৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা

গাজী আবু বকর : গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। বর্তমান সংসদ সদস্য ও তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক এবং ফাইন্যান্স কোম্পানিতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ রয়েছে ১১ হাজার ১১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক ৩ হাজার ৩৩০ কোটি ৮ লাখ টাকা খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়নি। এই ঋণ খেলাপিদের শীর্ষ ২০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বহুল আলোচিত এস. আলম গ্রুপেরই রয়েছে ৪ প্রতিষ্ঠান।

গতকাল সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের নবম দিনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই তথ্য জানান। কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাতের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য দেন। হাসনাত আবদুল্লাহ তাঁর প্রশ্নে জানতে চান, দেশে এই মুহূর্তে প্রকৃত খেলাপি ব্যাংকঋণের পরিমাণ কত, শীর্ষ ২০ খেলাপি কারা, খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে এবং সংসদ সদস্যদের ব্যাংকঋণ এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণ কত।

অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপির তালিকায় এস. আলম গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। এছাড়াও ওই তালিকায় রয়েছে বেক্সিমকোসহ দেশের বড় কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর নাম। শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপি প্রতিষ্ঠান হলো, এস. আলম সুপার এডিবল অয়েল লিমিটেড, এস. আলম ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড, সালাম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, এস. আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেড, সোনালী ট্রেডার্স, বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড (বেক্সিমকো), গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন লিমিটেড, চেমন ইস্পাত লিমিটেড, এস. আলম ট্রেডিং কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড, ইনফিনিট সিআর স্ট্রিপস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, কেয়া কসমেটিকস লিমিটেড, দেশবন্ধু সুগার মিলস লিমিটেড, পাওয়ারপ্যাক মুতিয়ারা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড, পাওয়ারপ্যাক মুতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড, প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড, কর্ণফুলী ফুডস (প্রা.) লিমিটেড, মুরাদ এন্টারপ্রাইজ, সিএলসি পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড, বেক্সিমকো কমিউনিকেশন্স লিমিটেড এবং রংধনু বিল্ডার্স (প্রা.) লিমিটেড
সংসদে অর্থমন্ত্রী জানান, খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকারের গৃহীত ব্যবস্থাদি সমূহ হলো, ১০% এর অধিক যেসব শ্রেণিকৃত ঋণ রয়েছে এরূপ ব্যাংকসমূহের সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিমের সাথে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে আলোচনা এবং শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়ে প্রতিবন্ধকতা খুঁজে বের করে তা সমাধানের নিমিত্ত ব্যাংক হতে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ; বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক আয়োজিত প্রতিটি ব্যাংকার্স সভায় ব্যাংক ভিত্তিক শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপী/শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়ের অগ্রগতি যাচাই; বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক শ্রেণিকৃত ঋণের হার অধিক এরূপ ব্যাংকসমূহের জন্য শ্রেণিকৃত ঋণ রেজল্যুশন স্ট্র্যাটেজি সংক্রান্ত গাইডলাইন প্রণয়ন; ব্যাংক-কোম্পানী (সংশোধিত) আইনে সংজ্ঞায়িত ইচ্ছাকৃত খেলাপীদের ওয়েল ফেয়ার ডিফল্টারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে বিআরপিডি সার্কুলার নং-০৬; তারিখ: ১২ মার্চ ২০২৪ এর মাধ্যমে ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপী শনাক্তকরণ এবং তাদের বিরুদ্ধে গৃহীতব্য ব্যবস্থাদি সংক্রান্ত নীতিমালা জারি করা হয়েছে; বিআরপিডি সাকুলার নং-১৪/২০২৪ এর মাধ্যমে ব্যাংকের বিদ্যমান লিগ্যাল টিম/আইন বিভাগ শক্তিশালীকরণের জন্য ব্যাংকসমূহকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে; বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (অউজ) অনুসরণের মাধ্যমে আগামী ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মধ্যে প্রত্যেক ব্যাংকের খেলাপী ঋণস্থিতির ন্যূনতম ১% নগদ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করার জন্য বিআরপিডি সাকুলার নং-১১/২০২৪ এর মাধ্যমে ব্যাংকসমূহকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে; ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন হালনাগাদকরণ; আইএফআরএস ৯ অনুযায়ী “প্রত্যাশিত ঋণ ক্ষতি” ভিত্তিক ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং নীতিমালা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনার সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং ঋণ ঝুঁকি প্রশমন; বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের নিজস্ব মূল্যায়নের পাশাপাশি তালিকাভুক্ত জামানত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণের বিপরীতে প্রদত্ত জামানত মূল্যায়ন করার নিমিত্ত উক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহকে তালিকাভুক্তিকরণ।

এতদ্ব্যতীত, খেলাপী ঋণ সমস্যা সমাধানে যেসব কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে তা হলো; বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক খেলাপী ঋণ সমস্যা সমাধানে এতদসংশ্লিষ্ট বিদ্যমান আইনসমূহ (ব্যাংক কোম্পানি আইন, নেগুসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট এ্যাক্ট অর্থ ঋণ আদালত আইন, ব্যাংক ক্রপসি এ্যাকট ইত্যাদি) সংশোধনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে; স্বল্প মেয়াদী কৃষি ঋণের পুনঃতফসিলিকরণ নীতিমালা পর্যালোচনাপূর্বক হালনাগাদকরণ; খেলাপী ও ইচ্ছাকৃত খেলাপী ঋণগ্রহীতাদের তালিকা প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ; দেশে উন্নত ঋণ সংস্কৃতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেন অর্থাৎ ভালো ঋণগ্রহীতাদেরকে চিহ্নিতকরত তাদেরকে প্রণোদনা প্রদান সংক্রান্ত বিদ্যমান নীতিমালা পর্যালোচনাপূর্বক হালনাগাদ করা; একজন ঋণ গ্রহীতা কর্তৃক সমগ্র ব্যাংকিং খাত হতে ঋণ গ্রহণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ; ইচ্ছাকৃত খেলাপী ঋণ গ্রহীতাদের জন্য গৃহীতব্য ব্যবস্থাসমূহের কিছু কিছু খেলাপী ঋণ গ্রহীতাদের জন্যেও আরোপের বিষয়ে প্রয়োজনীয়

আইনী সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ
অর্থমন্ত্রী সংসদে আরো জানান, অর্থ ঋণ আদালতের বিচারক প্যানেল/জুরি বোর্ডে অভিজ্ঞ ব্যাংকার অন্তর্ভুক্তকরণের পাশাপাশি খেলাপী ঋণ গ্রহীতাগণ যাতে রিট করে ঋণ আদায় কার্যক্রম স্থবির করতে না পারে সে লক্ষ্যে এটর্নি জেনারেল এর সাথে আলাপপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ; বেসরকারি খাতে এসেস ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি এএমসি প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা।
সংসদে অর্থমন্ত্রী আরো জানান, বর্তমান সংসদ সদস্য এবং তাঁদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক এবং ফাইন্যান্স কোম্পানিতে ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ১১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। উল্লেখ্য যে, মহামান্য আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ৩৩০ কোটি ৮ লাখ টাকা খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়নি।

ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্ব টেবিলে উত্থাপিত হয়।

Share