৬০ প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট ফাঁকি আড়াই কোটি টাকা

নয়াবার্তা প্রতিবেদক :  দেশের ভ্যাট লক্ষ্যমাত্রার সিংহভাগ জোগান দেয় দেশীয় বড় গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কোম্পানি। বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ, মূল্য সংযোজন কর) আওতাধীন এসব প্রতিষ্ঠান কৌশলে ভ্যাট ফাঁকি দেয়। এলটিইউ সক্ষমতা অনুযায়ী নিরীক্ষার মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব ফাঁকি উদ্ঘাটন ও তা আদায় করে আসছে। তবে কিছু প্রতিষ্ঠান ফাঁকি দেয়া রাজস্ব পরিশোধ না করে বছরের পর বছর তা আদালতে ঝুলিয়ে রাখে।

এলটিইউ ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত ৬০টি প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা করে প্রায় দুই হাজার ৬৩০ কোটি টাকা ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছে, যার মধ্যে মাত্র ৪৬০ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। বাকি প্রায় এক হাজার ৭১৭ কোটি টাকা অনাদায়ী রয়েছে। ফাঁকি দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, ওষুধ কোম্পানি, হোটেল, সিরামিক, সিমেন্ট, মোবাইল অপারেটর, গ্যাস কোম্পানি, বেভারেজ প্রভৃতি। সম্প্রতি এলটিইউ এনবিআরকে এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দিয়েছে।

এনবিআর সূত্রমতে, চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ভ্যাট ফাঁকির তথ্য চেয়ে ১৭ আগস্ট এলটিইউকে চিঠি দেয় এনবিআর। যাতে এলটিইউ’র নিজস্ব অডিটের মাধ্যমে উদ্ঘাটিত ও এলটিইউ এর আওতাধীন প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট গোয়েন্দার নিরীক্ষার মাধ্যমে উদ্ঘাটিত রাজস্ব ফাঁকির তথ্য চাওয়া হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৯ সেপ্টেম্বর এনবিআরকে পৃথক প্রতিবেদন দেয় এলটিইউ। যাতে ২০১৫-১৬ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত এলটিইউ নিরীক্ষার মাধ্যমে ৮৪টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দুই হাজার ৬৩০ কোটি ৪৬ লাখ ১১ হাজার ৬৬৮ টাকা উদ্ঘাটন করেছে। এর মধ্যে প্রযোজ্য ভ্যাট, সুদ ও অর্থদণ্ডসহ মোট ৪৬০ কোটি ১৫ লাখ ৫৫ হাজার ৫৭৮ টাকা আদায় করা হয়েছে। বাকি এক হাজার ৭১৭ কোটি ৫৮ লাখ ৮৮ হাজার ৩৭৮ টাকা আদায় হয়নি। এছাড়া ভ্যাট গোয়েন্দা একই সময় এলটিইউ’র আওতাধীন ৪৫টি প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রায় ৫১০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছে। এর মধ্যে প্রযোজ্য ভ্যাট, সুদ ও অর্থদণ্ডসহ প্রায় ৮৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা আদায় হয়েছে। বাকি প্রায় ৩৯০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা অনাদায়ী রয়েছে।

এলটিইউ এর প্রতিবেদনে বলা হয়, এলটিইউ ২০১৫-১৬ অর্থবছর তিনটি ব্যাংক নিরীক্ষা করে, যার মধ্যে দুটি ব্যাংকের প্রায় এক কোটি ৫৭ লাখ টাকা ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছে, যা আদায় হয়েছে। এর মধ্যে এবি ব্যাংক প্রায় ৩০ লাখ টাকা ও ঢাকা ব্যাংক প্রায় এক কোটি ২৭ লাখ টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছর ১০টি প্রতিষ্ঠান নিরীক্ষা করে প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ফাঁকি উদ্ঘাটন করে তা আদায় করে। এর মধ্যে ইউনিক গ্রুপের ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস লি. প্রায় চার কোটি ১৫ লাখ টাকা, পারটেক্স গ্রুপের পারটেক্স ফার্নিচার প্রায় ৩৪ লাখ টাকা, একই গ্রুপের স্টার পার্টিকেল বোর্ড প্রায় ১০ লাখ টাকা, পারটেক্স বেভারেজ প্রায় ৬১ লাখ টাকা, মীর গ্রুপের মীর সিরামিক প্রায় দুই কোটি ৩৫ লাখ টাকা, ইনসেপ্টা ফার্মা প্রায় তিন কোটি টাকা, এরিস্টোফার্মা প্রায় দুই কোটি ৫৬ লাখ ও প্রায় এক কোটি ২৫ লাখ টাকা, এসকেএফ ফার্মা প্রায় এক কোটি ৪১ লাখ টাকা ও সিনহা প্রিন্টার প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা।

