
নয়াবার্তা প্রতিবেদক : ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর ধানমণ্ডির ছায়ানট ভবনে সন্জীদা খাতুনের প্রতিকৃতি ছিঁড়ে ফেলে দুর্বৃত্তরা
২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর। সেদিন সন্ধ্যায় রাজধানীর পরিস্থিতি অস্থির ও আতঙ্কময় হয়ে ওঠে।
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামতেই একদল সুযোগসন্ধানী মানুষ হামলা চালায় বাঙালি সংস্কৃতিচর্চার ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ছায়ানট ভবনে। এর আগে দুর্বৃত্তের গুলিতে জখম ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদি ওই দিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে।
ত্রিশাল : কবি কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘অঞ্জলি লহ মোর’ ভাস্কর্যটি ২০২৫ সালের জুনে ভেঙে ফেলা হয়। অনুসন্ধান ও সংগৃহীত বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সেদিন রাতে কয়েক শ মানুষ হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে ধানমণ্ডির ছায়ানট ভবনে। তাদের বেশির ভাগের মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা ছিল।
কারো কারো মাথায় ছিল হেলমেট। বেশির ভাগের হাতে ছিল লাঠিসোঁটাসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র। ছায়ানটের ছয়তলা ভবনের বিভিন্ন তলায় ঢুকে ঢুকে প্রতিটি কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় তারা। একটি দল ভাঙচুরে লিপ্ত থাকে; অন্য দল লুটপাটে অংশ নেয়। পরে ছায়ানট ভবনের সামনে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। পরের দিন ১৯ ডিসেম্বর ভাঙচুর ও অগ্নিসন্ত্রাসে তছনছ করা হয় দেশের আরেক ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ও।
শুধু ছায়ানট কিংবা উদীচী নয়, শান্তিতে নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনামলে দেশের বেশির ভাগ শিল্প-সংস্কৃতির সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে আক্রান্ত হয়েছে। হামলা-ভাঙচুরের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধান ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকেই শুরু হয় পরিকল্পিত আক্রমণ।
৫ থেকে ২০ আগস্ট দেশের বেশির ভাগ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়। সে বছরের ৮ আগস্ট প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করলে সবাই আশা করেছিল, পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের অবাধ মহোৎসব দেখে মনে হয়েছে, দেশ আরেক অন্ধকার যুগে পড়ে গেছে। ইউনূস জামানায় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে সিনেমা হল, পাঠাগার, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক, স্মৃতিচিহ্ন, জাদুঘর, ভাস্কর্য, ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের বাড়ি ও স্মৃতিস্মারকে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনে গভীর ক্ষত, অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।
নাট্যজন মামুনুর রশীদ বলেন, ‘ইউনূসের শাসনামলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে বর্বরোচিত হামলা হয়েছে। এসব হামলাকে পরিকল্পিত আক্রমণ মনে করি। এসব শুধু স্থাপনার ওপর নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপরও আঘাত। দেশের শিল্প-সংস্কৃতির প্রতীকগুলোকে পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।’
ভাঙচুর, লুটপাট ও আগুনে ছারখার ছায়ানট
