্রবেশ করেন। তিনি আখতারুজ্জামানের হাত ধরে বের করতে গিয়েছিলেন। বলছিলেন, ‘স্যার, এদিকে আসেন, প্লিজ এদিকে আসেন’। তখন তাঁকে উদ্দেশ করে আখতারুজ্জামান উচ্চস্বরে বলেন, ‘হাত ধরবেন না, সাবধান’, “ডোন্ট টাচ মি”’, যা বলবেন মুখে বলবেন।’
প্রিজন ভ্যানের ভেতরে আখতারুজ্জামানের হাতে হাতকড়া ও মাথায় হেলমেট পরান পুলিশ সদস্যরা। প্রিজন ভ্যানের দরজা থেকে বের হওয়ার সময় আখতারুজ্জামান মাথা থেকে হেলমেট খুলে ছুড়ে ফেলেন। ওই সময় তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি আওয়ামী লীগের না।’
আখতারুজ্জামানকে মাথায় হেলমেট ছাড়াই আদালতে নেওয়া হয়। এজলাসে ওঠানোর সময় তিনি ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ , ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলে স্লোগান দেন। বাইরে তখন জামায়াতের নেতা–কর্মীরা ‘নারায়ে তাকবির’ বলে স্লোগান দিচ্ছিলেন।
পুলিশের কড়া নিরাপত্তার মধ্যে আখতারুজ্জামানকে লিফটে আদালত ভবনের ৮ তলায় নেওয়া হয়। শুনানি চলাকালে আদালতে কোনো সাংবাদিককে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংশ্লিষ্ট আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শুনানিতে কী হলো
আখতারুজ্জামানের রিমান্ড আবেদনের শুনানি হয় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীরের আদালতে। শুনানিতে কী কী হয়েছে, তা বলেন পিপি ওমর ফারুক ফারুকী।
তিনি বলেন, আখতারুজ্জামান আদালতে আসার শুরুতেই পুলিশের প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং পুলিশসহ আদালতে উপস্থিত সবাইকে বের করে দিতে বলেন। তিনি পুলিশ, সাংবাদিকসহ কাউকেই আদালতে রাখতে চাননি এবং আদালত ও প্রসিকিউশন পক্ষের প্রতি বিরূপ ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন।
পিপি বলেন, শুনানি চলাকালে আখতারুজ্জামান বিচারককে হেয় করে বলেন, রায় দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর নেই। পিপি আরও বলেন, আদালতে আখতারুজ্জামান দাবি করেন তিনি বিমানবন্দরে একটি নির্দিষ্ট ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। তখন আদালত তাঁকে বলেন, প্রতিবাদ করা তাঁর অধিকার। তবে প্রতিবাদের ভাষা সংযত হতে হবে এবং প্রতিবাদ করতে গিয়ে কাউকে আঘাত করা যাবে না।
আদালতের এই জবাবে আখতারুজ্জামান আরও আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন বলে দাবি করে পিপি বলেন, আদালত তাঁকে শান্ত হতে বলছিলেন। তবুও তিনি বারবার বলতে থাকেন যে তিনি এভাবেই চলবেন, দেখে নেবেন কে কী করে।
আদালতের ভেতরে শুনানিতে কী কী হয়েছে, তা জানতে আখতারুজ্জামানের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেওয়া আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাকের কাছে গেলে তিনি বলেন, শুনানিতে আখতারুজ্জামান সুন্দর বক্তব্য দিয়েছেন।
পিপির দাবি নিয়ে পরে মুঠোফোনে জানতে চাইলে আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এই ধরনের কোনো বক্তব্যই আখতারুজ্জামান দেননি। হেয়প্রতিপন্ন করেননি। বরং পিপি নিজেই আখতারুজ্জামানকে হেয় করে বক্তব্য দিয়েছেন।
আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এই মামলা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্য এই মামলা করা হয়েছে। এটা জামিনযোগ্য মামলা।
বের হওয়ার সময় কী ঘটল
শুনানি শেষে ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীর আখতারুজ্জামানের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
তখন আবারও পুলিশের কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আদালত ভবনের অষ্টম তলা থেকে নামানো হয় আখতারুজ্জামানকে। সে সময় তাঁর মাথায় হেলমেট ও হাতে হাতকড়া পরানো ছিল।
কেন হেলমেট পরলেন, জানতে চাইলে আখতারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, পুলিশ জোর করে হাতকড়া ও হেলমেট পরিয়েছে। উল্লেখ্য, আদালতের কাঠগড়ায় আসামির হাতকড়া খুলে দেওয়া হয়।
আখতারুজ্জামান কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে টানা দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিত ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে আখতারুজ্জামান ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নৌকার প্রার্থীর কাছে হেরে যান। ‘ডামি ভোট’ নামে পরিচিত ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে পরাজিত হন।
আখতারুজ্জামান একসময় কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। দলীয় শৃঙ্খলাপরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০২২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তাঁকে পঞ্চমবারের মতো বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গত ১৩ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন।
আদালত প্রাঙ্গণে শনিবার আখতারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাষ্ট্রকে সঠিক পথে চালানোর জন্য, মানুষের অধিকার বাস্তবায়ন করার জন্য, আমাদের নতুন করে সংগ্রামে নামতে হবে। ইনশা আল্লাহ জামায়াতে ইসলামী সেই সংগ্রাম অব্যাহত রাখবে।’
এদিকে জামায়াতের সমালোচনা করে এবং জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করে অতীতে আখতারুজ্জামানের দেওয়া বক্তব্য ‘ভাইরাল’ (ছড়িয়ে পড়া) হয়েছে।