আরও বলা হয়, ২০১৭-১৮ অর্থবছর ২৭টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় এক হাজার ৭১৯ কোটি টাকা ফাঁকি উদ্ঘাটন করে। যার মধ্যে প্রায় ১১৪ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। আর রবি, এয়ারটেল, প্যাসিফিক টেলিকম ও বিটিসিএলের কাছে প্রায় এক হাজার ৬০৪ কোটি টাকা অনাদায়ী রয়েছে। বেক্সিমকো ফার্মা প্রায় এক কোটি দুই লাখ ও প্রায় ৭৪ লাখ টাকা, কোহিনূর কেমিক্যাল প্রায় ৩২ লাখ, লালবাগ কেমিক্যাল প্রায় ১৪ লাখ, নিউজিল্যান্ড ডেইরি প্রায় ৩৫ লাখ, বার্জার পেইন্টস প্রায় পৌনে তিন লাখ ও প্রায় তিন লাখ, বাটা শু প্রায় ১১ লাখ, জি৪এস প্রায় ৩৪ লাখ, পিডিবি প্রায় ৩৬ কোটি, ডিপিডিসি প্রায় ৬৬ কোটি, শবনম ভেজিটেবল প্রায় ৩৮ লাখ, বেঙ্গল প্যাকেজ প্রায় পাঁচ লাখ টাকা, ট্রাইসপ্যাক প্রায় ২৫ লাখ টাকা, ব্র্যাক ব্যাংক প্রায় এক কোটি, ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ, কোহিনূর কেমিক্যাল প্রায় ছয় লাখ, এরিস্টোফার্মা প্রায় ৫৩ লাখ, মিরাকেল প্রায় তিন কোটি ও এএসটি বেভারেজ প্রায় ৪৮ লাখ টাকা। আর রবি প্রায় ৯২৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা উচ্চ আদালতে বিচারাধীন, এয়ারটেল প্রায় ২৭০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, যা এলটিইউতে বিচারাধীন, প্যাসিফিক বাংলাদেশ প্রায় ২৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় আদায় হয়নি। বিটিসিএলের প্রায় ৩৮০ কোটি টাকা, যা এলটিইউতে বিচারাধীন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮-১৯ অর্থবছর ২৬টি প্রায় ৭৮৯ কোটি টাকা ফাঁকি উদ্ঘাটন করে এলটিইউ। এর মধ্যে প্রায় ৩২০ কোটি ৪০ লাখ টাকা আদায় ও প্রায় ২২ কোটি টাকা অনাদায়ী রয়েছে। এর মধ্যে প্যাসিফিক ফার্মা প্রায় ২৮ লাখ টাকা, ন্যাশনাল পলিমার প্রায় ১৭ লাখ টাকা, এটিআই সিরামিক প্রায় সাত লাখ টাকা, এনটিভি প্রায় দেড় কোটি টাকা, গ্রুপ-৪ প্রায় ১১ লাখ, ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রায় আড়াই কোটি, সায়াম সিটি সিমেন্ট প্রায় সাড়ে সাত কোটি, রবিন প্রিন্টিং প্রায় ৭২ লাখ, এশিয়াটিক মাইন্ডশেয়ার প্রায় সাড়ে সাত কোটি, ইউনিক হোটেল প্রায় দুই কোটি ১৭ লাখ, হোলসিম সিমেন্ট প্রায় আড়াই কোটি ও সাড়ে ১০ কোটি টাকা, সেভেন সার্কেল সিমেন্ট প্রায় সাড়ে ৯ কোটি, এমআই সিমেন্ট প্রায় ২০ লাখ, রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস প্রায় ১৩ কোটি, ট্রান্সকম বেভারেজ প্রায় ৪০ লাখ, ট্রাইসপ্যাক প্রায় ৬২ লাখ, বাটা শু দেড় লাখ ও ১৮ লাখ, হাইডেলবার্গ সিমেন্ট প্রায় ১০ কোটি, জিএ ফার্মা প্রায় ২৭ লাখ, ইউনিলিভার প্রায় ৪৬ লাখ, গ্রামীণফোন প্রায় ৬৮৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, টেলিটক প্রায় ২৯ কোটি ও জেসন ফার্মা প্রায় ৮১ লাখ টাকা। এর মধ্যে এশিয়াটিক, রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস ও টেলিটকের মামলা এলটিইউতে বিচারাধীন।

আরও দেখা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছর ৯টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯৭ কোটি টাকা ফাঁকি উদ্ঘাটন করে এলটিইউ, যার মধ্যে প্রায় চার কোটি ২১ লাখ টাকা আদায় হয়েছে, বাকি প্রায় সাড়ে ৮৬ কোটি টাকা অনাদায়ী। প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাংলাদেশ গ্যাসফিল্ড প্রায় ৬৩ লাখ, নিউজিল্যান্ড ডেইরি প্রায় সাড়ে ২৬ লাখ, লিন্ডে বাংলাদেশ প্রায় ৮৬ কোটি ৬৩ লাখ, রেনাটা প্রায় পাঁচ কোটি ৮৮ লাখ, এরিস্টোফার্মা প্রায় ৬০ লাখ, কোহিনূর কেমিক্যাল প্রায় ১২ লাখ, প্রিমিয়ার সিমেন্ট প্রায় দেড় কোটি ও গ্রুপ-৪ প্রায় ২৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে লিন্ডে বাংলাদেশের মামলা উচ্চ আদালতে এবং রেনাটার মামলা এলটিইউতে বিচারাধীন। অপরদিকে, ২০২০-২১ অর্থবছর ৯টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ছয় কোটি ৮৭ লাখ টাকা ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছে এলটিইউ, যার মধ্যে প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা আদায় হয়েছে। অনাদায়ী রয়েছে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রবিন প্রিন্টিং প্রায় ২১ লাখ, বাটা প্রায় এক লাখ ও প্রায় ১৯ লাখ, সায়াম সিটি সিমেন্ট প্রায় এক কোটি ১৫ লাখ, টাম্পাকো ফয়েল প্রায় ১৭ লাখ ও এমআই সিমেন্ট প্রায় চার কোটি টাকা। এর মধ্যে সায়াম সিটি সিমেন্ট ও এমআই সিমেন্ট এলটিইউতে বিচারাধীন।