গাছগাছালিতে ঘেরা বড়সড় লাল ইটের ভবন। রাজধানীর ধানমণ্ডির শঙ্কর বাসস্ট্যান্ডের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা এই ভবন আসলে সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য যেন এক তীর্থস্থান। সারা দিন এই ভবনে শিশু থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ—বয়সের ও শ্রেণির সংস্কৃতিপ্রেমীর পদচারণ চলে। এটিই বাঙালি সংস্কৃতির ছায়াবৃক্ষ—ছায়ানট। কাগজে-কলমে এর নাম ‘ছায়ানট সংস্কৃতি ভবন’। ইউনূস জামানায় পরিকল্পিত তাণ্ডবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এই ভবন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাত ১টার পর ধানমণ্ডির শঙ্কর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনের সামনে জড়ো হতে থাকে একদল সন্ত্রাসী। পরে তারা ভবনে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, কয়েক শ মানুষ দলে দলে ভবনের ভেতরে ঢুকে বিভিন্ন তলায় হামলা চালায়। ভেঙে ফেলা হয় ছায়ানটের নামফলক, ভেতরের প্রতিটি কক্ষের আসবাব। নিচতলা থেকে শুরু করে ওপরের তলাগুলো পর্যন্ত চলে নারকীয় তাণ্ডব।
ভিডিওতে দেখা যায়, হামলাকারীরা মিলনায়তন, শ্রেণিকক্ষ, অফিসকক্ষ ও সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের কক্ষগুলোতে ব্যাপক ভাঙচুর করে। মনিটরিং সিস্টেম, লাইট, ফ্যান, কম্পিউটার, আসবাব তছনছ করে। মাটির তৈরি চারুকর্ম ও শিল্পকর্ম ভেঙে ফেলা হয়। বিভিন্ন কক্ষে থাকা কাগজপত্র ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়।
ছয়তলা ভবনটির প্রতিটি তলায় হামলার চিহ্ন পাওয়া যায়। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কক্ষও রক্ষা পায়নি। আলমারির কাচ ভেঙে ফেলা হয়, চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করা হয়, জানালা ও ফ্যানও ভাঙচুর করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য ও ভিডিও ফুটেজ থেকে দেখা যায়, হামলাকারীদের অনেকেই মুখ কাপড়ে ঢেকে ও হেলমেট পরে এসেছিল। ভবনের বিভিন্ন তলায় ভাঙচুর শেষে তারা সামনের অংশে আগুন ধরিয়ে দেয়। হামলার সময় কয়েকজনকে বলতে শোনা যায়, ‘বাংলাদেশে ভারতীয় সংস্কৃতি চর্চার কোনো জায়গা নেই।’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে এমন মন্তব্য শোনা যায়।
ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী লাইসা আহমেদ লিসা বলেন, ‘ছায়ানট ভবনে সকালে এসে দেখি, যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি ভবন। ছয়তলার সার্ভাররুম পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি কক্ষ, মিলনায়তন, ক্লাসরুম—সবকিছু তছনছ করা হয়।’
তিনি এই ঘটনাকে ‘বর্বরোচিত হামলা’ উল্লেখ করে বলেন, ‘আমাদের ধারণা, এটি সংস্কৃতিবিরোধী একটি চক্রের কাজ। হামলার ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। আমরা আশা করি, তদন্তের মাধ্যমে হামলাকারী ও পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করা হবে। পাশাপাশি হামলাকারী ও পরিকল্পনাকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হবে।’
ছায়ানটের প্রধান ব্যবস্থাপক দুলাল ঘোষ বলেন, ‘ছয়তলা ভবনের প্রতিটি তলায়ই ভাঙচুর করা হয়েছে। প্রতিটি তলার সিসি ক্যামেরা, কম্পিউটার, আসবাব ও বাদ্যযন্ত্র তছনছ করা হয়েছে। কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম লুটপাট হয়েছে। হারমোনিয়াম, তবলা, সেতার, তানপুরাসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ভেঙে ফেলা হয়েছে, কিছু লুটপাট করা হয়েছে।’
বাঙালির সংস্কৃতি, ভাষা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করে ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ছায়ানট। এর আগেও সংগঠনটি হামলার শিকার হয়েছে। ২০০১ সালে রমনা বটমূলে বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠানে ভয়াবহ বোমা হামলায় প্রাণ হারায় ১০ জন। আহত হয় অসংখ্য মানুষ। দুই দশক পর আবারও হামলার মুখে পড়ে দেশের এই ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান।
আগুনে পুড়ল উদীচীর ৫৭ বছরের ইতিহাস
ছায়ানটে হামলার এক দিন পরই রাজধানীর তোপখানা সড়কে অবস্থিত সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ২০২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৭টা ৩৯ মিনিটের দিকে শুরু হওয়া এই হামলায় পুড়ে যায় সংগঠনটির বহু বছরের সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও গুরুত্বপূর্ণ আর্কাইভ।
