
বিশেষ প্রতিবেদক : মোবাইল ফোনে কথা বলতে গিয়ে কলড্রপ, ইন্টারনেট ব্যবহারে ধীরগতি কিংবা গ্রাহকের অজান্তেই ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস (ভ্যাস) চালু হয়ে যাওয়া-টেলিযোগাযোগ সেবা নিয়ে এসব ভোগান্তিই গ্রাহকদের অভিযোগের বড় অংশজুড়ে রয়েছে। গত সাড়ে পাঁচ বছরে গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক ও টেলিটকের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) জমা পড়েছে ৬৬ হাজার ৭০৫টি অভিযোগ। এর মধ্যে রবি ও গ্রামীণ ফোনের বিরুদ্ধেই ৪৬ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিটিআরসি ভবনে অনুষ্ঠিত কমিশনের সপ্তম গণশুনানিতে এই সব অভিযোগ তুলেন গ্রাহকরা। গ্রাহকদের অভিযোগ, পরামর্শ ও বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ হিসেবে এই শুনানির আয়োজন করা হয়। হাইব্রিড পদ্ধতিতে আয়োজিত এ শুনানিতে কলরেট, ডেটার মেয়াদ, ডেটা ক্যারি ফরওয়ার্ড, নেটওয়ার্ক কভারেজ, সিম নিবন্ধন, এনইআইআর, লাইসেন্স ও সেবার মানসহ নানা বিষয় উঠে আসে।
বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত চার অপারেটরের বিরুদ্ধে ৬৬ হাজার ৭০৫টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে রবির বিরুদ্ধে ২৪ হাজার ৮৭৪টি, গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে ২১ হাজার ৫২৬টি, টেলিটকের বিরুদ্ধে ১১ হাজার ৫৯৪টি এবং বাংলালিংকের বিরুদ্ধে ৮ হাজার ৭১১টি অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের ১২টি শ্রেণির মধ্যে সেবার মান, ইন্টারনেটের গতি এবং ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস নিয়ে অভিযোগই বেশি। এ ছাড়া এমএনপি, রিচার্জ ও বিলিং, সিম নিবন্ধন, ট্যারিফ, সিমের মালিকানা, মোবাইল ব্যাংকিং, প্রতারণা এবং কুইজ-পুরস্কার নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের সংখ্যা বড় হলেও নিষ্পত্তির হারও উল্লেখযোগ্য। রবির ২৪ হাজার ৮৭৪টি অভিযোগের মধ্যে ২৪ হাজার ৮৩৯টি, গ্রামীণফোনের ২১ হাজার ৫২৬টির মধ্যে ২০ হাজার ৮৯৫টি, টেলিটকের ১১ হাজার ৫৯৪টির মধ্যে ১১ হাজার ৪৪৭টি এবং বাংলালিংকের ৮ হাজার ৭১১টির মধ্যে ৮ হাজার ৬৭৫টি নিষ্পত্তি হয়েছে।
প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিবন্ধন করেন : ১৭ থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত গণশুনানির জন্য ২ হাজার ৯৯০ জন নিবন্ধন করেন। তাদের মধ্যে ১৭২ জন নারী, ১ হাজার ৪৭ জন পেশাজীবী এবং ৬৩৮ জন শিক্ষার্থী। প্রাপ্ত অভিযোগের মধ্যে সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগসংক্রান্ত ১ হাজার ৪৫টি, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন্স ৮৪৪টি, স্পেকট্রাম ৬৩টি, লিগ্যাল অ্যান্ড লাইসেন্সিং ১৯টি এবং এনফোর্সমেন্ট অ্যান্ড ইন্সপেকশনসংক্রান্ত ৫টি।
শুনানিতে সভাপতিত্ব করেন স্পেকট্রাম বিভাগের কমিশনার মাহমুদ হোসেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১ (সংশোধিত ২০২৬)-এর ধারা ৮৭ অনুযায়ী কমিশন প্রতি চার মাসে অন্তত একবার গণশুনানি করবে। গ্রাহকদের গঠনমূলক প্রশ্ন ও সুপারিশ ‘গণশুনানি কার্যপর্যবেক্ষণ তালিকা’য় রেখে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে।
প্রতি মাসে প্রকাশ হবে সেবার মানের প্রতিবেদন : সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহজাদ পারভেজ মহিউদ্দিন জানান, ২০২৫ সালের গণশুনানিতে পাওয়া ১ হাজার ৭৫৬টি অভিযোগের মধ্যে কমিশন-সংশ্লিষ্ট ২২১টি অভিযোগ চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হেল্পলাইন ও ওয়েবের মাধ্যমে পাওয়া ১৩ হাজার অভিযোগের মধ্যে ১১ হাজার ২৭৯টি নিষ্পত্তি হয়েছে, যার হার ৮৬ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে এ হার নিয়ে কমিশন পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয়।
শুনানিতে কলরেট কমানো, ডেটা প্যাকেজের স্বচ্ছতা, বিদ্যুৎ বিভ্রাটে কলড্রপ, আন্তর্জাতিক ওটিপি, এসএমএস মাস্কিং এবং ৫জি গতি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বিটিআরসি জানায়, বর্তমানে ভয়েস কলের ট্যারিফ সর্বনিম্ন ৪৫ পয়সা ও সর্বোচ্চ ২ টাকা। গ্রাহকস্বার্থে ফ্লোর প্রাইস কমানোর কাজ চলছে। আগামী মাস থেকে প্রতি মাসে কোয়ালিটি অব সার্ভিস (কিউওএস) প্রতিবেদন প্রকাশের পরিকল্পনাও জানানো হয়।
৭০ হাজার টাওয়ারের প্রয়োজন : বিটিআরসি জানায়, দেশে বর্তমানে প্রায় ৫৬ হাজার মোবাইল টাওয়ার রয়েছে। চাহিদা পূরণে প্রয়োজন ৭০ হাজারের বেশি টাওয়ার। দুর্গম হাওর-বাঁওড় এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে। জাতীয় ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক গাইডলাইন অনুমোদিত হলে শক্তিশালী ফাইবার ব্যাকবোনের মাধ্যমে এক অবকাঠামো থেকে বহুমুখী সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
গণশুনানিতে গ্রাহকদের অংশগ্রহণও বেড়েছে। ২০২৬ সালে সরাসরি ১১টি প্রশ্নসহ মোট ২ হাজার ২৯০টি প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে, যা আগের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি। বিটিআরসি বলছে, গ্রাহকদের অভিযোগ শুধু শোনাই নয়, সেবার মানোন্নয়নে সেগুলোর বাস্তব প্রতিফলন ঘটানোই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য।