সংগৃহীত একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হামলার আগে একদল যুবক লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ভবনের ভেতরে ঢুকছে। তাদের অনেকের মুখ স্পষ্ট দেখা যায় ভিডিওতে। কিছুক্ষণ পরই ভবনের দোতলা থেকে আগুনের শিখা বের হতে দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, আগুন দেওয়ার আগে পুরো কার্যালয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। পরে বিভিন্ন কক্ষে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় রাত ৯টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
পাঁচতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় ছিল উদীচীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়। সেখানে সংরক্ষিত ছিল কয়েক হাজার বই, গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক নথিপত্র, পোস্টার, ব্যানার, কম্পিউটার ও আর্কাইভ। ছিল নাটকের ১০টি পূর্ণাঙ্গ সেট, যেগুলো তৈরি করতে লেগেছিল দীর্ঘ সময় ও শ্রম। আগুনে সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
উদীচীর ৫৭ বছরের সাংগঠনিক ইতিহাসও ছিল এই কার্যালয়ে সংরক্ষিত। কার্যনির্বাহী কমিটির সভার রেজল্যুশন, আন্দোলন-সংগ্রামের দলিল, সাংস্কৃতিক কর্মসূচির নথি—সবই আগুনে ধ্বংস হয়ে যায়।
উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর একাংশের সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন বলেন, ‘সেদিন আগুন লাগার খবর পেয়েই আমি ঘটনাস্থলে যাই। তখনো আগুন জ্বলছিল। পরে ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।’
নিপীড়িত মানুষের পক্ষে সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৬৮ সালের ২৯ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। দেশের প্রায় সব জেলায় সংগঠনটির শাখা ও কার্যক্রম রয়েছে। ইউনূসের জামানায় বিভিন্ন জেলায় উদীচীর শাখা কার্যালয়েও হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে বলে সংগঠনটির নেতারা জানিয়েছেন।
হামলা হয় সরকারি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানেও
ছাত্র-জনতার এক দফার আন্দোলনের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেদিন দেশ ত্যাগ করেন, সেই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুর থেকেই সরকারি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর শুরু হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই বছরের ৫ আগস্ট থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট হয়। এ সময় ২২টি জেলায় শিল্পকলা একাডেমির স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও চুরির ঘটনা ঘটে।
রাজধানীর শিশু একাডেমিতে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি বিভিন্ন জেলায় শিশু একাডেমির শাখাও আক্রান্ত হয়। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প থাকায় বড় ধরনের হামলা থেকে রক্ষা পেলেও দেশের বিভিন্ন জেলার শিল্পকলা একাডেমিগুলো সহিংসতার শিকার হয়েছে। ভয়াবহ হামলা করা হয় ঝিনাইদহ জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে। শহরের ক্যাসল সেতুর কাছে অবস্থিত তিনতলা ভবনটিতে হামলাকারীরা ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। জেলা কালচারাল অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. জসিম উদ্দিন জানান, ৪৫০ আসনের মিলনায়তন, মহড়াকক্ষ, কন্ট্রোলরুম, মঞ্চ, দর্শক গ্যালারিসহ বিভিন্ন স্থাপনা পুড়িয়ে দেওয়া হয়। আসবাব ও সরঞ্জামও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চাঁদপুর জেলা শিল্পকলা, সাতক্ষীরা শিল্পকলা একাডেমি, সিরাজগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমিতেও হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। হামলা হয়েছে ময়মনসিংহ, লক্ষ্মীপুর, শেরপুর ও নওগাঁর শিল্পকলা একাডেমিতেও। নওগাঁর পত্নীতলা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কমপ্লেক্সে, জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি এবং মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা শিল্পকলা একাডেমিতে কয়েক দফা হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। বরগুনা, সুনামগঞ্জ, রংপুর, খুলনা, মানিকগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, টাঙ্গাইলসহ আরো বিভিন্ন জেলা শিল্পকলা একাডেমির কার্যালয় আক্রান্ত হয়।
রাজধানীর দোয়েল চত্বরসংলগ্ন জাতীয় শিশু একাডেমি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভয়াবহ হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। প্রশাসনিক ভবন, জাদুঘর, পাঠাগার, প্রশিক্ষণকেন্দ্র, প্রকাশনা বিভাগ—কোনো কিছুই রক্ষা পায়নি দুর্বৃত্তদের তাণ্ডব থেকে। ভাঙচুর করা হয় শিশু একাডেমির গাড়ি, ভাস্কর্য ও বিভিন্ন স্থাপনা। পরে একাধিক কক্ষে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলায় শিশু একাডেমির শাখা কার্যালয়েও হামলার ঘটনা ঘটে।
শিল্পকলা একাডেমি ও শিশু একাডেমির বিভিন্ন শাখায় হামলা-ভাঙচুর হলে গতিশীলতা হারায় সরকারি দুটি প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম। তবে ইউনূস জামানায় দেড় বছরেও ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান মেরামত বা পুনর্নির্মাণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি চরম অবহেলা দেখায় প্রশাসন।
জাদুঘর, ভাস্কর্য, ম্যুরাল ভাঙচুর
সুনামগঞ্জে ২০২৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বিশ্বম্ভরপুরে ‘কৃষান চত্বর’ ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলে দুর্বৃত্তরা। তিন রাস্তার মোড়ে একজন কৃষক হাতে কাস্তে এবং কাঁধে লাঙল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। এর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘কৃষাণ চত্বর’। গ্রামবাংলার কৃষি ও কৃষকের ঐতিহ্য তুলে ধরতেই সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুরে নির্মাণ করা হয়েছিল ভাস্কর্যটি। ২০২৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি রাতে এই ভাস্কর্য ভেঙে ফেলে একদল সন্ত্রাসী।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ওই ভাস্কর্য ভাঙার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন লোক হাতুড়ি দিয়ে ভাস্কর্যটি ভাঙছে। এ সময় পেছন থেকে স্লোগান দিতে বলা হয়।
২০২৪ সালের ৫ থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত অসংখ্য ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এ সময় দেড় হাজারেরও বেশি ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে বিভাগীয় শহর, জেলা ও উপজেলা—সবখানেই হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো। কোথাও আগুন দেওয়া হয়েছে, কোথাও হাতুড়ি-শাবল দিয়ে গুঁড়িয়ে ফেলা হয়েছে, আবার কোথাও পুরো স্থাপনা উপড়ে ফেলা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও থামেনি ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভে হামলা ও ভাঙচুর। সারা দেশেই মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য, দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে নির্মিত ম্যুরালে হামলা করা হয়েছে।
ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত নান্দনিক ভাস্কর্য ‘অঞ্জলি লহ মোর’ প্রশাসনিক নির্দেশে ভেঙে ফেলা হয়। এটি ২০২৫ সালের জুন মাসের ঘটনা। ম্যুরাল ভাঙচুরের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সংস্কৃতিমহল তীব্র প্রতিবাদ জানায়।
বরগুনায় নির্মিত দেশের একমাত্র নৌকা জাদুঘরটি পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। ২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সকালে প্রকাশ্যে এটি ভেঙে ফেলা হয়। বরগুনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সংলগ্ন ৭৮ শতাংশ জায়গায় ১৬৫ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ৩০ ফুট প্রস্থের একটি বৃহদাকার নৌকার আদলে জাদুঘরটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এতে স্থান পায় বিভিন্ন অঞ্চলের বিলুপ্ত ও প্রচলিত ১০০ ধরনের নৌকার প্রতিকৃতি। ভাঙচুরে তছনছ হয়ে যায় গোটা জাদুঘর।
হামলায় জড়িত কারা?
সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট ও উদীচীতে হামলার ঘটনায় দুটি পৃথক মামলাও করা হয়েছে। দুটি প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের চার মাস পার হলেও ঘটনার নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী বা সমন্বয়কারীরা এখনো চিহ্নিত হয়নি।
ছায়ানটে হামলার পরের দিন ধানমণ্ডি থানায় মামলা করেন ছায়ানটের প্রধান ব্যবস্থাপক দুলাল ঘোষ। মামলায় ২৫০ থেকে ৩০০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহার থেকে জানা গেছে, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে ছায়ানটের প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
উদীচীতে হামলার দুই দিন পর রাজধানীর শাহবাগ থানায় অজ্ঞাতপরিচয়ের ১৪-১৫ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়। মামলাটি করেন প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন। তিনি বলেন, ‘দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস, অরাজকতা সৃষ্টি এবং দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যেই উদীচীর কার্যালয়ে এই নাশকতা চালানো হয়। হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়।’
উদীচী কার্যালয়ে হামলার আগে পাওয়া দুটি সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহে রয়েছে। সেখানে দেখা যায়, আট থেকে ১০ জন যুবক লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র হাতে ভবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কারো হাতে বস্তার মতো বস্তু ছিল বলেও ফুটেজে দেখা গেছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, যুবকদের দলটি ভবনে প্রবেশের কিছুক্ষণ পরই আগুনের শিখা দেখা যায়। আরেকটি ফুটেজে আগুন লাগার পর তাদের ভবন থেকে বের হয়ে যেতে দেখা যায়। হামলাকারীদের অনেকের মুখই স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ছায়ানট ও উদীচীতে হামলার ঘটনাকে একই চক্রের পরিকল্পিত তৎপরতা বলে মনে করছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, দুটি হামলার কিছু ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে ছায়ানটে হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে ধানমণ্ডি থানার পুলিশ।
ধানমণ্ডি থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, ছায়ানটে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় এরই মধ্যে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আরো অনেককে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলমান রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, ছায়ানট ও উদীচীতে হামলার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক অপপ্রচার চালানো হয়। হামলার আগে প্রকাশ্যে উসকানি দিয়েছে অনেকেই। তাদের অনেককেই চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের পেছনে একাধিক স্বার্থান্বেষী মহল, উগ্রপন্থী গোষ্ঠী, অর্থদাতা ও প্রচার-সহযোগী সক্রিয় থাকতে পারে। এসব বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে আরো তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ ও সমন্বিত তদন্ত প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার এবং গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের মুখপাত্র এন এম নাসির উদ্দিন বলেন, দুটি মামলা নিয়েই কাজ করছে প্রশাসন। প্রাথমিকভাবে কিছু হামলাকারী চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি হামলার নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী, অর্থায়নকারী ও সংগঠকদের চিহ্নিত করতে কাজ করছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। এ জন্য আরো সময় লাগবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়া কয়েকজনকে শনাক্ত করা গেলেও নেপথ্যের সমন্বয়কারী ও অর্থদাতাদের বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। হামলার আগে কিভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল, কারা অনলাইনে উসকানি দিয়েছে, রাজনৈতিক বা সংগঠিত কোনো গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা ছিল কি না—এসব প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থা। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, শুধু মাঠ পর্যায়ের হামলাকারীদের নয়, উসকানিদাতা ও পরিকল্পনাকারীদের ভূমিকাও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ কারণে তদন্ত দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং এখনো অভিযোগপত্র জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
নাট্যজন মামুনুর রশীদ বলেন, দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল দীর্ঘদিন ধরেই অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মুক্তবুদ্ধি ও মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে কাজ করে এসেছে। ফলে এই অঙ্গনকে দুর্বল করতে পারলে সমাজের প্রগতিশীল ধারাকেও আঘাত করা সহজ হয়। তাঁর মতে, ছায়ানট, উদীচী ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলার ঘটনাগুলো একই ধারার অংশ। ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা নিউ এজ সম্পাদক সাংবাদিক নুরুল কবির বলেন, ‘পরিষ্কারভাবে আমরা জানি যে ছায়ানট ও উদীচী ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য এক দিন আগে, দুই দিন আগে থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কারা ঘোষণা দিয়েছে, এ দেশের সব মানুষ জানে, সরকারও জানে।’
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশ্রয়ে ছায়ানট ও উদীচীতে হামলা করা হয়েছে ইঙ্গিত করে নুরুল কবির দাবি করেন, ‘সরকার তো তাদের গ্রেপ্তার করেনি আগেই প্রিভেন্ট করার জন্য। তারা তো আগেই ঘোষণা দিয়েছে—এগুলোকে ধ্বংস করা হবে। এ কারণেই আমরা বলেছি, সরকারের কোনো না কোনো অংশ এই ঘটনাটা ঘটতে দিয়েছে।’
আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী সারা হোসেন বলেন, ছায়ানট ও উদীচীতে হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আজ থেকে ৫৪ বছর আগে মুক্তিযুদ্ধের সময় যেভাবে দেশের মেধা, মনন ও সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করতে শিল্পী, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছিল, সেই একইভাবে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপরে হামলা চালানো হয়েছে। মূলত তারা স্তব্ধ করতে চেয়েছে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-সংস্কৃতির মানুষজনকে।
